আজ বিশ্ব সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিবস
চ্যালেঞ্জের মুখে কমিউনিটি ক্লিনিকে স্বাস্থ্যসেবা

ডেস্ক রিপোর্ট : সারা দেশে সাড়ে ১৩ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের বড় অর্জন আর বিশ্বের অনেক দেশের কাছেই রোল মডেল। যা সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্যক্রমের বৈশ্বিক কর্মসূচির বিবেচনায়ও বড় এক উদাহরণ।

কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবে বড় রকমের গোড়ায় গলদ থাকার কারণে ভালো একটি উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। একদিকে জরাজীর্ণ স্থাপনা, বিকল যন্ত্রপাতি, অপর্যাপ্ত ওষুধ; অন্যদিকে অদক্ষ জনবলের হাতে গুরুত্বপূর্ণ সব ওষুধ তুলে দেওয়ার ফলে মাঠপর্যায়ে বিনা মূল্যের স্বাস্থ্যসেবা কতটা নিরাপদ তা নিয়ে সংশয় দিন দিন বাড়ছেই। এমন অবস্থার মধ্য দিয়ে আজ মঙ্গলবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য : অধিকারের জন্য জাগো’।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ২০১২ সালে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বৈশ্বিক অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়েছে। কিন্তু ২০৩২ সালের মধ্যে এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অন্যতম উপায় কমিউনিটি ক্লিনিকের ‘চিকিৎসা কার্যকরিতা’য় যেমন অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি রয়েছে, তেমনি দেশে মাথাপিছু চিকিৎসা ব্যয়ও এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সার্ক দেশগুলো মধ্যে বাংলাদেশেই মাথাপিছু চিকিৎসা ব্যয় বেশি। আবার সরকারের স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু বরাদ্দও খুব নগণ্য। আবার চিকিৎসায় রোগীকে নিজের পকেট থেকে ব্যয় করতে হয় মোট খরচের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি।

ফলে অঙ্গীকার পূরণে গত পাঁচ বছরে খুব একটা অগ্রসর হওয়া যায়নি।

কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসা ঝুঁকির একটি বড় উদাহরণ পাওয়া যায় প্রমত্তা মেঘনার পেট ফুঁড়ে জেগে ওঠা জনপদ চরকুশরিয়ায়। ওই জনবসতিটি বর্ষায় বিচ্ছিন্ন, শুকনায় দুর্গম। একটি উন্নয়ন সংস্থার কর্মী সোলায়মান পেশাগত কাজে সেখানে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ছুটে যান কাছের কমিউনিটি ক্লিনিকে। দায়িত্বরত সিএইচসিপি (হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার) প্যারাসিটামলের সঙ্গে দিলেন একটি অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ। শিক্ষিত যুবক সোলায়মান নিজের উপসর্গ আর ওষুধের ধরন নিয়ে দ্বিধায় পড়ে ওষুধ না নিয়েই বেরিয়ে আসেন ওই ক্লিনিক থেকে। বুকে ব্যথা আর শ্বাসকষ্ট নিয়েই অনেক পথ হেঁটে এবং বাকিটা ট্রলারে চড়ে চলে যান উপজেলা সদরে।

সোলায়মান বলেন, ‘ওই দুর্গমেও একটি ক্লিনিক পেয়ে আশি খুবই খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু ভেতরে গিয়ে চরম হতাশ হয়েছি। কর্তব্যরত স্বাস্থ্যকর্মী আমার প্রেসারটিও দেখতে পারলেন না—যন্ত্র অকেজো থাকায়; কিন্তু আমাকে আন্দাজেই ওষুধ দিয়ে ফেললেন। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম তিনি—না ডাক্তার, না ডিপ্লোমা, না প্যারামেডিক্স! তাই তিনি কিভাবে আমাকে ওই ওষুধ দিলেন? তাও আবার অ্যান্টিবায়েটিক! আমি কিভাবে তাঁর ওষুধের ওপর ভরসা করতে পারি?’

ওই রোগীর প্রশ্নকেই আরো তীব্র ভাষায় তুলে ধরেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুস সবুর। তিনি বলেন, ‘দেশের আইন অনুসারে সিএইচসিপিদের চিকিৎসা দেওয়ার কোনোই বৈধতা থাকতে পারে না। সরকারের টাকা যাচ্ছে, ওষুধ যাচ্ছে, রোগীও আসছে কিন্তু আসলে হচ্ছেটা কী?  মাত্র কয়েক সপ্তাহের কথিত প্রশিক্ষণ দিয়েই কি একজন মানুষের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব? এতে তারা মানুষের উপকার করছেন, না অপকার করছেন সেটাই বড় প্রশ্ন। এই ব্যবস্থাপনাটিকে সংস্কার করা জরুরি। ’

সরকারের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের সাবেক মহাপরিচালক (বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত সচিব পদমর্যাদায় সরকারের কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালক) আসাদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ ২০১২ সালে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বৈশ্বিক অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়েছে। টার্গেট ২০৩২ সাল। কিন্তু গত পাঁচ বছরে সেই লক্ষ্য খুব একটা এগোতে পারেনি। তিনি বলেন, কেবল সরকার আর দাতাদের টাকায় সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা করা যায় না। এ ক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণও জরুরি। এ জন্য তিনি স্বাস্থ্য বীমা চালুর পরামর্শ দেন।

আন্তর্জাতিক সংস্থা হেলথ ফিন্যান্স অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের বাংলাদেশি ব্যবস্থাপক ড. মুরসালীনা ইসলাম বলেন, চিকিৎসা খরচ এখন বড় একটি সমস্যা। মানুষ খরচের ভয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে চায় না। আবার কম খরচে বা বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিতে যেখানে যায়, সেখানে স্বাস্থ্যসেবার মানে তারা সন্তুষ্ট হতে পারে না। অন্যদিকে সরকারের তরফ থেকে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দও বেশি বাড়ানো যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিকভাবে যেখানে একজন মানুষের মাথাপিছু স্বাস্থ্যের জন্য বছরে বরাদ্দ থাকার কথা ৮৫-১১২ মার্কিন ডলার, সেখানে বাংলাদেশে এখন মাথাপিছু স্বাস্থ্য বরাদ্দ আছে মাত্র ৩৭ মার্কিন ডলার; যা খুবই নগণ্য।

সরকারের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের সমীক্ষার তথ্য তুলে ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে মাথাপিছু চিকিৎসা ব্যয় সর্বোচ্চ। আবার রোগীদের চিকিৎসা ব্যয়ে ব্যক্তিগত খরচও বাংলাদেশে বেশি। ভারতে একজন মানুষের মোট চিকিৎসা খরচের মধ্যে নিজ পকেট থেকে যায় ৬২ শতাংশ, পাকিস্তানে যায় ৫৬ শতাংশ, নেপালে ৪৭ শতাংশ, ভুটানে ২৫ শতাংশ, মালদ্বীপে ১৮ শতাংশ। কিন্তু এ হার বাংলাদেশে ৬৭ শতাংশ।

স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের পরিচালক মো. নুরুজ্জামান বলেন, চিকিৎসা খরচ সামাল দিতে গিয়ে দরিদ্র মানুষ আরো দরিদ্র হয়ে পড়ছে। মানুষ বাধ্য হয়ে সহায়-সম্পদ বিক্রি করে দিচ্ছে।

অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘আমাদের দেশে নানা কারণে মানুষের স্বাস্থ্যের পেছনে খরচ বেড়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ব্যয় হচ্ছে ওষুধে। এরপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা, জায়গামতো চিকিৎসা না পাওয়া, চিকিৎসক না থাকা, দালালের তৎপরতা, সরকারি হাসপাতালে পরিবেশ ভালো না থাকা, প্রাইভেট হাসপাতালে অতিমাত্রায় মুনাফা আদায়, অযথা বেশি ওষুধ দেওয়া, ভালো যোগাযোগব্যবস্থার অভাব, সরকারি যন্ত্রপাতি ও ওষুধ কেনাকাটায় দুর্নীতি, অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনাসহ আরো কিছু বিষয়ে স্বাস্থ্য খাতে খরচ বেড়ে যায়, কিন্তু সেই হারে সুবিধা পাওয়া যায় না।’

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় গত বছর টাঙ্গাইলের কালিহাতী, মধুপুর ও ঘাটাইল-তিন উপজেলায় দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারীদের জন্য একটি পাইলট প্রকল্প চালু করছে সরকার। তবে এ কার্যক্রম এখনো তিনটি উপজেলায় সমানভাবে শুরু হয়নি। আবার যতটুকু শুরু হয়েছে তাও ভালোভাবে সচল নেই।

সূত্র : কালের কণ্ঠ