পাচার অর্থ ফেরতে নানা জটিলতা

তারেক : বিদেশে পাচার হওয়া হাজার হাজার কোটি টাকা ফেরাতে নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হলেও এ নিয়ে জটিলতা কাটছে না। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্মকর্তারা সমপ্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তারা বিদেশস্থ বাংলাদেশ মিশনগুলোর সহায়তা চেয়েছেন। জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেয়া হয়েছে। কেবল তাই নয়, দুদকের তদন্ত টিম বিদেশে যাওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মিশন কর্মকর্তাদের যোগাযোগ, তদন্ত কাজ ও তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জরুরি নির্দেশনা দিয়ে বিদেশস্থ দূতাবাসগুলোতে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থ পাচারকারীরা যে দেশে নিয়মিত অর্থ পাচার করেন তারা সেই দেশে প্রটেকশন বা সুরক্ষা পেতে নাগরিকত্ব নেয়ার চেষ্টায় থাকেন, অনেকে পেয়েও যান। নাগরিকত্ব পাওয়া ব্যক্তিদের তথ্য শেয়ার করার ক্ষেত্রে হোস্ট কান্ট্রি সহায়তা না-ও দিতে পারে।

ফলে ভিন দেশে নাগরিকত্ব পাওয়া পাচারকারীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা কিংবা পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা প্রায় অসম্ভব। বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে দুদককে পরামর্শও দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দুদকের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে কয়েকটি দেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের তথ্য পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, সামপ্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই সব দেশে অর্থপাচারকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পদ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য দুদকের তদন্ত টিম যাবে। তাদের সফরের আগেই বাংলাদেশ মিশনের কর্মকর্তাদের ওই সব দেশের যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সমন্বয় সাধন জরুরি। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগাম ব্যবস্থা নিলে দুদক টিমের বিদেশে গিয়ে তথ্য পাওয়ার কাজটি সহজ হবে।

সূত্র জানায়, দুর্নীতি দমন কমিশন সচিবসহ দুদকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন, সংস্থাপন ও জাতিসংঘ ডেস্কের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অংশ নেন। কমিশন সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দুর্নীতি ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে বিদেশ থেকে তথ্য ও রেকর্ডপত্র সংগ্রহে দুদককে মিশনগুলোর সহায়তা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সেখানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, মিশন তো সহায়তা করবেই, জাতিসংঘের কনভেনশন অ্যাগেনইস্ট করাপশন-এর আওতায়ও পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর কাজে সহায়তা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ নিয়েও দুদকসহ সরকারকে সহায়তায় প্রস্তুত রয়েছে। সেই বৈঠকের পরপরই দুদক টিমসহ সরকারের যেকোনো সংস্থাকে সর্বাত্মক সহযোগিতার অনুরোধ জানিয়ে বিদেশস্থ সব দূতাবাসে চিঠি পাঠায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সেই চিঠিতে বলা হয়, কয়েকটি দেশে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার হওয়ার অভিযোগের কথা জানিয়েছে দুদক। এ তালিকা আরো বাড়তে পারে। ফলে ওই সব দেশসহ অন্যান্য দেশের বিষয়েও খোঁজখবর রাখা জরুরি। উল্লেখ্য, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৬ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই)। সংস্থাটি তার এক রিপোর্টে এ নিয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। এতে বলা হয়- ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়ে বিভিন্ন কায়দায় বিপুল পরিমাণ ওই অর্থ পাচার করা হয়েছে।

জিএফআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১২ সালে অর্থ পাচারের পরিমাণ ৭২২ কোটি ৫০ লাখ ডলার, ২০১৩ সালে ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার ও ২০১৪ সালে ৭০০ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। এ ছাড়া ২০০৫ সালে ৪২৬ কোটি ২০ লাখ ডলার, ২০০৬ সালে ৩৩৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার, ২০০৭ সালে ৪০৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার, ২০০৮ সালে ৬৪৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার, ২০০৯ সালে ৬১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার, ২০১০ সালে ৫৪০ কোটি ৯০ লাখ ডলার এবং ২০১১ সালে পাচার হয় ৫৯২ কোটি ১০ লাখ ডলার। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে তা দেশের এক বছরের বাজেটের সমান। এদিকে সুইস ব্যাংকগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশ হতে অর্থ জমার পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০১২ সালে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশের জমা অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ২২ কোটি ৮০ লাখ সুইস ফ্রাঁ, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৯৬১ কোটি টাকা।

২০১২ থেকে ২০১৬ সাল এই সময়ের মধ্যে সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশের জমা রাখা অর্থের পরিমাণও ৩ গুণ বেড়ে গেছে। প্রতিবেদন মতে, ২০০৯ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমার পরিমাণ ছিল ১৪ কোটি ৯০ লাখ সুইস ফ্রাঁ বা ১ হাজার ২৮১ কোটি টাকা, আর এখন তা ৩৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৫ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। বিদেশে অর্থ পাচার নিয়ে বাংলাদেশে বরাবরই উদ্বেগ রয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খানের মতে, নানা কারণে অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। সুশাসনের অভাবেই অর্থপাচার বাড়ছে। অর্থপাচার রোধে আইনি কাঠামোকে আরো মজবুত করার পরামর্শ দেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিন আহমেদ অবশ্য মনে করেন, দেশে মূলত বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের অপ্রতুলতা রয়েছে। শতভাগ বিনিয়োগ পরিবেশ থাকলে অর্থ পাচার হতো না। মানবজমিন