মধ্যপ্রাচ্য সংকট
বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশে

ডেস্ক রিপোর্ট : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণার পর থেকে নতুন মাত্রা নিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য সংকট। ঘোষণার পরপরই ইন্তিফাদার (গণঅভ্যুত্থান) ডাক দিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। ট্রাম্পের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য নতুন অস্থিরতার দিকে এগুচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশ্লেষকদের অভিমত। এ ঘোষণায় নতুন করে কোনো যুদ্ধাবস্থা তৈরি হচ্ছে কি না, এ প্রশ্নও তাদের। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা ও সংকট ঘনীভূত হলে এর আঁচ বাংলাদেশের অর্থনীতিসহ বিভিন্ন দিকে পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা শঙ্কা প্রকাশ করছেন। পাশাপাশি ফিলিস্তিন সংকটকে কেন্দ্র করে মৌলবাদী ও উগ্রগোষ্ঠী মাঠে নামতে পারে বলেও তাদের আশঙ্কা।

আলাপ করলে প্রতিদিনের সংবাদকে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলেন, নিঃসন্দেহে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়বে। শান্তি আলোচনার চূড়ান্ত মৃত্যু ঘটার আশঙ্কা করেন তারা। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে প্রতিবছর মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা প্রবাসী আয়। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা আরো ছড়িয়ে পড়লে ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে সংকট ঘনীভূত হলে সেখানকার বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া কমে যেতে পারে। এমনকি কোনো কোনো দেশ থেকে তখন এ দেশের অনেকে ফেরতও আসতে পারেন। তারা বলেন, গত কয়েক বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন সংকটের কারণে এমনিতেই প্রবাসী আয় কমেছে।

সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের দুজন প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণার ইস্যুতে বাংলাদেশ সতর্ক। এ বিষয়ে সরকারের অবস্থানও স্পষ্ট। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে কোনোভাবে ধর্মীয় মৌলবাদ যেন মাথাচাড়া দিতে না পারে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো সতর্ক আছে। তারা বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতির যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা বাংলাদেশের কাছেও গ্রহণযোগ্য নয় বলে ইতোমধ্যে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ফিলিস্তিনের নিপীড়িত মানুষের প্রতি সংহতি জানিয়ে যে অবস্থান নিয়েছিলেন, শেখ হাসিনার সরকারের অবস্থানও একই। ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন ও সহমর্মিতা এ দেশের বেশ পুরোনো। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই স্বাধীন ফিলিস্তিনের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন রয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, ট্রাম্পের এ উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পথে বাধা সৃষ্টি করবে। মধ্যপ্রাচ্য সংকট শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়ায়, তা এখনই বলা যাবে না। তবে সংকট ঘনীভূত হলে বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়তে পারে।

জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের এক কর্মকতা বলেন, ‘জেরুজালেম ইস্যুকে কেন্দ্র করে মৌলবাদী গোষ্ঠীর বিষয়ে সতর্ক আছেন তারা। এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে কর্মসূচির ডাক দিয়েছে ইসলামপন্থি বিভিন্ন সংগঠন। গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ হয়েছে ঢাকার বায়তুল মোকাররম মসজিদের বাইরে। নামাজ শেষে বিভিন্ন সংগঠন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষণার প্রতিবাদে মিছিল ও সমাবেশ করে। সেই সমাবেশ থেকে আগামী বুধবার ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস ঘেরাও ও স্মারকলিপি দেওয়ার ঘোষণা দেয় হেফাজতে ইসলাম। এ বিষয়েও সতর্ক আছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।’

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেনÑউত্তর কোরিয়া, ইরান ও মার্কিন নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপের ঘটনায় কোণঠাসা ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের দৃষ্টি অন্য বিষয়ে ঘোরাতেই জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা দিয়েছেন। এতে ইহুদি লবিস্টদের মন রক্ষার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যেও নিজের ক্ষমতা চাঙা করতে চাইছেন তিনি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমেরিকার লড়াইয়ের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরস্পর বিরোধিতা তৈরি হলো। পশ্চিমা দেশগুলো ইসলামী জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়ছে। কিন্তু ট্রাম্প যে পদক্ষেপ নিলেন, তা হলো আলকায়েদা এবং ইসলামিক স্টেটের জন্য সবচেয়ে বড় পুরস্কার এবং সবচেয়ে ভালো অস্ত্র।

এই দলগুলো এখন ভাবতেই পারে যে, যে আমেরিকা আমাদের বিরুদ্ধে লড়ছে, তারা ইরাকে এবং সিরিয়ায় আমাদের শক্তি ধ্বংস করে দেওয়ার পর এখন ইসরায়েলিদের পুরস্কৃত করছে, আরবদের নয়। এর ফলে আমাদের এলাকায় সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে, তার ঢেউ ইউরোপ এবং আমেরিকায় গিয়েও পৌঁছতে পারে। জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পরিণামে সেখানে ‘প্রতিশোধমূলক তৎপরতা’ চালানো হতে পারে।

এই সিদ্ধান্ত জঙ্গিদের অনুকূলে কাজ করতে পারে, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার যারা মিত্র আছে, যেমন মিসর, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত এই সিদ্ধান্ত তাদের অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। আমি মনে করি এ সিদ্ধান্তে হিতে বিপরীতই হতে পারে।

ফিলিস্তিনি ইস্যুতে এটা হয়তো মানুষকে মাঠের আন্দোলনে আরো কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারবে। তবে একটা সংহতি গড়ে তোলার বদলে এর ফলে ওই অঞ্চল আরো অশান্ত হয়ে উঠবে।

এর বিপরীতমুখী দিকটা হলো এই পদক্ষেপ বিভিন্ন মুসলিম দেশের মানুষকে হয়তো একটা অভিন্ন জায়গায় নিয়ে আসতে সাহায্য করবে, কিন্তু একই সঙ্গে এই পদক্ষেপ উগ্রবাদ এবং জঙ্গি আদর্শকে আরো উদ্বুদ্ধ করতেও সাহায্য করবে।’ প্রতিদিনের সংবাদ