৫০ শতাংশের বেশি মানুষ মানসম্পন্ন সেবা পায় না

ডেস্ক রিপোর্ট : উৎকোচ দেয়ার মতো টাকা ছিল না হতদরিদ্র অন্তঃসত্ত্বা পারভীন-এর কাছে। হাসপাতালে ভর্তি হতে পারেননি। স্বাস্থ্যসেবাও পাননি। পরে হাসপাতালের কম্পাউন্ডে সন্তান প্রসব করেন পারভীন। জন্মের দু-তিন মিনিটের মধ্যে মারাও যায়। গত ১৭ই অক্টোবর রাজধানীর আজিমপুরের মাতৃসদন ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে (মেটার্নিটি) এ ঘটনা ঘটে। ২৬ বছর বয়সী পারভীন প্রসব ব্যথা নিয়ে আজিমপুরের মাতৃসদন ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে আসেন। তাকে হাসপাতালে ভর্তি না করে তাড়িয়ে দেয় কর্মচারীরা। প্রসূতির স্বজনরা জানান, হাসপাতালের গাইনি বিভাগে রোগী নিয়ে এলে আমাদের কাছে ১৫শ’ টাকা ঘুষ দাবি করে। দাবিকৃত টাকা না দিতে পারায় সঙ্গে সঙ্গে লেবার রুম (সন্তান জন্ম দেয়ার কক্ষ) থেকে বের করে দেন হাসপাতালের এক বুয়া ও নার্স। পরে বাইরে হাসপাতালের কম্পাউন্ডেই একটি ছেলে শিশুর জন্ম হয় পারভীনের। কিন্তু ২/১ মিনিটের মধ্যেই শিশুটি মারা যায়। শুধু পারভীন নন, টাকা না থাকলে সঠিক স্বাস্থ্যসেবা না পওয়ার অভিযোগ আহরহই শোনা যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, স্বাস্থ্যসেবার জন্য বছরে মাথাপিছু কমপক্ষে ৮৫ মার্কিন ডলার খরচ করা দরকার। বাংলাদেশে মাথাপিছু স্বাস্থ্য-ব্যয় বছরে ৩৭ ডলার। স্বাস্থ্যের জন্য ৬৩ শতাংশ খরচ করে ব্যক্তি নিজের পকেট থেকে। সরকার খরচ করে ২৩ শতাংশ। বাকি ১৪ শতাংশ দাতাসহ অন্যরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাস্থ্যের জন্য ৬৭ শতাংশ খরচ করে ব্যক্তি নিজের পকেট থেকে। সরকার খরচ করে ২৩ শতাংশ। দাতারা ৮ শতাংশ এবং বাকি ২ থেকে ৩ শতাংশ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি বহন করছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, স্বাস্থ্যের জন্য কোনো ব্যক্তি তার নিজ আয়ের ২৫ শতাংশ খরচের সক্ষমতা রাখেন। যদি ২৫ শতাংশের বেশি খরচ করেন তাকে ক্যাট্যাসট্রাফি (আকস্মিক বিপর্যয়) হিসেবে দেখা হয়।

পাঁচ বছর আগে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ১৭ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে আকস্মিক বিপর্যয়ে পড়েছেন। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় মেটাতে গিয়ে বছরে ৫ শতাংশ পরিবার দরিদ্র সীমার নিচে নেমে গেছে।
থিংট্যাংক প্রতিষ্ঠান পিপিআরসি (পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার) এক গবেষণায় বলেছে, স্বাস্থ্যসেবা খরচজনিত পারিবারিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক ঝুঁকি। যা আউট অব পকেট খরচ হিসেবে বিশ্লেষক মহলে পরিচিত পেয়েছে। এক হিসাবে বাংলাদেশের এই ধরনের অর্থনৈতিক বোঝার কারণে প্রায় ৪০ লাখ লোক নতুন করে দারিদ্র্যে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

চিকিৎসক ও দক্ষ স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের অপ্রতুলতা এখনও দেশের সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে বড় একটি বাধা হয়ে আছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। সূত্র মতে, গত বছরের জুন পর্যন্ত দেশে রেজিস্টার্ড চিকিৎসক ছিলেন ৮৫ হাজার ৫৮৭ জন। আর ৪১ হাজার ৬০০ নার্স এবং ১১ হাজার ৭৯৩ জন প্যারামেডিকস ছিলেন। ১৬ কোটির বেশি জনসংখ্যার হিসেবে এখনও প্রায় ১ হাজার ৮০০ মানুষের জন্য মাত্র একজন চিকিৎসক। প্রায় ৪ হাজার মানুষের জন্য একজন নার্স রয়েছেন। সাড়ে ১৩ হাজার মানুষের জন্য রয়েছেন একজন প্যারামেডিকস। তবে গত ডিসেম্বরে প্রায় ১০ হাজার নার্স নিয়োগ দিয়েছে সরকার। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য ডাক্তার, নার্স ও টেকনোলজিস্টদের অনুপাতের বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ হচ্ছে- একজন ডাক্তার থাকলে তিনজন নার্স ও পাঁচজন টেকনোলজিস্ট থাকবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য চিকিৎসকের পাশাপাশি আরো অনেক বেশি নার্স ও টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দিতে হবে।

এদিকে সরকার ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষার কর্মসূচির’ অধীনে সেবাদান (হেলথ কার্ড) দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিতরণ করেছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পাইলট প্রকল্পের আওয়তায় ২০১৬ সালের মার্চ থেকে টাঙ্গাইলের তিন উপজেলায় এই কর্মসূচি চলছে। জেলার কালিহাতি, মধুপুর ও ঘাটাইল উপজেলার এক লাখ দরিদ্র পরিবারকে চিহ্নিত করা হয়েছে। কর্মসূচির আওয়াতায় চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহের জন্য পরিবার প্রতি বার্ষিক এক হাজার টাকা প্রিমিয়াম হিসেবে সরকার দেয়। প্রত্যেক পরিবার বার্ষিক সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা সুবিধা পান বলে জানা গেছে। এই কার্ড দিয়ে পরিবারের সদস্যরা রোগ নির্ণয়, ওষুধপত্রসহ ৫০টি রোগের বিনামূল্যে চিকিৎসা সুবিধা পাচ্ছেন। চিকিৎসার প্রয়োজনে তারা হাসপাতালে ভর্তি হতে পারবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট-এর পরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ এই প্রসঙ্গে মানবজমিনকে বলেন, বাংলাদেশে ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ (ইউএইচসি) বলতে তিনটি ডায়মেনশ-এর মাধ্যমে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা বুঝায়। দেশের সীমানার মধ্যে সবার কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে বিধান করতে হবে। গ্রামে অনেক প্রত্যন্ত এলাকা আছে যেখানে স্বাস্থ্যসেবা দেয়া কঠিন। আবার শহরেও অনেক গৃহহীন মানুষ আছেন তারা স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন না। ধনী, গরিব, মহিলা, পুরুষ, বয়স্ক ও শিশু কোনো ভেদাভেদ ছাড়াই স্বাস্থ্যসেবা দিতে হবে। যার যার স্বাস্থ্যসেবা যেভাবে দরকার সেভাবে দিতে হবে। তিনি বলেন, সামাজিকভাবে বঞ্চিত কিছু মানুষ আছেন যারা গৃহহীন। তারা শহরের কোথাও কোথাও বাস করেন। তারা স্বাস্থ্য সেবা পাচ্ছেন না। এর সংখ্যা ৩০ থেকে ৪০ লাখ। যদি ইউএইচসি অর্জন না হয় তাহলে এসডিজির অভিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে তিনি মন্তব্য করেন। মানবজমিন