মামলা-নির্বাচন : কোন পথে এগোবে বিএনপি

তারেক : কিছুদিন আগেও বিএনপির পরিকল্পনায় ছিল আপাতত কোনো আন্দোলন নয়। সমঝোতার রাস্তায় থেকেই নির্বাচনের পথে থাকবে দলটি। কিন্তু, এরই মধ্যে চেয়ারপাসন বেগম খালেদা জিয়ার মামলার রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। ধারণা করা হচ্ছে, মামলায় সাজা হতে পারে খালেদা জিয়ার। আন্দোলনে না থেকেও ঢাকাসহ সারা দেশে বিএনপি নেতারা নতুন করে ধরপাকড়ের মুখে। সাত সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে এমনটা করা হচ্ছে বলে মনে করছেন দলটির নেতারা। তাদের মতে, রাজনৈতিক কর্মসূচি না থাকলেও নতুন করে গ্রেফতার দলটিতে আবার সংকট তৈরি করেছে।

তা ছাড়া চেয়ারপারসনের মামলার রায়ে সাজা বা গ্রেফতার হলে দল কী ভূমিকায় থাকবেÑতা নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। দলের নেতারা মনে করছেন, বছরজুড়ে সরকার বিএনপিকে মাঠে নামানোর অনেক চেষ্টা করেছে। বিএনপি সেই ফাঁদে পা দেয়নি। তাই বিএনপি একটি ভালো অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে। দলের কেন্দ্রীয় সব নেতাই জামিনে বেরিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দলেও একটি চাঙ্গাভাব তৈরি হয়েছে। এবার বিএনপিকে নিজেদের স্বার্থেই মাঠে নামতে হচ্ছে। আগামী নির্বাচনের মাঠে বর্তমান পরিস্থিতি ধরে রেখে নির্বাচনের পথে এগিয়ে যাওয়াও দুষ্কর। আবার খালেদার সাজা হলে সর্বোচ্চ প্রতিক্রিয়া দেখাতে না পারলে দলটি ইমেজ সংকটে পড়তে পারে। এ অবস্থায় দলের সঠিক করণীয় নির্ধারণ করা সত্যিকার অর্থেই একটি চ্যালেঞ্জ। এসব জটিল বিষয় সামনে রেখে আজ দলে স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডেকেছেন বেগম খালেদা জিয়া।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আজকের বৈঠকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিন্ধান্ত নিতে পারেন চেয়ারপারসন। বিশেষ করে ঢাকাসহ সারা দেশে সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে চেয়ারপারন দেশব্যাপী সফরের বিষয়টি থাকছে সক্রিয় বিবেচনায়। চেয়ারপারসন গ্রেফতার হতে পারেনÑএমনটা ধরে নিয়েই সফরগুলোকে দেওয়া হবে সর্বাধিক গুরুত্ব। এর বাইরে আগামী নির্বাচনের আগে সিটি করপোরেশনের ভোটকে দলটি গুরুত্বের সঙ্গেই নিচ্ছে। কেননা দলের নেতারা মনে করেন, আগামী নির্বাচন সামনে রেখে সরকার বিএনপিকে নিয়ে একটি মহাপরিকল্পনা নিয়েছে। এর অংশ হিসেবেই চেয়ারপারসনের সাজা ও আটকের বিষয়টি পাশাপাশি রেখে সিটি নির্বাচনগুলো সেরে নিতে চায়। খালেদাকে সাজা বা গ্রেফতারের মুখে বা চূড়ান্ত পর্যায়ে সাজা দিয়ে বিএনপিকে নতুন করে আন্দোলনে ব্যস্ত রেখে সিটি নির্বাচনগুলোর ফল সরকার নিজেদের পক্ষে নিতে তৎপর। সরকারের এমন কৌশল বুঝতে পেরে বিএনপিও পাল্টা কৌশল নিচ্ছে। সেই কৌশল নির্ধারণেই আজ বৈঠকে বসছেন চেয়ারপারসন।

দলটির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে বলেন, সরকার একদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনকে সাজা দিতে সব আয়োজন শেষ করে এনেছে, অন্যদিকে আগামী দুই-তিন মাসে অনুষ্ঠেয় সিটি নির্বাচনগুলোও জেতার চক্রান্ত করছে। আগামী নির্বাচনের আগে সিটি নির্বাচন চলাকালে চেয়ারপারসনকে সাজা দিয়ে বিএনপিকে আন্দোলনের মুখে ঠেলে দেওয়ার কৌশল নেওয়া হচ্ছে। কারণ সরকার জানে, চেয়ারপারসনের সাজায় দলটি যেভাবেই হোক আন্দোলনের মাঠে থাকবে। বিএনপিকে এ রকম পরিকল্পনায় ফেলে দেওয়া হলে সিটি নির্বাচনে ততটা মনোযোগী হতে পারবে না দলটি। আবার আন্দোলন শুরু ও সিটি নির্বাচনকালীন নেতাদের আরেক দফা গ্রেফতারও করবে সরকার। যার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কারণ সিটি নির্বাচনগুলো জিততে না পারলে সরকারের অবস্থান আরো নড়বড়ে হয়ে যাবে। এমন চিন্তা মাথায় রেখে বিএনপিকে করণীয় নির্ধারণ করতে হচ্ছে।

এমন একটি বিষয়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি গতকাল শনিবার ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে বলেন, ‘সত্য যতই অপ্রিয় বা কঠিন হোক তা সব সময় সত্য। বিএনপি ঘটনাক্রমে মুক্তিযোদ্ধার দল। সামনে নির্বাচন, বিএনপির নেতাকর্মীদের নামে মামলা আছে। আরো মামলা হবে। পাপ কখনো বাপকে ছাড়ে না। তারা যাই বলুক না কেন, সামনে তাদের বড় বিপদ।

এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিবের বক্তব্য নিতে চাইলেও তিনি অসুস্থ থাকায় তা সম্ভব হয়নি। তবে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, রাজনীতিতে কে কখন কোন বেকায়দায় পড়ে যায় তা বলা মুশকিল। তবে, সরকার পরিকল্পনা করেই সব করছে বলেই তারা বিপদের কথা বলছেন। সরকারি দলও কিন্তু সেই বিপদের বাইরে নেই।

অন্যদিকে নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন আদায়ের দাবিতে বিএনপির শীর্ষপর্যায় থেকে শুরু করে সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা একমত। তবে এই দাবি আদায়ে কর্মকৌশল প্রণয়নে দলটিতে রয়েছে বহুমত। অনেকে এখনই আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করতে চান, আবার অনেকে চান সরকারের সমঝোতার জন্য আরো সময় দিতে। সব মতের পক্ষেই গ্রহণযোগ্য যুক্তি থাকলেও দাবি আদায়ের চূড়ান্ত কৌশল ঠিক করতে পারছে না বিএনপি। মূলত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাজার বিষয়টি সামনে আসায় দলটি আগের নেওয়া পরিকল্পনামতো এগোতে পারছে না। তাই এবার আগামী নির্বাচনের কথা এককভাবে না ভেবে শুধু সরকারকে দাবি আদায়ে বাধ্য করার আন্দোলনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে তারা।

দলের একজন প্রভাবশালী ভাইস-চেয়ারম্যান মনে করেন, বিএনপির দাবি প্রতিষ্ঠায় চূড়ান্ত আন্দোলন গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। কারণ, সরকার আন্দোলনের চাপে পড়লেই বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থায় আসবে। বিএনপির আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি দেখে শক্তিশালী অনেকগুলো পক্ষও সহযোগিতা করবে বিএনপকে। তাই আন্দোলনই পারে বিএনপিকে এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে।

বিএনপির অন্য একটি সূত্র জানায়, আন্দোলনের চূড়ান্ত কর্মকৌশল যাই হোক না কেন, ভেতরে ভেতরে সাংগঠনিক কর্মকান্ড খুব দ্রুতই এগিয়ে নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে জনমত নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি নির্বাচনের জন্য সবচেয়ে সুযোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের জন্যও জরিপ চলছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে শতভাগ সফলতা পেতে এরই মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে রংপুর সিটি নির্বাচন দিয়ে শুরু করে রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল ও গাজীপুর সিটি নির্বাচনের প্রচারণায় খোদ চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নামার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এ ছাড়া ২০ দলীয় জোটের পরিধি আরো বৃদ্ধি এবং পরবর্তী সময়ে অন্য জোটের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। আর নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা আরো বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিদিনের সংবাদ