রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে জাতিসংঘের সাথে মিয়ানমারের সম্পর্কে টানাপোড়ন

মাছুম বিল্লাহ : আন্তর্জাতিক সমালোচনা এবং অবরোধ আরোপের আশঙ্কা আরো বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে যুদ্ধংদেহী মিয়ানমার এখন জাতিসংঘের সাথে তার সম্পর্ক নিয়ে ভাবছে। একসময়ের গণতন্ত্রের বীরাঙ্গনা এবং জাতিসংঘের প্রিয়ভাজন দেশটির বেসামরিক নেত্রী অং সান সু চি মুসলিম রোহিঙ্গাদের প্রতি সরকারের আচরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কূটনৈতিক আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণ করেছেন।

জাতিসংঘের নতুন করে অবরোধ আরোপ রুখে দেওয়া এবং রাখাইনের পুনর্গঠন ও সমন্বয় সাধনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততার প্রয়াস চালানোর জন্য চলছে ত্রিমুখী আক্রমণে।

এই মুগ্ধতা সৃষ্টিকারী আক্রমণে অনেকটাই টার্গেট মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার মুসলিম দেশগুলো। নতুন করে অবরোধ আরোপের জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রয়াসের পেছনে এসব দেশই সবচেয়ে বেশি সক্রিয় বলে মিয়ানমার মনে করছে।

সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করার জন্য গত সপ্তাহে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)ভুক্ত দেশগুলোর কাছে যাওয়ার জন্য কূটনীতিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইয়াঙ্গুনের কূটনীতিকদের মতে, মিয়ানমারের কূটনীতিকদের ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে, তারা যেন মুসলিম দেশগুলোকে বোঝায়, মিয়ানমার সরকার ‘ধাপে ধাপে’ সব উদ্বাস্তুকেই ফিরিয়ে নেবে।

একইসাথে দেশটির বেসামরিক নেত্রী, স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি রাখাইনের জন্য সরকারি পরিকল্পনা তদারকি ও বাস্তবায়নে সহায়তা করার জন্য একটি আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা কমিটি ঘোষণা করেছেন। এর প্রধান করা হয়েছে সাবেক থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. সুরাকিয়ার্ত সাথিরাথাইকে।

গত আগস্টে নিরাপত্তা বাহিনীর বিদ্রোহ দমন অভিযানের ফলে মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য রাখাইনে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে সাত লাখেরও বেশি মুসলিম রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে যায়।

জাতিসংঘ এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই একে ‘জাতি নির্মূল অভিযান’ হিসেবে অভিহিত করেছে, জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রধান জায়েদ রাদ আল হোসাইন আরো স্পষ্টভাবে বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন, ‘গণহত্যার’ প্রমাণ রয়েছে এবং যারা এজন্য দায়ী তাদেরকে (মিয়ানমারের শীর্ষ জেনারেলদের) হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার করা উচিত।

গত সপ্তাহে আবারো উদ্বেগ বেড়েছিল, যখন জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ মুসলিম রোহিঙ্গা এবং মিয়ানমারের অন্যান্য সংখ্যালঘুদের নিয়ে জেনেভায় বিশেষ অধিবেশনে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। এতে ‘মিয়ানমারের বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যে পরিকল্পিত এবং ভয়াবহ মাত্রায় মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নির্যাতনের তীব্র নিন্দা করা হয়।’

জেনেভায় জাতিসংঘে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত হতিন লিনস্ট্রেনয়াসলি অধিবেশন চলাকালে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রাখাইনের পরিস্থিতি বুঝতে পারছে না, তাদের আরো ভালোভাবে বিষয়টি উপলব্ধি করা উচিত।

সামরিক বাহিনীর বলপূর্বক বাস্তুচ্যুতি, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া, ধর্ষণ, হত্যাকা-সহ অতিরিক্ত শক্তিপ্রয়োগ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ মিয়ানমার সরকার অব্যাহতভাবে অস্বীকার করে আসছে। কিন্তু তাতে বেশিরভাগ মুসলিম দেশ, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপিয়ান দেশগুলোর ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি।

তারা হামলাকারীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছে। কিন্তু দেশটির বেসামরিক নেত্রী জোরালোভাবে সামরিক বাহিনীর নিন্দা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছেন।

জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের ভোটাভুটিতে একতরফা চিত্র দেখা গেলেও (৩৩টি দেশ মিয়ানমারে বিপক্ষে, চীনসহ তিনটি দেশ পক্ষে এবং ৯টি দেশ ভোট দানে বিরত থাকে) যেসব দেশ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চায় এবং যারা সমন্বয়ধর্মী পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং মিয়ানমার সরকারকে ইতিবাচক ব্যবস্থা গ্রহণের সময় শেষ হওয়া নিয়ে হুঁশিয়ার করে দিতে চায়, তাদের মধ্যে বিভাজন বেশ ভালোভাবেই দেখা গেছে।

কঠিন অবরোধ এড়াতে হলে মিয়ানমারকে এখনই কিছু করতে হবে, এমন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে ইন্দোনেশিয়া। বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দিয়ে বলেছে, তারা মনে করে এর মাধ্যমে মিয়ানমার সঙ্কট অবসান এবং সব নাগরিককে রক্ষার কাজে দেশটিকে উৎসাহিত করা যাবে।

পরিষদ অধিবেশনে দেশটির প্রতিনিধি জানান, তারা মনে করে, এই প্রস্তাবের ফলে মানবিক সঙ্কটের একটি সমাধান দ্রুত বের হবে এবং বাস্তব ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণে যেকোনো বাধা দূরে সহায়ক হবে।

ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদি, তিনি নিজেও একজন পেশাদার কূটনীতিক, গত আগস্টে রাখাইনে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর প্রথম আন্তর্জাতিক নেতা হিসেবে মিয়ানমার সফর করেছিলেন।

সামরিক অভিযান শুরুর এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি রাজধানী নেপিদোতে গিয়ে সু চি এবং সামরিক বাহিনীর প্রধান মিন হ্ললাইঙের সাথে সাক্ষাত করেছিলেন।

এই সমর্থন এবং আগ্রহ প্রদর্শনের জন্য সু চি (তিনি দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীও) তাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। সমাধান পেতে রেতনো অব্যাহতভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তিনি এমনকি ড. সুরাকিয়ার্তের কমিটির একজন সদস্যও হয়েছেন।

রাখাইন পরিস্থিতি এবং ইসলামি চরমপন্থীদের মোকাবিলার উপায় নিয়ে আলোচনা করার জন্য ইন্দোনেশিয়ার একটি প্রতিনিধিদল কয়েক দিনের মধ্যে মিয়ানমার যাচ্ছে।

তাদের মধ্যে সাবেক সামরিক বাহিনীর প্রধান এবং রাজনৈতিক আইনগত ও নিরাপত্তাবিষয়ক জাতির সমন্বয়কারী মন্ত্রীর (তিনি সাধারণভাবে বিরানতো নামে পরিচিত, তিনি আসলে অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল আগাস বিদজোজো) থাকবেন।

এই মন্ত্রীকে বিবেচনা করা হয় ইন্দোনেশিয়ার সামরিক বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবী হিসেবে। তিনি বর্তমানে দেশটির শীর্ষ থিঙ্ক ট্যাঙ্কের সদস্য হিসেবে নেপথ্য কূটনীতিতেও অংশ নিচ্ছেন।

মিয়ানমারের তীব্র সমালোচকসহ বেশির ভাগ দেশই মানবিক সহায়তা এবং সাহায্য দিচ্ছে। পরিষদ অধিবেশনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সম্পাদিত প্রত্যাবাসন চুক্তিটির ব্যাপক প্রশংসা করা হয়।

তাছাড়া সেখানকার পরিস্থিতি তদারকি ও নজরদারি করার জন্য তিন বছরের জন্য সেখানে জাতিসংঘের উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তার কথাও জানানো হয়।

তবে পরিষদ আগে যে ‘তথ্যানুসন্ধানী মিশন’ পাঠানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সে ব্যাপারটির কোনো সুরাহা হয়নি। এখন পর্যন্ত মিয়ানমার সরকার তাদেরকে দেশে প্রবেশ করা এবং রাখাইনে মানবাধিকার নিয়ে তদন্ত করার অনুমতি দেয়নি।

অনেক দেশ, বিশেষ করে ইউরোপিয়ান দেশগুলো তদন্ত সম্পন্ন করার জন্য এই মিশনকে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে।

তারা বাংলাদেশ এবং অন্যত্র পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ এবং সাক্ষী নিচ্ছে। গত সপ্তাহে হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের দারুসম্যান বলেন, মিয়ানমারে প্রবেশ করতে না পারায় তাদের কাজে বাধার সৃষ্টি হচ্ছে।

তাছাড়া মিয়ানমার সরকারের অস্বীকৃতিও একটি সমস্যা বিবেচিত হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা দেশটির বাইরে থেকে বিপুল তথ্য সংগ্রহ করেছি। আমরা তা করে যাব।

তিনি অবশ্য তার দলকে রাখাইনে প্রবেশ করার সুযোগ দেওয়ার জন্য নতুন করে মিয়ানমার সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমাদের আরো অনেক প্রশ্নের জবাব জানা দরকার।

বিশেষ করে রাখাইনে ২৫ আগস্ট যে হামলার পর ‘শুদ্ধি অভিযান’ শুরু হয়েছে বলে যে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, সে ব্যাপারে আরো তথ্য প্রয়োজন। তাছাড়া নিরাপত্তা বাহিনী সেখানে ২৫ আগস্টের আগেই কোনো প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল কিনা তা-ও জানা দরকার।

সরকার মনে করছে, তারা এখন অনেক সমস্যায় ভারাক্রান্ত। তাদের ধারণা, রাখাইনের সহিংসতা এখন নিয়ন্ত্রণে এসেছে, এখন উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের বিপুল দায়িত্ব সামলাতে হবে। তাদের জন্য বাড়িঘর, হাসপাতাল, স্কুল নির্মাণ করতে হবে, জরুরি প্রয়োজন মেটাতে হবে।

এসব কাজ সম্পন্ন করার জন্য ‘ইউনিয়ন এন্টারপ্রাইজ ফর হিউমেনিটেরিয়ান এসিস্ট্যান্স, রিসেটলমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইন রাখাইন’ নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর দায়িত্বে রয়েছেন খোদ অং সান সু চি।

এই কমিটি রাখাইনের জন্য কফি আনান পরামর্শক কমিশন যেসব সুপারিশ করেছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করবে। মিয়ানমার সরকার এসব সুপারিশ পুরোপুরি এবং সাথে সাথেই গ্রহণ করেছে। বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও তা অনুমোদন করেছে।

তবে মিয়ানমার এবং জাতিসংঘের মধ্যকার সম্পর্ক তিক্তই থেকে গেছে বলে দেশটির সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে। সম্প্রতি মিয়ানমার সফরের সময় পোপ ফ্রান্সিসও জাতিসংঘের সাথে সম্পর্ক ঝালিয়ে নিতে সু চির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

কফি আনানের কাছ থেকে একটি বার্তাও সু চির কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

অবশ্য জাতিসংঘেরও উচিত সরকারের সাথে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, মনে করছেন সরকারি সিনিয়র কর্মকর্তারা।

অব্যাহত বৈরিতা কেবল বিচ্ছিন্নতাই বাড়াবে। নতুন করে কিভাবে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা যায়, তার পথ বের করার দায়িত্ব সরকারেরই। এই সম্পর্কের ভবিষ্যত এখন নির্ভর করতে পারে মিয়ানমারের জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত নিয়োগ করার ওপর।

যেকোনো সময় এই নিয়োগ হতে পারে। সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র সাউথ এশিয়ান মনিটরকে বলেন, ‘জাতিসংঘকে এখন বিশেষ দূত নিয়োগে তার আগ্রহ দেখাতে হবে। আর এই দূত সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে।’- সাউথ এশিয়ান মনিটর।