ইসলামের দৃষ্টিতে অসিয়তের গুরুত্ব

ওয়ালি উল্লাহ সিরাজ: অসিয়ত শব্দের অর্থ হলো- মিশ্রণ করা, কল্যাণ কামনা করা। আর শরিয়তের পারিভাষিক অর্থ- মৃত্যুর পরের জন্য নিজের মালিকানা কিছু অংশ বিনিময় ব্যতিরেকে কাউকে দিয়ে দেয়া। (মেশকাত) শাব্দিক অর্থে যে কোন কাজ করার নির্দেশ প্রদানকে অসিয়ত বলা হয়। পরিভাষায় ব্যক্তি বিশেষের মৃত্যুর পরে সম্পাদন করার জন্য মৃত্যুকালে যে নির্দেশ দেওয়া হয় তাকেই অসিয়ত বলা হয় (মায়রিফুল কুরআন)

অসিয়তের গুরুত্ব : ইসলামের অন্যান্য বিধিবিধানের মতো মরহুমের অসিয়তের গুরুত্ব রয়েছে। এরশাদ হয়েছে, ‘যারা তার অসিয়ত শুনে নেয়ার পর (নিজেদের স্বার্থে) তা পরিবর্তন করে নিলো তাদের জানা উচিত, এটা পরিবর্তনের অপরাধের দায়িত্ব তাদের ওপরই বর্তাবে, আল্লাহ পাক সব কিছুই শোনেন এবং সব কিছুই তার জানা। অবশ্য কারো যদি অসিয়তকারীর কাছ থেকে আশঙ্কা থাকে যে, কারো প্রতি অবিচার করে গেছে, কিংবা বেইনসাফ করা হয়েছে, তাহলে মূল বিষয়টি সংশোধন করে দেয়, এতে তার কোনো দোষ হবে না; আল্লাহ পাক বড়ই ক্ষমাশীল, মেহেরবান।’ (সূরা বাকারা : ১৮১-১৮২)।

অসিয়তের হুকুম : যার জন্য অসিয়ত করা হয় সে যখন অসিয়ত কবুল করবে তখন অসিয়তের বস্তুতে তার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে, তা সে হস্তগত করুক আর নাই করুক। অসিয়ত যদি বস্তু সম্পর্কে হয়, যেমন: জমি, ঘর-বাড়ি, গবাদিপশু ইত্যাদি ইচ্ছামত ব্যবহার করতে পারে বা দান খয়রাতও করতে পারবে। অসিয়তকারীর মৃত্যুর পর অসিয়তের বস্তুতে কিছু বৃদ্ধি ঘটলে যেমন : গাছে ফল ধরল, গাভী বাচ্চা দিল ইত্যাদি তাও অসিয়তের অন্তর্ভুক্ত হবে। যদি বস্তুর উপকার-উপযোগ সম্পর্কে অসিয়ত করা হয় তবে কোন মেয়াদের উল্লেখ না থাকলে জীবনভর এবং মেয়াদের উল্লেখ থাকলে মেয়াদ পর্যন্ত তার ভোগাধিকার লাভ করবে। কিন্তু বস্তুর মালিকানা থাকবে ওয়ারিশদের। যেমন ওসিয়ত করা হল, অমুক বাড়িটিতে যেন অমুককে বাস করতে দেয়া হয়। তবে ঐ ব্যক্তি যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন সে উক্ত বাড়িতে বসবাস করতে পারবে। তার মৃত্যুর পর তার ওয়ারিশগণ সেখায় বাস করতে পারবে না বরং বাড়িটি কাউকে দেয়ার অসিয়ত থাকলে সে ব্যক্তির হাতে হস্তান্তর করা হবে অন্যথায় অসিয়তকারীর ওয়ারিশগণের কাছে প্রত্যার্পিত হবে। যে বস্তু সম্পর্কে অসিয়ত করা হয় তা মাল বা এ জাতীয় কোনকিছু হতে হবে। অসিয়তকৃত বস্তু কেবল মাল হলেই চলবে না বরং তার মূল্যও থাকতে হবে। কোন মুসলমানের পক্ষে মাদকদ্রব্যের অসিয়ত বৈধ নয়।
অসিয়তকারীর যে যে যোগ্যতা থাকতে হবে : ১. প্রাপ্ত বয়স্ক ও সুস্থ বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন হওয়া। ২. স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে অসিয়ত করা। পরিহাস স্বরূপ চাপের মুখে কিংবা ভুলবশত অসিয়ত করলে তা শুদ্ধ হবে না। ৩. অসিয়তকৃত সম্পত্তি বা তার বেশি ঋণ না থাকা। এরূপ ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির অসিয়ত সহীহ নয়। কেননা ঋণ পরিশোধ করা ওয়াজিব আর অসিয়ত করা নফল। নফলের উপর ওয়াজিব অগ্রাধিকার রাখে। এ কারণে পরিত্যক্ত সম্পত্তি দ্বারা প্রথমে ঋণ পরিশোধ করতে হয় এবং তারপর অবশিষ্ট থাকলে অসিয়ত পূরণ করতে হয়।

অসিয়ত বৈধ হওয়ার জন্য যে সকল শর্ত প্রজোয্য : অসিয়ত বৈধ হওয়ার একটি প্রকৃষ্ট প্রমাণ হযরত সাদ ইবনে আবূ ওয়াক্কাস (রা.) এর অসিয়তের ঘটনা। তিনি অসুস্থ ছিলেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ (সা.) তার শয্যাপাশে উপস্থিত হলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার সমস্ত সম্পত্তি অসিয়ত করতে চাই। নবী করীম (সা.) বললেন, না। তিনি বললেন, তাহলে দুই-তৃতীয়াংশ? নবী করীম (সা.) বললেন, না। তিনি বললেন, তাহলে এক-তৃতীয়াংশ? নবী করীম (সা.) বললেন, এক-তৃতীয়াংশ। তুমি তোমার ওয়ারিশদেরকে পরমুখাপেক্ষী রেখে যাওয়ার চেয়ে তাদেরকে সম্পদশালী রেখে যাওয়া উত্তম।

অসিয়তের প্রকার সমূহ : বিশ্বখ্যাত ফাতওয়া গ্রন্থ আদ দুররুল মুখতারে অসিয়তকে চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে- ১. ওয়াজিব : সালাত, সাওম, যাকাত ও হজ্জসহ আল্লাহ ও বান্দার যে সমস্ত হক আদায় থেকে যায় সে সম্পর্কে অসিয়ত করে যাওয়া ওয়াজিব।
২. মুবাহ : ধনি ব্যক্তি সম্পর্কে অসিয়ত করা মুবাহ। ধনি ব্যক্তি যদি ইলম অনুরাগী ও সৎকর্মপরায়ণ হয় অথবা এমন আত্মীয় হয় যে তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে কিংবা এমনিতে ধনী হলেও তার পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি হয় তবে তার জন্য অসিয়ত করা উত্তম হবে। ৩. মাকরূহ : ফাসিক পাপাচারীর জন্য অসিয়ত করা মাকরূহ। তবে অসিয়তের ফলে যদি ফাসিক ব্যক্তির সংশোধনের আশা করা যায় যেমন চোর হয়ত চুরির কাজ ছেড়ে দিবে, তবে তার জন্য অসিয়ত করা উত্তম হবে।
৪. মুস্তাহাব : এছাড়া অন্য সবক্ষেত্রে মুস্তাহাব।

অসিয়ত বাতিলকরণ : অসিয়তকারী যদি সরাসরি অসিয়ত বাতিল করে দেয় তবে অসিয়ত বাতিল হয়ে যায়। অসিয়তকারী সম্পূর্ণরূপে উন্মাদ হয়ে গেলেও অসিয়ত বাতিল হয়ে যায়। বেহুঁশ হয়ে গেলে বাতিল হয় না। অসিয়তকৃত ব্যক্তি অসিয়তকারীর আগে মারা গেলে তাতেও অসিয়ত বাতিল হয়ে যাবে। অসিয়তকৃত বস্তু বিনষ্ট হয়ে গেলেও অসিয়ত বাতিল হয়ে যায। যদি সে বস্তুটি সুনির্দিষ্ট হয়। যেমন একটি ছাগল অসিয়ত করার পর ছাগলটি মারা গেলে অসিয়ত বাতিল হয়ে যাবে। অসিয়তকৃত বস্তু চুরি বা ছিনতাই হওয়র পর ফিরে পাওয়া গেলে অসিয়ত বাতিল হবে না।