ড. আবুল কালামকে খুন করে আলবদর বাহিনী

রবিন আকরাম : আবুল কালাম আজাদ ১৯৩৩ সালে ১ জানুয়ারি কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা উপজেলার রামকৃষ্ণপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন গণিতবিদ ও শিক্ষাবিদ ছিলেন। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ শেষে ১৯৫৮ সালের নভেম্বর মাসে সরকারি কলেজের অঙ্কের লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। পরে সরকারি জগন্নাথ কলেজের গণিত বিভাগে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন। জগন্নাথ কলেজে একপর্যায়ে গণিত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হয়ে ১৯৬৮-৬৯ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর তিনি অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি টিচিং-এ যোগ দেন। নিখোঁজ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এখানে অধ্যাপনা করেন।

অবিবাহিত আবুল কালাম আজাদ মা, চার ভাই ও চার বোনসহ থাকতেন ঢাকার আজিমপুরে। ভাইবোনদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তার বাবা বেঁচে না থাকায় তিনিই ছিলেন তাদের অভিভাবক। অবরুদ্ধ জীবনের মধ্যে তাকে ভাইবোনদের আগলে রাখতে হয়েছে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পরিবারের সবাইকে বেঁচে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন, সাহস জুগিয়েছেন।

ছাত্রজীবনে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে এই সাহসী বীর সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। শিক্ষকতাকালে (১৯৫৮-৭১) এ দেশের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সমর্থন জুগিয়েছেন। একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে বিভিন্ন কর্মসূচিতে নানাভাবে সহায়তা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অবরুদ্ধ ঢাকায় তিনি পরিবারসহ থেকে যেতে বাধ্য হন। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে না পারলেও যখনই পেরেছেন গোপনে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে কাজ করেছেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র এক দিন আগে, ১৫ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এ দেশীয় দোসরদের একটি দল তাকে আটক করে অজ্ঞাত এক স্থানে নিয়ে যায়। বদর বাহিনীর পাঁচ খুনি ১৫ ডিসেম্বর সকালে তাদের বাসায় ঢুকে পড়ে। প্রথমে তারা আজাদের সামনে রিভলবার ধরে তাকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে অকারণ তল্লাশি চালায়।

তারপর নিরপরাধ আজাদকে বাসি মুখে ধরে নিয়ে যায়। ছোট বোনটি তখন তাদের পায়ে ধরেছিল। মা বারবার তাদের বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, বাবা তোমরা বাঙালি, তোমরাও আমার ছেলে, ওকে তোমরা ছেড়ে দাও। কিন্তু কেউ তার কথা শোনেনি। নরপশুরা এই নারীকে প্রতিবারই প্রচ- ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে।

সেদিন তিন ঘণ্টার জন্য সান্ধ্য আইন উঠে যায়। স্বাধীনতার পর তার পরিবারের সদস্যরা রায়েরবাজার বধ্যভূমিসহ বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেন। তখন আজাদের ছোট ভাই ‘ইভনিং পোস্ট’-এর সম্পাদক হাবিবুল বাশার, বড় ভগ্নিপতি ইস্টার্ন নিউজ এজেন্সির মালিক গোলাম রসুল আজাদের সন্ধান নেওয়ার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। শেষ পর্যন্ত তাকে পাওয়া গেল ১৭ ডিসেম্বর বিকেলে, ডক্টর রাব্বিসহ আরো কয়েকজন জ্ঞানীগুণীর লাশের পাশে।

আবুল কালাম আজাদ নিশ্চিত ছিলেন, এ দেশ একদিন স্বাধীন হবেই। যুদ্ধের পরিস্থিতি দেখে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সম্পর্কে নিশ্চিত হলেও এই স্বাধীনতা তিনি দেখে যেতে পারেননি। সূত্র: উইকিপিডিয়া