বিদেশে গিয়েই ওদের জঙ্গিবাদে দীক্ষা

ডেস্ক রিপোর্ট : উগ্রপন্থা ও সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জড়িত অভিযোগে বিদেশে সম্প্রতি একাধিক বাংলাদেশি নাগরিক বা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিক গ্রেফতার হওয়ায় উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। দেশের ভাবমূর্তি সংকট ও প্রবাসে বাংলাদেশিদের হীনদৃষ্টিতে দেখার সমস্যা আলোচিত হচ্ছে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে সুস্পষ্ট তথ্য থেকে দেখা যায়, কিছু পশ্চিমা দেশে অবস্থানকালেই বাংলাদেশি উৎসের অধিকাংশ যুবক জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে বা ‘র‌্যাডিক্যালাইজড’ হয়েছে, বাংলাদেশে থাকাকালে যাদের কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই। অর্থাৎ জঙ্গিবাদ একটি বৈশ্বিক সমস্যা এবং উগ্রতার বিস্তার রোধে উন্নত রাষ্ট্রগুলোরও ব্যর্থতা আছে।

সর্বশেষ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক আকায়েদ উল্লাহ নিউইয়র্কের ম্যানহাটন বাস টার্মিনালে বিস্ফোরণে জড়িত সন্দেহে আটক হয়েছে। এর আগেও বিভিন্ন সময় বিদেশে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সাইফুল হক সুজন, আতাউল হক সবুজ, সাইফুল্লাহ ও জাকিসহ আরও কিছুসংখ্যক বাংলাদেশির নাম আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। তবে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক জঙ্গি তৎপরতার ব্যাপারে তথ্য রাখেন দেশের এমন একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, গত অর্ধযুগে বিদেশে যেসব বাংলাদেশি নাগরিকের উগ্রপন্থায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে, তাদের অধিকাংশের ক্ষেত্রে দেশে থাকাকালীন জঙ্গি তৎপরতার কোনো রেকর্ড ছিল না। তারা বিদেশে গিয়েই ‘সেলফ মোটিভেটেড’ বা কারও মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ হয়ে জঙ্গি সংগঠনে জড়িয়েছে। সর্বশেষ যেটা দেখা গেছে আকায়েদের ক্ষেত্রে। তাই জঙ্গিবাদের ঘটনায় কোনো বাংলাদেশি বা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিকের নাম এলেই এর দায় সংশ্নিষ্ট দেশের ওপর এককভাবে চাপানো ঠিক হবে না। এটিকে জঙ্গিবাদের ‘বৈশ্বিক সমস্যা’ হিসেবে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্নিষ্ট বিশ্নেষকরা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্নেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ বলেন, ধর্মান্ধতার চর্চা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানাভাবে রয়েছে। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। তাই জঙ্গি হয়ে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। দেশে যেমন জঙ্গিদের প্রায় নিষ্ক্রিয় করা গেছে, তেমনি বিদেশেও কেউ উগ্রবাদে জড়ালে তা নিয়ন্ত্রণ করা একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিউইয়র্কের ঘটনার পর সেখানকার বাঙালি অভিবাসীরা এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশে যেসব বাঙালি কাজ করছেন তাদের সংগঠন এ বিষয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে। এখন উভয় দেশের সরকারকেই এ সমস্যা মোকাবেলায় এগিয়ে আসতে হবে।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসির) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছানোয়ার হোসেন সানি বলেন, জঙ্গিবাদের গত কয়েক বছরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ করে দেখা যায়, বিদেশে যেসব বাংলাদেশি বা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিক উগ্রবাদে জড়িয়েছে, তারা মূলত ওই দেশের জঙ্গি মতবাদে আকৃষ্ট হয়। ঘটনার পর বাংলাদেশের গোয়েন্দারা জড়িতদের ব্যাপারে তথ্য-উপাত্ত নিয়ে দেশে তাদের অতীত কোনো অপরাধমূলক কাজের রেকর্ড পাননি।

সিটিটিসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিদেশে বসে উগ্রপন্থায় জড়িয়ে দেশে ফিরে জঙ্গিদের পুনর্গঠিত করেছে- এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরী। ২০০৭ সাল থেকে কানাডায় ছিল সে। সেখানেই উগ্রবাদের সঙ্গে নিজেকে জড়ায় তামিম। এরপর সিরিয়া হয়ে ২০১৩ সালে দেশে ফিরে পুরনো জেএমবিকে ভেঙে নব্য জেএমবি গঠন করে। মূলত তার হাত ধরেই ভয়ঙ্কর এ জঙ্গি সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে। পরে ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিসানে হামলার পর দেশ-বিদেশে তামিম চৌধুরীর নাম ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৬ সালের ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জে এক অভিযানে তামিম চৌধুরী এবং তার দুই ঘনিষ্ঠ সহচর তওসিফ হোসেন ও ফজলে রাব্বী নিহত হয়। হলি আর্টিসানে হামলার প্রধান পরিকল্পনাকারী ছিল তামিম। ওই ঘটনার দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে নব্য জেএমবির আমির তামিম নিহত হওয়ায় সংগঠনটি কোণঠাসা হয়ে পড়ে। তবে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা মনে করেন জেএমবির মতো একটি ঝিমিয়ে পড়া সংগঠনকে এমন একজন এসে চাঙা করল, যে কি-না দেশের বাইরে থেকেই উগ্রবাদের বীজ মাথায় নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছিল। তামিম চৌধুরীর ঘটনায় বিদেশি গোয়েন্দাদেরও যথেষ্ট ব্যর্থতা রয়েছে বলে মনে করেন তারা। একইভাবে যুক্তরাজ্যে থাকাকালে জঙ্গিবাদে জড়ানোর অভিযোগ পাওয়া যায় দুই বাংলাদেশি সহোদর সাইফুল হক সুজন ও আতাউল হক সবুজের বিরুদ্ধে। সিরিয়ায় আইএসের হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত হয় সুজন। চলতি বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর স্পেনের পুলিশ বিশেষ অভিযান চালিয়ে ওই দেশ থেকে সবুজকে গ্রেপ্তার করে। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যে থাকাকালে জঙ্গি তৎপরতায় সম্পৃক্ত হয় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্যের নাগরিক সামিউন রহমান। ২০১৪ সালে বাংলাদেশে আসার পর জিহাদি বইসহ তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তখন তদন্তে বেরিয়ে আসে- সিরিয়ায় নুসরা ফ্রন্টের হয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল সামিউন। তখন সে জানায়, জিহাদে অংশ নিতে এক ব্রিটিশ বন্ধুর সঙ্গে তুরস্ক হয়ে সিরিয়ায় গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে পিস টিভির উপস্থাপক অ্যান্থনির ফেসবুক ফ্যান পেজের সূত্র ধরে বাংলাদেশ থেকে জিহাদে অংশ নিতে ইচ্ছুক তরুণদের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। তরুণদের জঙ্গি সংগঠনে যুক্ত করার লক্ষ্যে ‘মগজ ধোলাই’ করতে দেশে আসে সামিউন।

পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, হলি আর্টিসানে অভিযানে নিহত নিবরাসও একসময় মালয়েশিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করত। সেখানে থাকাকালে উগ্রবাদে সম্পৃক্ত হয় সে। পরে দেশে ফেরার পর নব্য জেএমবি তাকে সংগঠনে যুক্ত করে। এ ছাড়া ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই রাজধানীর কল্যাণপুরে তাজ মঞ্জিলে ‘অপারেশন স্টর্ম-২৬’ চালায় পুলিশ। ওই অপারেশনে নিহত ৯ জঙ্গির মধ্যে একজন ছিল সেজাদ রউফ অর্ক। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক সেজাদ ছিল নিবরাসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময়ই সে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ভবন উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে ২০১২ সালের ১৭ অক্টোবর বাংলাদেশি যুবক কাজী মোহাম্মদ নাফিসকে গ্রেফতার করে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারা। তবে তার ক্ষেত্রে বিদেশে যাওয়ার আগেই জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত হওয়ার তথ্য পেয়েছিল বাংলাদেশি গোয়েন্দারা। এ ছাড়া জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকে বিভিন্ন দফায় অন্তত ৪০ জনকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয় সন্ত্রাস দমন আইনে। এ-সংক্রান্ত ৮টি মামলার তদন্ত করছে সিটিটিসি। তদন্তে ৩-৪ জন ছাড়া সিঙ্গাপুর থেকে পাঠানো বাকিরা উগ্রপন্থী তৎপরতায় জড়িত- এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সূত্র : সমকাল