‘আমি আজও এর উত্তর খুঁজে পাই না’

ডেস্ক রিপোর্ট : ‘এ কি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী জননী
ফুলে ও ফসলে কাদামাটি জলে ঝলমল করে লাবনি।’

কবি কাজী নজরুল ইসলামের এ গানটি ২০০১ সালে ১ বৈশাখ ভোরে রমনার বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে গাইছিলেন সংগীত শিল্পী নাসিমা শাহীন ফ্যান্সী। তার সুরেলা কণ্ঠে গানটি উপভোগ করছিলেন শত শত দর্শক-শ্রোতা। গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তবলা বাজাচ্ছিলেন এনামুল হক ওমর। গানটির ঠিক শেষ মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটে বিকট শব্দে। এতে নিহত হন ১০ জন, আহত হন অনেকে। সেদিনের সেই ভয়াল স্মৃতি নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেন শিল্পী নাসিমা শাহীন ফ্যান্সী। তিনি বলেন, ‘আমি আজও এ বোমা হামলার উত্তর খুঁজে পাই না। জনসম্মুখে এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার যেন এরকম আর কিছু করার চিন্তাও করতে না পারে।’

ছায়ানটের সঙ্গে ২৯ বছর জড়িত আছেন নাসিমা শাহীন ফ্যান্সী। বতর্মানে সেখানে গান শেখান তিনি। পাশাপাশি পালন করছেন বাংলাদেশ নজরুল সংগীত সংস্থার প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব।
গুণী এই শিল্পী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সেই ছোটবেলা থেকেই আমি ছায়ানটের সঙ্গে আছি। ছায়ানটে প্রতিবছর বর্ষবরণ অনুষ্ঠান হয়। আমাদের কাছে এটা সবচেয়ে আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান। আমাদের ভীষণ প্রিয় একটি অনুষ্ঠান। আমরা সারাবছর উন্মুখ হয়ে থাকি, কখন আমরা রমনার বটমূলে গান গাইবো। এটা নিয়ে আমরা খুব উত্তেজনায় থাকি।’

২০০১ সালের ১ বৈশাখের অনুষ্ঠানে সেই ভয়াবহ হামলার বর্ণনায় নাসিমা শাহীন ফ্যান্সী বলেন, “প্রতি বছরের মতো ২০০১ সালের ১ বৈশাখেও অনুষ্ঠান চলছিল। আমরা সবাই সকাল ৬টা থেকে মঞ্চে ছিলাম। সব সময়ের মতো যেমন ভিড় থাকে, তেমনই ছিল। আমাদের ছায়ানটের বেষ্টনির ভেতরে বাচ্চাদের অভিভাবকেরা বসেন। আমাদের নিজেদের অভিভাবকেরাও মঞ্চের কাছাকাছি থাকেন। মঞ্চটি ঘিরেই আমাদের আপনজন ও প্রিয়জনেরা থাকেন। তারপর থাকেন সাধারণ দর্শকেরা। সেদিনও তাই ছিল। অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। গান চলছিল। আমার গানটি ছিল অনুষ্ঠানের শেষের দিকে। আমি গাইছিলাম কাজী নজরুলের ‘এ কি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী জননী।’ গানটি প্রায়ই যখন শেষ, তখনই হঠাৎ একটি বিকট শব্দ হলো। তাকিয়ে দেখলাম সেখানে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। কিছু বোঝা যাচ্ছে না। শব্দটা এমন ছিল যে আমি চমকে উঠি। আমার সঙ্গে যিনি তবলাবাদক ছিলেন, ভয়ে তার হাত ধরে ফেলি। প্রথমে আমরা মনে করেছিলাম যে ভিড়ের মধ্যে ইলেকট্রিক কোনও শটসার্কিট থেকে বিস্ফোরণ বা দুর্ঘটনা হয়েছে।’
ফ্যান্সী বলেন, ‘ধোঁয়া সরে যাওয়ার পর যা দেখলাম সেরকম দৃশ্য যেন আমি যত দিন বেঁচে আছি, না দেখি! কোনোদিন যেন কাউকে এমন দৃশ্য দেখতে না হয়! এ কথাটি বার বার মনে হয়।’

তিনি বলেন, ‘ছিন্নভিন্ন মানুষ পড়ে আছে। আমি একবার দেখেই দ্বিতীয়বার আর তাকাতে পারিনি। আমার বুক ও হাত-পা কাঁপছিল। আমার ভীষণ তৃষ্ণা হচ্ছিল। আমার এত খারাপ লাগছিল, আমি কী দেখলাম! এরকম কেন হলো? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে আমি জ্ঞানই হারিয়ে ফেলছিলাম। কোনও বোধবুদ্ধি মাথায় আসছিল না! এটা কী হলো, কেন হলো! তারপর আমার প্রিয়জন যারা ছিলেন তারা আমাকে মঞ্চের কাছ থেকে নিয়ে যান।’
নাসিমা শাহীন ফ্যান্সী আরও বলেন, ‘তখন সেখানে এমন একটি গুজব ছড়িয়ে যায় যে, মঞ্চের নিচে আরও বোমা আছে। যেকোনও সময় সেগুলোর বিস্ফোরণ হতে পারে। তাড়াতাড়ি করে মঞ্চ খালি করা হলো।’
এত বছর পরেও সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে কষ্টে কুঁকড়ে যান ফ্যান্সী। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বলেন, ‘এত বীভৎস্য ঘটনা! আমি আজও ভেবে পাই না, কারা এই মানুষগুলো। কাদের মাথায় সৃষ্টির বিপরীতে এমন একটি অদ্ভুত ও বিকৃত চিন্তা মাথায় আসলো।
নাসিমা শাহীন ফ্যান্সী বলেন, ‘বাঙালির এমন একটি প্রাণের অনুষ্ঠান! ১ বৈশাখ এমন একটি অনুষ্ঠান যে, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য একটি সম্মিলিত উদ্যোগের একটি অনুষ্ঠান। আমরা সব ধর্মের লোকই এই অনুষ্ঠান উপভোগ করে থাকি। আমরা ভাবতেই পারি না যে এত প্রিয় একটি অনুষ্ঠানে কোনও অনিষ্ট হতে পারে। আমার কাছে অবাক লাগে, আমি আজও এর উত্তর খুঁজে পাই না। এসবের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার।’
তিনি বলেন, ‘সবাই ভেবেছিল পরের বছর ২০০২ সালে হয়তো ছায়ানট অনুষ্ঠান করা বন্ধ করে দেবে। লোকজনও ভয়ে আসবে না। কিন্তু সেই বছর লোকসমাগম হয়েছিল সবচেয়ে বেশি। এটি হচ্ছে একটি প্রতিবাদ যে বাঙালি কখনও এসব অনিষ্ট মেনে নেবে না। তারা সবসময় তাদের প্রাণের উৎসবে যোগ দেবে, মেতে উঠবে।’
নাসিমা শাহীন ফ্যান্সী বলেন, ‘বাঙালির চেতনা জাগ্রত হোক, সব বাঙালি জেগে উঠুক শিক্ষায় ও শান্তিতে। ছায়ানট সব সময় চাইছে প্রতিবছর এরকম অনুষ্ঠান করতে। আমি সবাইকে আহবান করবো, সবাই যেন সুস্থ চিন্তা করেন। ধর্ম, বর্ণ ও জাতি এসব নিয়ে না ভেবে আমরা যে মানুষ এ কথা যেন সবার আগে ভাবে।’
তিনি বলেন, ‘কারা এ হামলা করেছে, সেটা তখন বোঝা যায়নি। শুনেছিলাম, যারা বোমা বহন করছিল তাদের শরীরেই এ বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে। তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি। আমার কষ্ট হয়েছে তাদের জন্য। আমরা মানুষ সেটা যেন ভুলে না যাই। সবারই বাঁচার অধিকার আছে। আমি কোনও অন্যায় ও বিকৃত চিন্তা মাথায় আনবো না যাতে অন্যের ক্ষতি হয়।’ বাংলা ট্রিবিউন