মেয়র প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করতে তিন দলই মরিয়া

ডেস্ক রিপোর্ট : আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি তিন দলই তাদের মেয়র প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তিনটি দলের জেলা, মহানগর ও তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা নির্বাচনী প্রচারে এখন রংপুরে অবস্থান করছেন। বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই তারা দলীয় মেয়র প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে নেমেছেন। জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ কাল-পরশুর মধ্যে রংপুরে আসবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ টুকুর নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি দল বুধবার সন্ধ্যায় রংপুরে এসেছে। রাতে তারা স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করে নির্বাচনী প্রচারের বিষয়ে দিগ্নির্দেশনা দেন। তারা ২০-দলীয় জোটের শরিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে কেন্দ্রীয় নেতারা দলীয় মেয়র প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে অংশ নিয়েছেন। মহানগর বিএনপি’র সভাপতি মোজাফফর হোসেন বলেন, ‘দলীয় প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করতে বিএনপি’র সর্বস্তরের নেতাকর্মী মাঠে কাজ করছে। নির্বাচন নিরপেক্ষ হলে ধানের শীষের বিজয় হবে। কারণ দেশের মানুষ এখন আওয়ামী লীগকে বিশ^াস করে না। রংপুরে এরশাদের প্রতি সেই অন্ধভক্তি এখন আর নেই।

বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক ডাকসু ভিপি হাবিবুন্নবী খান সোহেল বলেন, নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে প্রচার চালাচ্ছি আমরা। এটা অনভিপ্রেত ও দুঃখজনক। আমরা আশা করি ইসি পক্ষপাতিত্ব করবেন না। কিন্তু আমাদের ‘ফ্রি ফেয়ার ইলেকশন’ হওয়া নিয়ে প্রতিদিনই সন্দেহ বাড়ছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে রংপুর মহানগরীর কাচারীবাজারে বিএনপির প্রার্থী কাওছার জামান বাবলার পক্ষে গণসংযোগকালে তিনি সাংবাদিকদের কাছে এ অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, ‘মহাজোটের প্রার্থী মাঠ গুছিয়েছে কি-না জানি না; তবে তারা যদি কনসপ্রেসি করার বিষয়ে গুছিয়ে থাকেন সেটা আলাদা কথা। রংপুরে বিএনপি এক এবং ঐক্যবদ্ধ। এই নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীককে বিজয়ী করার জন্য কাজ করছি। নির্বাচন নিরপেক্ষ হলে ভোটাররা ভোট দিতে পারলে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত হবে। এর পরেই তিনি নগরীর সিটি বাজার, সুপার মার্কেট, জাহাজ কোম্পানী মোড়, বেতপট্টিসহ কয়েকটি এলাকায় গণসংযোগ করেন। বিএনপির মিডিয়া উইংয়ের কর্মকর্তা শায়রুল কবির জানান, বিকেলে নগরীর ১০নং ওয়ার্ডের পাঠানপাড়া, ও কেরানীপাড়ায় এই নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান ভাইস চেয়ারম্যান সুলতান মাহমুদ টুকুর নেতৃত্বে একটি টিম গণসংযোগ করছেন। এসময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম, মহানগর বিএনপির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর হোসেন, সেক্রেটারী শহিদুল ইসলাম মিজু, রংপুর জেলা সভাপতি সাইফুল ইসলাম, সেক্রেটারী রইচ আহমেদ, মহানগর যুবদলের সভাপতি মাহফুজ উন নবী ডন প্রমুখ।

আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী সরফুদ্দিন আহমদ ঝন্টুর পক্ষে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ, কৃষকলীগ ও যুবলীগের আলাদা তিনটি দল এখন রংপুরে। আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সরফুউদ্দিন আহমদ ঝন্টুর সমর্থনে বুধবার বিকেলে প্রচার চালিয়েছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। এ সময় পথসভায় বক্তব্য রাখেন তারা। নগরীর ধাপ চেক পোস্ট এলাকায় নির্বাচনী পথসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহাম্মেদ হোসেন, বিশেষ অতিথি ছিলেন তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আফজাল। মেয়র প্রার্থী ঝন্টুসহ অন্যান্য নেতাও উপস্থিত ছিলেন। সভায় প্রধান অতিথি আহাম্মেদ হোসেন বলেন, ‘বিএনপি মানেই দুর্নীতি, লুটপাট, বোমাবাজি, বাসে পেট্রোল বোমা, মানুষ হত্যা। এ দল জনগণের কল্যাণে অতীতেও কিছুই করেনি, ভবিষতেও করবে না।’

তিনি জাতীয় পার্টির সমালোচনা করে বলেন, ‘এরশাদ সাহেব বিরোধী দলেও আছেন, সরকারেও আছেন। তবে রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কোন ছাড় দেবে না।’ নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে ঝন্টুকে জয়ী করার জন্য তিনি ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানান। আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আফজাল বলেন, ‘ঝন্টুকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করুন।’

মেয়র প্রার্থী ঝন্টু বলেন, ‘আমার নির্বাচনী ইশতেহার দেয়ার প্রয়োজন নেই। অতীতে যে কাজ করেছি সেটাই আমার ইশতেহার। আমি এর আগে মেয়র, পৌর চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান ও এমপি ছিলাম। তখন আমি যে উন্নয়ন করেছি অতীতে কেউ তা করেনি। ভবিষ্যতেও কেউ করতে পারবে না। এক টাকাও দুর্নীতি করিনি। প্রমাণ করতে পারলে যে কোনও শাস্তি মাথা পেতে নেব। আমার কাজের মূল্যায়ন করে জনগণ আমাকে ভোট দিবে। আমার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার জন্য নৌকা মার্কায় ভোট দেবে।

পরে কেন্দ্রীয় নেতারা, নগরীর টেক্সটাইল মোড় মর্ডান মোড়, মাহিগঞ্জসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পথসভা ও গণসংযোগ করছেন। পথসভাগুলোতে কেন্দ্রীয় নেতারা সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকা- তুলে ধরে নৌকা প্রতীকে ভোট চান।

প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি প্রার্থীদের মুখে ॥ রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে এগিয়ে থাকা প্রার্থীরা ভোটারদের নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বিশেষ করে বড় তিন দলের তিন প্রার্থী রংপুরে গ্যাস সংযোগের ব্যবস্থা করাসহ রংপুরকে আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলা, শ্যামাসুন্দরী খালের উন্নয়ন, কলকারখানা গড়ে তোলার মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণের কথা বলছেন। আবার কেউ বলছেন, মেয়র নির্বাচিত হতে পারলে তাঁর প্রথম কাজ হবে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা। আগামী ২১ ডিসেম্বর রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে সাত প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা নির্বাচনী জরিপে এগিয়ে আছেন।

সিটি কর্পোরেশনকে মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে চান মোস্তফা। নির্বাচনী পরিবেশ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত পরিবেশ স্বাভাবিক রয়েছে। রংপুরের মানুষ শান্তিপ্রিয়। আশা করি, শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে এজন্য সরকারকে আন্তরিক হতে হবে।’

জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, বিজয়ী হলে সর্বপ্রথম যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাব। এরপর নজর দেব যানজট নিরসনে। পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধান করব।’ ‘মেয়র হতে পারলে নবগঠিত এই নগরীর নাগরিক সেবা নিশ্চিত করব; যদিও অনেকটা গ্রামাঞ্চল নিয়ে সিটি গঠন করা হয়েছে। তাই সেগুলোর উন্নয়ন করা কঠিন হবে। তবে, ওই সব মানুষের সাথে আমার গভীর সম্পর্ক। তাই আমার জন্য সমস্যা হবে না। জনগণই আমার শক্তি, তাদের সেবা করতে গিয়ে আমার যেটা করা উচিত, তা-ই আমি করব। চেষ্টা করব যাতে নগরীর শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকে এবং যাতে শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রসার করা যায়। সিটি কর্পোরেশনকে পরিণত করা হবে জনগণের সত্যিকারের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে। নির্বাচনী ইশতেহার প্রসঙ্গে মোস্তফা বলেন, ‘ইশতেহার তৈরি করেছি। এখনো তা জনগণের মাঝে প্রকাশ করিনি, তবে করব।’

আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী শরফুদ্দিন আহমদ ঝন্টু বলেছেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের মনোনীত মেয়র প্রার্থী হয়ে রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন করছি। বিগত সময়েও এই সরকারের আমলে সিটি কর্পোরেশনের অনেক উন্নয়ন হয়েছে। এবার মেয়র নির্বাচিত হতে পারলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতেই নগরবাসীর জন্য কাজ করব।’

এক প্রশ্নের জবাবে ঝন্টু বলেন, ‘রংপুরের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি গ্যাস সংযোগের ব্যবস্থা করাই হবে আমার প্রথম কাজ। রংপুর পৌরসভার সঙ্গে অনেক গ্রাম এলাকা নিয়ে সিটি গঠিত হয়েছে, যেগুলোতে এখনো রাস্তাঘাট পর্যন্ত নেই। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব এলাকাকে নগরের সঙ্গে সংযুক্ত করার জন্য রাস্তাঘাটের উন্নয়ন করা হবে।

নৌকার বিজয় সম্পর্কে ঝন্টু বলেন, ‘একসময় এখানকার মানুষ নৌকা মার্কার শ্লোগান দিতে ভয় পেত, বিশেষ করে লাঙ্গল মার্কা এক সময় নৌকার গলা টিপে ধরেছিল। সেই অবস্থার এখন পরিবর্তন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের রাজনীতির ফলে এখন ছোট ছোট বাচ্চার মুখেও জয় বাংলা ও নৌকা মার্কার শ্লোগান শোনা যাচ্ছে। জনগণের এই পরিবর্তনের ফলে আমি আশাবাদী, এবার নৌকা মার্কা বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে।’

অন্য মেয়র প্রার্থী বিএনপির কাওছার জামান বাবলা। তিনি বলেন, মেয়র নির্বাচিত হলে নগরীর অন্যতম সমস্যা শ্যামাসুন্দরী খালের উন্নয়নসহ কলকারখানা গড়ে তোলার মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণে কাজ করব। তবে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি) সরকারের লোক। এ সরকারই তাদের নিয়োগ দিয়েছে। তাই তাদের দ্বারা কতটুকু নিরপেক্ষতা পাওয়া যাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।’

নির্বাচনে কালো টাকার প্রভাব সম্পর্কে বাবলা বলেন, ‘এ বিষয়ে রংপুরে মতবিনিময়সভায় খোদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংশয় প্রকাশ করেছেন। নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, কালো টাকার প্রবাহ বন্ধ করা নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশনারের এ ধরনের কথায় কালো টাকা নিয়ে যাঁরা নামার পরিকল্পনা করছেন তাঁরা উৎসাহ পেয়েছেন; কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কালো টাকার প্রবাহ বন্ধ করা জরুরি।’ তিনি আরও বলেন, অতীতে এ সরকার অনেক বিতর্কিত নির্বাচন উপহার দিয়েছে। রংপুর সিটি নির্বাচন নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু করতে সেনা মোতায়েনের বিকল্প নেই বলে তিনি মনে করেন। জাতীয় পার্টি প্রসঙ্গে বিএনপির এই প্রার্থী বলেন, দলটি আওয়ামী লীগের ‘বি টিম’। দুটিই সরকারি দল। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হলে রংপুরের জনগণ ধানের শীষে ভোট দিয়ে তাকে বিজয়ী করবে বলে দৃঢ়তার সঙ্গে জানান তিনি।

বিএনপির মেয়র প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাধা থাকলো না ॥ রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল চেয়ে সোনালী ব্যাংকের দায়ের করা রিট কার্যতালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এর ফলে বিএনপির মেয়র প্রার্থী কাওসার জামান বাবলার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে কোনও বাধা থাকলো না।

বিএনপি’র একটি সূত্র জানায়, ঋণ খেলাপির অভিযোগে বাবলার মনোনয়ন বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিল সোনালী ব্যাংক। বৃহস্পতিবার রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের হাইকোর্টে বেঞ্চ তা কার্যতালিকা থেকে বাদ দেয়ার আদেশ দেন।

একটি কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার করা হবে ॥ এদিকে, রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নতুন ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) ব্যবহার করা হবে বলে জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশন রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়। সিটির ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের ১৪১ নম্বর ভোটকেন্দ্রে (সরকারী বেগম রোকেয়া কলেজ কেন্দ্র) ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বৃহস্পতিবার বিকেলে পরীক্ষামূলকভাবে এ কেন্দ্রে ইভিএম এর মাধ্যমে মক ভোটিং শুরু হয়। জনকণ্ঠ