ব্রুটাস, তুমিও?

দাউদ হায়দার : সাতাশ বছর আগে প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলাম। দেড়মাসের ‘ভ্রমণ’। শুরু নিউইয়র্ক থেকে। ওয়াশিংটন, নিউ জার্সি, বাল্টিমোর, বস্টন, ফিলাডেলফিয়া, ডালাস, অস্টিন, ফ্লোরিডা, শিকাগো, লস অ্যাঞ্জেলেস, ডেনভার, আইওয়া ঘুরে অতিশয় ক্লান্ত। ফলে আরও পাঁচটি রাজ্য বাদ দিই। যারা নিমন্ত্রণ করেছিলেন ও টিকিট পাঠিয়েছিলেন, তারা ব্যাজার হন,ক্ষুব্ধ হন,গালমন্দও করেন ফোনে। কৈফিয়ত দিই- অফিসের ছুটি শেষ, শরীর কাহিল। তারা শুনতে নারাজ।
৯/১১- এর আগে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া সহজ ছিল। খুব হ্যাপা তথা ঝুটঝামেলা পোহাতে হয়নি। ভিসার জন্য দরখাস্ত করলাম, পাঁচ বছরের জন্য মাল্টিপল ভিসা মঞ্জুর। ভিসা অফিসারের তিনটি প্রশ্ন ছিল-
১. বার্লিনে চাকরি স্থায়ী কিনা?

২. বাংলাদেশ থেকে কেন এখানে (বার্লিনে) ঠাঁই গেড়েছেন?

৩. যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরবেন কি?

ওয়াশিংটন ডিসি-তে ‘ভোয়া’ অফিসের বাংলা বিভাগে আড্ডা দিচ্ছি- মাসুমা খাতুন, খন্দকার রফিকুল হক, জিয়াউর রহমান,রমেন পাইন, ইকবাল বাহার চৌধুরী প্রমুখ গোঁ ধরলেন, ‘এসেছো থেকে যাও, ভোয়া’য় যোগ দাও।’

বললাম, ‘ধ্যাৎ। ইউরোপের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির কাছে যুক্তরাষ্ট্র একটি দেশ হলো? ডলার ছাড়া কী আছে যুক্তরাষ্ট্রে?’

-এই নিয়ে মৃদু কথা কাটাকাটি,মজা, রসিকতা।

ইকবাল বাহার চৌধুরী সিরিয়াসলি জিজ্ঞেস করলেন, ‘সত্যি ফিরে যাবে?’

‘নিশ্চয় যাবো। যুক্তরাষ্ট্র পছন্দ নয় আদৌ।’

ইকবাল বাহার চৌধুরী-‘তুমিই দ্বিতীয় ব্যক্তি।সব হাতের মুঠোয় পেয়েও ফিরে যাচ্ছো।’

‘প্রথম ব্যক্তি কে?’

ইকবাল বাহার চৌধুরী- ‘কলম্বাস,যিনি আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলেন।’

ওই যে বলেছি, ‘যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া সহজ ছিল’, ঠিক বলা নয় হয়তো। সব দেশের জন্য নিশ্চয়ই নয়। তৃতীয় বিশ্বের জন্যে তো নয়ই। যেহেতু পশ্চিম ইউরোপে (তথা জার্মানি) বাস, পশ্চিম ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের পা-চাটা, নতজানু, তাই ভিসা ইস্যু করতে মাথা খামচায় না। হোক সে মুসলিম নামধারী। খতিয়ে দ্যাখে ইউরোপের কোন দেশের। কোথায় বসবাস।

বার্লিনের আবার আলাদা মর্যাদা আছে। ১৩ আগস্ট ১৯৬১ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি পশ্চিম বার্লিনে এসে, মার্টিন লুথার স্ট্রাসে (সড়কে), পশ্চিমে বার্লিনের মেয়র-দফতর (সোইনেবার্গ জেলায়) চত্বরে জনসভায় বলেন, ‘আমিও বার্লিনের একজন (ইষ বিন আইন বার্লিনার)।’ বলতেই পারেন। যুক্তরাষ্ট্রে ৯০টির বেশি ছোটবড় শররের নাম বার্লিন। ল্যাটিন আমেরিকা,আফ্রিকায় (দক্ষিণ আফ্রিকাসহ) বার্লিন নামে শহর মোট ১০৮টি। খোদ জার্মানিতেই (দক্ষিণ জার্মানিতে) একটি গ্রামের নাম বার্লিন।

প্রায় প্রতিবছরই যুক্তরাষ্ট্রে যেতে হয় বিভিন্ন উপলক্ষে। বিভিন্ন রাজ্যে। বিভিন্ন শহরে। ইদানীং দেখছি,ইউরোপের (বিশেষত পশ্চিম ইউরোপের) নাগরিক (পাসপোর্টধারী) হওয়া সত্ত্বেও মার্কিন দূতাবাসের ছাড়পত্র নিতে হচ্ছে। আগে ছিল না। মুসলিম হলে হরেক কৈফিয়ত। বিভিন্ন কাগজপত্র দাখিল করতে হয়। এমনকি বিয়ের সার্টিফিকেটও।

এই ‘কাণ্ড’ মহানন্দে ইউরোপের দেশগুলো চালু করেছে। করবেই। আফটার অল, ‘যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া’।

গত দশ বছরে, ইউরোপের কথা বাদ দিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রে যা দেখছি, ভয়াবহ। কেন, উৎস খোজাঁর চেষ্টা করছি।

দশ বছর আগেও দেখিনি, নিউইয়র্কে (বাংলাদেশের মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে যেমন- জ্যামাইকা-আস্টোরিয়া-জ্যাকসন হাইটস) গাদা-গাদা হিজাব ও টুপিধারী। এখন চোখ ধাঁধায়। প্রতিপদে। এও বাহ্য। মসজিদের সংখ্যা অগুনতি। এমনকি মাদ্রাসাও গজিয়েছে। বাবা-মা ছয়-দশ-বারো বছরের ছেলেমেয়েকে মসজিদ ও মাদ্রাসায় পাঠাচ্ছেন। পরনে আরবি পোশাক। দেখে রীতিমতন তাজ্জব।

ঠিক যে,নিজস্ব ধর্মীয় আইডেনটিটির পরিচয়ে গরীয়ান হতে চায়। ঠিক যে,যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব জাতীয় কোনও পরিচয় নেই। নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয় নেই। সব জাতীয়তা ও ধর্ম নিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতির বলয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ, যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্বতা। সব মিলিয়ে জগাখিঁচুরি। তবে সহিষ্ণুতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা পোক্ত। কিন্তু ধর্মীয় স্বাধীনতার লেবাসে যা খুশি করবে,মানুষ হত্যা করবে, তা চলবে না। যতই ধর্মীয় হও।

এই স্বাধীনতা,মানবিকতার ‘ধর্ম’ ভুলে গিয়ে বাংলাদেশের আকায়েদ উল্লাহ (জার্মান টিভির খবরে এই নাম উচ্চারিত) হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে ইসলামিক প্রেরণায়।

ইসলাম কি নিরপরাধ মানুষ হত্যার কথা বলেছে কোথাও?

আকায়েদ কেন হত্যাকে ‘ইসলামি’ ভেবেছে? কে এই মন্ত্রণাদাতা? আকায়েদ বলেননি কে মন্ত্রণাদাতা। হতে পারে, কেউই মন্ত্রণাদাতা নয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মুসলিম বিদ্বেষের কারণে তৎপর। তাহলেও প্রশ্ন, এই মানুষটি সব সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন গত সাত বছরে, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমল থেকে।

আজ আরও সুযোগ পেয়ে কেন হত্যায় উদ্বেল? নাকি ইসলামি উন্মাদনা? প্রেম-সহজতা-বন্ধুতায় যে প্রশ্ন, সেকসপিয়রের ‘জুলিয়াস সিজার’ নাটকে আছে- ‘ব্রুটাস, তুমিও?’

আকায়েদ উল্লাহকে যুক্তরাষ্ট্র আশ্রয় দিয়েছে, কাজের অনুমতি দিয়েছে, ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়েছে। কোনও কিছুতেই জোরজবস্তি করেনি, কোনও কিছুতেই বাধা দেয়নি, সন্দেওভাজনের তালিকাভুক্ত করেনি, জেনেছে দিব্যি ‘ভালো মানুষ’। সেই কিনা ব্রুটাস? বিশ্বাসঘাতক?

বাংলাদেশিরা কি যুক্তরাষ্ট্রে ব্রুটাস নামধারী হচ্ছে? ভবিষ্যৎ কী, দেশের-দশের?

লেখক: কবি ও সাংবাদিক। বাংলাট্রিবিউন