আগামী ভোটে ফ্যাক্টর তরুণরাই

গোলাম রাব্বানী : আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মূল ফ্যাক্টর হবে দেশের তরুণ ভোটাররা। নবম সংসদ নির্বাচন থেকে এ পর্যন্ত ভোটার তালিকায় যুক্ত হওয়া ২ কোটি ৩৫ লাখের বেশি তরুণ ভোটারের হাতেই আগামী দিনের ক্ষমতার চাবি বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন— নবম সংসদ থেকে এ পর্যন্ত যারা নতুন ভোটার হয়েছেন, তারাই আগামী দিনে ‘দেশের নেতৃত্ব নির্বাচনে’ মূল ভূমিকা পালন করবেন। তরুণরা আগামীর বাংলাদেশ কেমন দেখতে চান, সেই অনুযায়ী নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন।

বিগত বিভিন্ন সংসদ নির্বাচনের ভোটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়— দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ভোট পেয়েছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৫৭ হাজার ৩৭৮ ভোট (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ১৫৩ আসন ছাড়া)। জাতীয় পার্টি পেয়েছিল ১১ লাখ ৯৯ হাজার ৭২৭ ভোট। আর নবম সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৩ কোটি ৩৬ লাখ ৩৪ হাজার ৬২৯ ভোট। আর বিএনপি পেয়েছিল ২ কোটি ২৭ লাখ ৫৭ হাজার ১০০ ভোট। আর অষ্টম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি পেয়েছিল ২ কোটি ২৮ লাখ ৩৩ হাজার ৯৭৮ ভোট। আর আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ২ কোটি ২৩ লাখ ৬৫ হাজার ৫১৬ ভোট। সেই হিসাবে নবম থেকে এ পর্যন্ত ভোটার তালিকায় যুক্ত হওয়া ২ কোটি ৩৫ লাখ ১২ হাজার ৯৯৭ জন তরুণ ভোটার ক্ষমতায় যাওয়ার ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে।

এক্ষেত্রে যারা যত তরুণ ভোট টানতে পারবেন আগামীতে তারাই ক্ষমতায় যাবেন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে একাদশ সংসদ নির্বাচন করার জন্য অক্টোবরে চূড়ান্ত করা হবে ভোটের দিনক্ষণ। নভেম্বরের মাঝামাঝিতে হতে পারে তফসিল। আগামী বছর ৩০ অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে একাদশ সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা।
ভোটার হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নবম সংসদ নির্বাচন থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশে মোটে ভোটার হবে (সম্ভাব্য) প্রায় ১০ কোটি ৪৬ লাখের বেশি। সে হিসাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের দুই আমলে নতুন ভোটার হচ্ছে ২ কোটি ৩৫ লাখ ১২ হাজার ৯৯৭ জন। এর মধ্যে ২৭ বছর বয়সের ভোটার রয়েছে ১ কোটি ৮ লাখ ৮৪ হাজার ১৪৬ জন। আর ২১/২২ বছরের ভোটার রয়েছে ৮০ লাখ ২৮ হাজার ৮৩৩ জন। আর একেবারে নতুন তথা ১৮ বছর বয়সী ভোটার হচ্ছে ৪৬ লাখের মতো। তবে আগামী ৩১ জানুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর দেশের ভোটারের চূড়ান্ত সংখ্যা পাওয়া যাবে।

একাদশ সংসদে ভোটার সংখ্যা : চলতি বছরের হালনাগাদে রেকর্ডসংখ্যক মৃত ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাচ্ছে। হালনাগাদে বাদ দেওয়ার জন্য ১৫ লাখ ২৭ হাজারের বেশি মৃত নাগরিকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ২০০৮ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকা চালুর পর হালনাগাদে মৃত ভোটারের সংখ্যার দিক দিয়ে এটা রেকর্ড। ২০১৫ সালে সর্বোচ্চ ৭ লাখ মৃত ভোটারের তথ্য সংগ্রহ হয়েছিল। দেশের ১৬ কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে বার্ষিক মৃত্যু হার বিবেচনায় ভোটার তালিকা থেকে ১২ থেকে ১৫ লাখ ব্যক্তির তথ্য বাদ পড়ার কথা। স্মার্টকার্ড বিতরণ শুরুর পর মৃত ভোটার শনাক্তে নানা উদ্যোগের ফলে এ সংখ্যা এবার বেড়েছে বলে ইসি কর্মকর্তারা মনে করছেন।

ইসির কর্মকর্তারা জানান, হালনাগাদে ৩৩ লাখ ২৮ হাজার ৭০৯ জন নতুন ভোটার নিবন্ধিত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৬ লাখ ৮৭ হাজারেরও বেশি নারী ভোটার; আর পুরুষ ভোটার রয়েছে ১৬ লাখ ৪১ হাজারের বেশি। এবার ৩৩ লাখের বেশি ভোটার নিবন্ধিত হলেও জানুয়ারিতে নতুন প্রায় ৪৩ লাখ ভোটার তালিকায় যুক্ত হবে বলে জানান ইসির ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ। তিনি বলেন, হালনাগাদে নিবন্ধিত ৩৩ লাখ ২৮ হাজারেরও বেশি নাগরিকের বাইরে ২০১৫ সালে ১৫ বছর বয়সী ৯ লাখ ৬২ হাজার নাগরিকের তথ্য নেওয়া হয়েছিল; তারা আগামী ১ জানুয়ারি ভোটার তালিকায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত হবেন।

হালনাগাদের ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ২৫ নভেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত মৃত ভোটারদের নাম বিদ্যমান তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে। ১৮ ডিসেম্বর খসড়া ভোটার তালিকার জন্য মুদ্রণ কাজে সরবরাহ করা হবে। ২ জানুয়ারি খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পর দাবি, আপত্তি ও নিষ্পত্তি শেষে ৩১ জানুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে কমিশন। সচিব জানান, ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারিতে যাদের বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি হচ্ছে তাদের ভোটার করা হয়েছে হালনাগাদে। দেশে বর্তমানে ১০ কোটি ১৮ লাখের মতো ভোটার রয়েছে, বাদ যাবে মৃত ১৫ লাখ ২৭ হাজারেরও বেশি ভোটার; সেই সঙ্গে যোগ হবে ৪৩ লাখ নতুন ভোটার। সে হিসাবে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে দেশের ভোটার সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ১০ কোটি ৪৬ লাখের বেশি।

২০১৬ সালে ভোটার দাঁড়ায় প্রায় ১০ কোটি : ২০১৬ সালের ৩১ জানুয়ারি হালনাগাদের পরে ভোটার তালিকা প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ওই বছর জানুয়ারিতে যোগ হওয়া প্রায় ৪৪ লাখ ৩৩ হাজার নতুন ভোটার নিয়ে দেশে ভোটার সংখ্যা দাঁড়ায় ৯ কোটি ৯৯ লাখ। মোট ভোটারের মধ্যে নারী ও পুরুষের অনুপাত প্রায় সমান। হিসাবে দেখা যায়, ওই বছর দেশের মোট ভোটার সংখ্যা হয় ৯ কোটি ৯৮ লাখ ৯৮ হাজার ৫৫৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৫ কোটি ৩ লাখ ২০ হাজার ৩৬২ জন (৫০.৩৭%)। নারী ৪ কোটি ৯৫ লাখ ৭৮ হাজার ১৯১ জন (৪৯.৬৩)। তার আগে ভোটার ছিল ৯ কোটি ৬২ লাখ ১ হাজার ৪৯৭ জন। এক্ষেত্রে ২০১৫ সালের হালনাগাদের সময় ৭ লাখ ৩৫ হাজার ৮৭১ জন মৃত ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।

নতুন ভোটার— পুরুষের চেয়ে নারী বেশি : ১০ বছরে প্রথমবারের মতো ভোটার তালিকা হালনাগাদে পুরুষের চেয়ে নারীদের কাছ থেকে আবেদন বেশি পেয়েছে নির্বাচন কমিশন। এবারের হালনাগাদে নিবন্ধিতদের মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা ৭৭ হাজার ৩৯৩ বেশি বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। মাঠ পর্যায় থেকে কমিশনে যে তথ্য এসেছে, তাতে পুরুষ ভোটার সংখ্যা ১২ লাখ ৬১ হাজার ৮৩৫ জন এবং নারী ভোটার সংখ্যা ১৩ লাখ ৩৯ হাজার ২২৮ জন। সর্বশেষ হালনাগাদে নারী ভোটার সংখ্যা এগিয়ে থাকলেও মোট ভোটারের সংখ্যায় পুরুষের সঙ্গে বড় ব্যবধান কমাতে পারেনি জনসংখ্যার অনুপাতেও পিছিয়ে থাকা নারীরা। তবে নবম সংসদ নির্বাচনের আগে ২০০৭-২০০৮ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকা চালুর পর হালনাগাদে এত সংখ্যক নারী ভোটারের তথ্য সংগ্রহ আর হয়নি।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার। এর মধ্যে ৮ কোটি ১০ লাখ পুরুষ আর ৮ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার নারী।