আসল ডিবি নাকি নকল বোঝা দায়

ডেস্ক রিপোর্ট : ব্যাংক থেকে শ্রমিকদের বেতনের ৪০ লাখ টাকা তুলে মাইক্রোবাসে করে উত্তরার অফিসে ফিরছিলেন টোকিও মুড নামে একটি গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষক সাঈদ মাহমুদ আল ফিরোজ। পথে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয় দিয়ে একদল দুর্বৃত্ত মাইক্রোবাসটি থামিয়ে জোর করে তাতে উঠে পড়ে।

তারা সাঈদ মাহমুদ ও তাঁর গাড়িচালকের হাত-পা বেঁধে মুখ স্কচটেপ আটকে দেয় এবং মাইক্রোবাসটি চালিয়ে নির্জন এলাকায় নিয়ে যায়। সারা পথ মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে রাখা হয় দুজনের। একপর্যায়ে সুযোগ বুঝে টাকা ছিনিয়ে নিয়ে দুজনকে রাস্তায় ফেলে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

গত বৃহস্পতিবার উত্তরার এক নম্বর সেক্টরের ১৩ নম্বর সড়কে দিনেদুপুরে এ ঘটনা ঘটে। সাঈদ মাহমুদ এবং ওই মাইক্রোবাসচালক এখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি।

গত রবিবার এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওই গার্মেন্টের কর্মকর্তা রাসেল হাওলাদার বলেন, ‘প্রতি মাসে আমরা ৭-৮ তারিখের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন দিই। বেতনের জন্যই সেদিন ব্যাংক থেকে টাকা তোলা হয়েছিল। ডিবি পরিচয়ধারী ডাকাতরা সেগুলো এভাবে ছিনিয়ে নেওয়ায় এখনো ২০০ শ্রমিককে বেতন দিতে পারিনি। ’

গত ১ অক্টোবর রাত ৮টার দিকে মগবাজার এলাকায় হাতে ওয়্যারলেসসেট এবং কোমরে পিস্তল-হাতকড়া নিয়ে চেকপোস্ট বসিয়েছিল পুলিশ পরিচয়ধারী দুর্বৃত্তরা।

হাত নেড়ে সংকেত দিয়ে একটি অটোরিকশা থামায় তারা। অটোরিকশার ভেতরে ছিলেন কলেজ শিক্ষক রাশেদ মিয়া। তাকে নামিয়ে মাইক্রোবাসে তুলে নেয় তারা। মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে মারধর করে সঙ্গে থাকা টাকা ও মোবাইল ফোন নিয়ে পরে ছেড়ে দেয়। ঘটনাস্থলের আশপাশের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় ঘটনাটি ধরা পড়ে। ফুটেজে দুর্বৃত্তদের একজনের ছবি পাওয়া গেলেও গতকাল পর্যন্ত সে ধরা পরেনি।

রাশেদ মিয়া বলেন, অটোরিকশায় বাসায় ফেরার পথে হাতিরঝিলের বিপরীত পাশের রাস্তা থেকে তাঁকে ডিবি পরিচয় দিয়ে সাদা পোশাকের দুর্বৃত্তরা মাইক্রোবাসে তুলে নেয়। তাদের হাতে ওয়্যারলেস সেট ও কোমরে অস্ত্র-হাতকড়া ছিল। মাইক্রোবাসে তুলেই দুর্বৃত্তরা তার হাত ও চোখ বেঁধে ফেলে এবং মারধর করে। এরপর তার কাছ থেকে নগদ চার হাজার টাকা, দুটি মোবাইল ফোন সেট, পিন নম্বরসহ একটি এটিএম কার্ড নিয়ে যায়। পরে পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, ওই এটিএম কার্ড দিয়ে নয়াটোলা ডাচ্ বাংলা ব্যাংকের বুথ থেকে ২৫ হাজার টাকা তুলে নেয়।

এভাবে গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয় দিয়ে রাজধানীসহ সারা দেশে ছিনতাইয়ের ঘটনা বাড়ছে। সাদা পোশাকে থাকা দুর্বৃত্তরা নিজেদের ডিবি সদস্য পরিচয় দিয়ে গাড়ি থামিয়ে অস্ত্রের মুখে যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা, মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছে। নকল পুলিশের একের পর এক ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। সাদা পোশাকে পুলিশ পরিচয় দিয়ে বাসা থেকেও লোকজনকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায় বিভিন্ন সময়।

নিয়ম অনুযায়ী ডিবি পুলিশের সদস্যরা অভিযানে গেলে সাদা পোশাকের ওপর তাদের ডিবি লেখা জ্যাকেট পরতে হবে। তবে অনেক সময়ই ডিবি সদস্যরা এ নিয়ম মানেন না। ফলে কারা আসল, কারা নকল তা নিয়ে মানুষ বিভ্রান্তিতে পড়ে। ডিবি সদস্যদের এই গাফিলতির সুযোগ নেয় অপরাধীরা।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন বলেন, গোয়েন্দা টিম কোথাও অভিযানে গেলে অবশ্যই তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানিয়ে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে কেউ যদি তার সিনিয়র কর্মকর্তাকে না জানিয়ে অভিযানে যায়, তাহলে অবশ্যই তাকে জবাবদিহি করতে হয়। কখনো কখনো বিশেষ প্রয়োজনের নিয়মের কিছুটা ব্যতিক্রমও ঘটে। তবে সে ক্ষেত্রেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানানোর নিয়ম আছে।

জ্যাকেট ছাড়া অভিযানের বিষয়ে তিনি বলেন, এটা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। অনেক সময় আসামি ধরতে গিয়ে নানা কৌশল নিতে হয়। সে ক্ষেত্রে জ্যাকেট ছাড়াই সাদা পোশাকে অভিযান চালাতে হয়। তবে কোনো কারণ ছাড়াই নিয়ম ভঙ্গ করে কেউ অভিযানে গেলে কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ড করে ধরা পড়লে তাকে বিভাগীয় শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য মতে, গত কয়েক বছরে রাজধানীসহ সারা দেশে পুলিশ পরিচয়ে ৬৬০টি ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। গত দুই মাসে শুধু রাজধানীতেই এ রকম অন্তত ১৫টি ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা কিংবা জিডি হয়েছে। গত কয়েক বছরে সারা দেশে ভুয়া বা নকল পুলিশ ধরা পড়েছে শতাধিক। তাদের কাছ থেকে ওয়াকিটকি, অস্ত্র, হাতকড়া এবং তাদের ব্যবহার করা গাড়িও উদ্ধার হয়েছে।

গত ২৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় বাংলামোটরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে ব্যবসায়ী মোহাম্মদ রাজাকে কৌশলে অপহরণ করে একদল দুর্বৃত্ত। মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা নিয়ে পালিয়ে যায় তারা।

রাজা বলেন, ‘পুলিশ পরিচয়ে ছিনতাইকারীরা এভাবে ঘুরে বেড়ায়। তারা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে সব কিছু লুটে নেয়। অথচ আসল পুলিশ তাদের ধরতে পারে না। ’ আবার গত শনিবার রাতে মৌচাকের ফরচুন মার্কেটে গিয়ে মাজহারুল ইসলাম ইরান নামের এক ব্যবসায়ীকে আটক করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) একটি দল। সাদা পোশাকে ছিল তারা। ইরানকে নিয়ে যাওয়ার সময় মার্কেটের ব্যবসায়ীরা একজোট হয়ে ডিবি সদস্যদের ঘেরাও করে ফেলে। পরে খবর পেয়ে রমনা থানার পুলিশ গিয়ে ডিবির সদস্যদের উদ্ধার করে।

ডিএমপির রমনা বিভাগের উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদার বলেন, ‘গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল আসামি ধরতে গিয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় ব্যবসায়ীরা তাদের ভুয়া পুলিশ মনে করে আটকে রাখে।’

ফরচুন মার্কেটের ব্যবসায়ীদের ভাষ্য মতে, রাত সাড়ে ৯টার দিকে পাঁচ-ছয়জন লোক মার্কেটে ঢুকে ইরানকে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ইরানকে মারতে মারতে নিয়ে যাওয়ার সময় উপস্থিত লোকজন ও আশপাশের ব্যবসায়ীরা এগিয়ে এলে তারা নিজেদের ডিবির সদস্য বলে পরিচয় দেয়। কিন্তু ওই সময় তাদের গায়ে পুলিশের বা ডিবির পোশাক না থাকায় লোকজন তাদের ভুয়া বলে সন্দেহ করে। তাদের মাইক্রোবাসসহ ঘিরে ফেলা হয়। পরে পুলিশ এলে জানা যায় তারা আসল ডিবিই ছিল।

ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (অপারেশন) আব্দুর রাজ্জাক বলেন, নকল বা ভুয়া পুলিশের তৎপরতা যেকোনোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আসল পুলিশের কাজও কখনো কখনো প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

ফরচুন মার্কেটের ঘটনার বিষয়ে তিনি বলেন, ভুল-বোঝাবুঝির কারণে এ রকম ঘটনা ঘটতে পারে। এ ক্ষেত্রে সিনিয়র অফিসারদের আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।

ডিবি পুলিশের কতিপয় সদস্যের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছেন ফরচুন মার্কেটের ব্যবসায়ীরা। তারা দাবি করছেন, গত আগস্ট থেকে এ মার্কেটের কমপক্ষে চারজন ব্যবসায়ীকে ডিবির রমনা অঞ্চলের একটি দল তুলে নিয়ে মারধর করে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করেছে। সর্বশেষ গত ১৯ নভেম্বর একজন ব্যবসায়ীকে তার বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. মোক্তার হোসেনের কাছে যান। বিষয়টি একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে জানানো হয়। মন্ত্রী অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ডিবির যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেনকে নির্দেশ দেন। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে ডিবির রমনা অঞ্চলের পরিদর্শক বাহাউদ্দিন ফারুকি, এসআই মুন্সি সাইফুল, মো. মিন্টু ও মো. পলাশকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য মতে, সাদা পোশাকে পুলিশ পরিচয় দিয়ে প্রতি মাসেই ব্যবসায়ীদের ধরে নিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। গত ১৮ এপ্রিল কাফরুলে চাঁদাবাজি করে ফেরার সময় ঢাকা সেনানিবাসে সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে ডিবির ১১ সদস্য। তদন্তে সেই ঘটনায় ডিবির সহকারী কমিশনার রুহুল আমিন, পরিদর্শক গিয়াসউদ্দিন, এসআই জাহিদুল ইসলাম, লুত্ফর রহমানসহ ১১ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তির সুপারিশ করা হয়।

গত ২৫ অক্টোবর টেকনাফে এক ব্যবসায়ীকে জিম্মি করে ১৭ লাখ টাকা আদায়ের ঘটনায় সেনাবাহিনীর হাতে আটক হয় গোয়েন্দা পুলিশের সাত সদস্য।

দুর্নীতিবাজ পুলিশ সদস্যদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া সম্পর্কে সম্প্রতি এক সেমিনারে প্রশ্ন করা হয়েছিল পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হককে। জবাবে তিনি বলেছেন, ‘কতিপয় সদস্য এ ধরনের অপকর্মে জড়ালে দ্রুত তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

আসল পুলিশের হাতে মাঝেমধ্যে ধরাও পড়ছে নকল পুলিশ। গত ২৪ অক্টোবর ডিবি পুলিশ সেজে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সামনের রাস্তা থেকে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে গুলিভর্তি বিদেশি পিস্তল, ডিবির জ্যাকেট, মাইক্রোবাস, ওয়্যারলেস সেট উদ্ধার করা হয়।

২১ অক্টোবর কমলাপুর এলাকা থেকে একইভাবে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে ছয়জন, ২২ অক্টোবর আশুলিয়ার বাইপাল এলাকা থেকে একজন, ১৯ অক্টোবর জয়পুরহাটে চাঁদাবাজির সময় পাঁচ ভুয়া ডিবি, ৯ অক্টোবর সিরাজগঞ্জে চারজন, ২০ মে রাজধানীতে ভুয়া ডিবির ১৬ সদস্য আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে বিদেশি পিস্তল, চাপাতি, ছুরি, খেলনা পিস্তল, ওয়াকিটকি, ডিবি লেখা জ্যাকেট, পুলিশের মনোগ্রাম সংবলিত পরিচয়পত্রসহ বিপুল সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

এ ছাড়া ১৮ জুলাই যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে ১২ ভুয়া ডিবি সদস্য, ১৬ জুন ধানমণ্ডি থেকে আটজন এবং গত ৩০ এপ্রিল ডেমরা এলাকা থেকে চারজনকে আটক করা হয়।

সূত্র : কালের কণ্ঠ