দাম দিয়ে কেনা একটি ভূখ- এবং রাজাকারদের ষড়যন্ত্র

 

রবিউল আলম : ১০ ডিসেম্বর রাত তিনটায় পাকিস্তান বেলুচি বাহিনী আমাদের বাড়ি ঘেরাও করে ফেলে, সাথে ছিল কিছু পরিচিত রাজাকার লালু, দারোগালি, খালেক সহ ৮-১০ জন। খালেক আমাদের রিকশা চালাত ২৫ মার্চের আগে, বাবার সাথে সুসম্পর্ক ছিল। যে বাড়িটি ঘেরাও করা হয়েছে, তা ছিল দেবরাজ মুহুরির। রায়ের বাজারের একমাত্র দলিল লেখক হওয়ায় মুহুরির ছিল ব্যাপক পরিচিতি। মামা হাসেন সাহেব বাড়িটি ক্রয় করায় আমাদের সেখানে অবস্থান। বেলুচি বাহিনীর কাছে বাবাকে হাজির করা হলো। বাবার মুখে ছিল অনেক লম্বা দাড়ি, মা আমাকে কিছুতেই তাদের কাছে যেতে দিচ্ছেন না। আমিও না গিয়ে থাকতে পারছি না। একসময় দৌড় দিয়ে বাবার কাছে হাজির, বাবাকে ধরে দাঁড়িয়ে আছি। এক বেলুচি আরেক বেলুচিকে বলছে, এত্তা বড়া নূর হায়, কেয়সা মালাওন হোছাক্তা। বাবার দাড়ি দেখে সৈনিকদের সন্দেহ হয়। এক বেলুচি বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন, চাচা আপ সাচ বাতাইয়ে, আপ মুসলিম ইয়া মালাউন হো।

বাবা ভারতে দীর্ঘদিন ছিল ১৯৩৭ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত। হিন্দু-উর্দু-আসামি একাধিক ভাষা জানতেন ও বুঝতেন। বাবা বলছেন, আপ হামকো দেখনেসে কিয়া মালুম হতা। কই বলনেছে হাম মালাওন হজায়েঙ্গে। আল্লাকি নূর কিই মানে নেই রাখতা। বেলুচি রাজাকারদের মারতে মারতে নিয়ে গেল। যাওয়ার সময় আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেল, মালাওনরা কোথায় আছে দেখিয়ে দেওয়ার জন্য। হাটতে হাটতে বর্তমান দূর্গা মন্দির গলিতে যাওয়ার মুহূর্তে মরনচাঁন পালের বাড়ির সামনে যেতেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এম, আর, আক্তার মুকুলের কন্ঠে ভেসে এলো চরমপত্র, এই যে হালায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, মৌলভী বাজারের একদল কসাই লাগুর পাইসে, বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ে পালাইয়া আওলা ঝাওয়া কোপাইতেছেÑ বিকট শব্দে রেডিওতে ভেসে এলো। সঙ্গে সঙ্গে বেলুচি বাহিনী ও রাজাকারগুলি হুরমুর করে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করতেই শওকত আলীকে পেয়ে গেল। তাকে মন্দিরের সামনে অমানসিক নির্যাতন করা হলো, হৈ-হল্লা দেখে আমি আত্মগোপনে চলে যাই। পাশের গলি পাবনা হাউজ লেনের হোসেন স্যারের বাড়িতে ঢুকে দেখি বিখ্যাত সাংবাদিক মুক্তিযোদ্ধা নির্মল সেন (প্রয়াত) সহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা, মামা হোসেন সাহেব যিনি সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন বলে পাকিস্তানিরা এমনকি রাজাকাররাও এ বাড়িতে আসত না। তবুও মুক্তিযুদ্ধের শেষ সময় বলে কথা। স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালীন অনেক সময়ই হোসেন সাহেব (প্রয়াত) দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছেন। তিনি সাম্যবাদী দলের ঢাকা মহানগরের সভাপতি ছিলেন। চারিদিকে আক্রমণ ও তল্লাশি দেখে বর্তমান সাদেক খান সড়ক পূর্বে খাল পেরিয়ে সাদেক খানদের ইটের খোলা পার হয়ে আত্মগোপন করেন মুক্তিযোদ্ধারা। পরে জানতে পারি, রায়ের বাজার থেকে ওই রাতে ৪০-৫০ জন সাধারণ মানুষকে রাজাকাররা ধরে নিয়ে যায়। শওকত আলি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকসহ হত্যা করা হয়েছে। শুধুমাত্র শ্যামপাল ও তার ছেলে গোপালকে জীবিত ছেড়ে দেওয়া হয়েছে জমির সার্জেন্টের সুপারিশে। এই জমির সার্জেন্ট ছিলো পাকিস্তান পুলিশ বাহিনীতে।
১৯৬৫ সাল থেকে মোহাম্মদপুরে বসবাস করার কারনে বাঙালিদের কাছে অতি পরিচিত ছিলেন। জমির সার্জেন্টের পরিচয় ছিল বাঙালির জন্য আশীর্বাদ। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস অনেক বাঙালিকে রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করেছেন জমির সার্জেন্ট। বিনিময়ে স্বাধীনতার পর উনাকে বাঙালি রক্ষার পুরস্কার স্বরূপ বিপুল সংবর্ধনা প্রদান করা হয় এবং বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামে অনেক অবাঙালিকেও অংশগ্রহণ করতে দেখেছি।
স্বাধীনতার জন্য অনেক ত্যাগ করতে হয়েছে এদেশের মানুষকে। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরেও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা হচ্ছে। রাজারকারদের আস্ফালন আজও দেখছি। নানা ষড়যন্ত্র করছে। সময় এসেছে সব ষড়যন্ত্র বন্ধ করার। পবিত্র এই ভূখ-ের জন্য লড়াই করেছিল শহীদেরা, তা রক্ষার জন্য আমাদের সংগ্রাম করে যেতে হবে।
লেখক : ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতি
সম্পাদনা: আশিক রহমান