গৃহস্থালি পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে

ডেস্ক রিপোর্ট : সকালে ঘুম থেকে উঠেই যে পণ্যটি সবার প্রয়োজন হয় তা হচ্ছে টুথপেস্ট অথবা টুথ পাউডার। অনেকে রাতে ঘুমের আগে ব্রাশ করেন। টয়লেট পেপার, গোসলের সাবান-শ্যাম্পুও প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় পণ্য। একইভাবে কাপড় পরিস্কার করা সাবান বা ডিটারজেন্ট, বাসন পরিস্কারের সাবান, টয়লেট্রিজসহ এসব পণ্য ছাড়া মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের জীবনযাপন কঠিন। দেশি ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো মাঝেমধ্যে এসব গৃহস্থালি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু এটা নিয়ে কেউ তেমন প্রশ্ন তোলেন না। এসব পণ্যের ক্ষেত্রে সরকারেরও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। যদিও চাল-ডালসহ কাঁচাবাজারে পণ্যের দাম বাড়লে সরকার সেগুলো নিয়ন্ত্রণে নানামুখী ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।

কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) এক হিসাবে বলা হয়েছে, বাসাবাড়িতে নিত্যব্যবহারের এসব টয়লেট্রিজ পণ্যের দাম গত এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ৩৩ শতাংশ।

ভোক্তারা বলছেন, চাল-ডাল-তেল, চিনি-আটার দাম বাড়লে মানুষের সমস্যা বেশি হয়। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে আলোচনা হয়। দাম কমানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়। কিন্তু টয়লেট্রিজ পণ্যের দাম সবার অগোচরে দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। জীবন যাপনে এই দাম বৃদ্ধিও আর্থিক চাপ তৈরি করছে। কিন্তু কোনো পক্ষই এসব পণ্যের দাম নিয়ে হৈ চৈ করে না। ফলে উৎপাদক কোম্পানিগুলো নির্বিচারে এগুলোর দাম বাড়িয়ে যাচ্ছে।

বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, স্থানীয় ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো গত এক বছরে টুথপেস্ট বা পাউডার, সাবান, ডিটারজেন্ট. টয়লেট পেপার- প্রতিটি পণ্যের দাম একাধিকবার বাড়িয়েছে। ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ক্যাব বিভিন্ন পণ্যের সঙ্গে সাবানের বাজারদর হ্রাস-বৃদ্ধিরও হিসাব করে থাকে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে একটি বহুজাতিক কোম্পানির কাপড় কাচা সাবান ১৬ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে তার দাম হয় ১৭ টাকা। ছয় মাস পর পুনরায় ওই সাবানের দাম বাড়িয়ে ১৮ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে দুই টাকা বেড়েছে জনপ্রিয় এ সাবানের। একইভাবে গত এক বছরে একটি বহুজাতিক কোম্পানির ৫০ গ্রামের টুথ পাউডারের কৌটার দাম ১৫ টাকা থেকে বেড়ে ২০ টাকা হয়েছে। দেশীয় একটি কোম্পানির টয়লেট পেপারের দাম এক বছরের ব্যবধানে ১৮ থেকে ২৫ টাকা হয়েছে। ২৩ টাকার বাসন পরিস্কারের সাবান এখন বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়। ৪৫ টাকার আধা কেজি ডিটারজেন্ট এখন ৫৫ টাকা। এক হিসাবে দেখা গেছে, গত এক বছরে বিভিন্ন টয়লেট্রিজ পণ্যের দাম ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

বিশ্নেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের বাজারে কয়েকটি পণ্যের রয়েছে একচেটিয়া বাজার। যে কারণে ওই কোম্পানিগুলো অনেকটা বেপরোয়াভাবে দাম বাড়ায়। কোনো কোম্পানি নির্দিষ্ট পণ্যের দাম বাড়ালে অন্যান্য কোম্পানিও সমজাতীয় ওই পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। এসব পণ্যের বাজারে সরকারের নজরদারি নেই। ফলে ভোক্তারা ঠকেই যাচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপেও দেখা গেছে, মানুষের ভোগ্যপণ্যের তুলনায় খাদ্যবহির্ভূত খাতে খরচ বেড়েছে। বিবিএস সর্বশেষ যে মূল্যস্ম্ফীতির তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতেও সেপ্টেম্বর মাসের তুলনায় গত অক্টোবরে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ম্ফীতি বেড়েছে। যদিও শুধু এসব পণ্যের জন্যই খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ম্ফীতি বেড়েছে, তা বলা ঠিক হবে না বলে মনে করেন বিশ্নেষকরা।

দেশে এসব গৃহস্থালি পণ্যের চাহিদা কী, কত পরিমাণ উৎপাদন হচ্ছে, সে বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কোনো সুনির্দিষ্ট বা জরিপভিত্তিক তথ্য নেই। এর বাজারমূল্যের ওঠানামা নিয়েও কাজ করে না কোনো সংস্থা। সরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ভোগ্যপণ্যের মূল্য ও মান নিয়ে কাজ করে। তবে এ খাতে যে বড় বাজার রয়েছে তা বোঝা যায় বহুজাতিক কোম্পানির বিজ্ঞাপন দেখে। তারা শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে বেতার-টেলিভিশন, সংবাদপত্র, অনলাইন পোর্টাল, বিলবোর্ডসহ বিভিন্ন প্রচার কাজে। বিশ্নেষকরা বলছেন, উৎপাদন খরচের চেয়ে প্রচারণা খরচ অনেক বেশি, যা ভোক্তাকেই পরিশোধ করতে হচ্ছে। পণ্যের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর ঘোষণা দেওয়া ও পত্রিকায় তা বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করার নিয়ম রয়েছে। কোম্পানিগুলো তা করেও। তবে পণ্যের প্রচারণার ক্ষেত্রে যেভাবে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়, দাম বাড়ানোর বিজ্ঞাপন ওইভাবে প্রচার পায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাজধানীর মানিকনগরের বরিশাল স্টোরের বিক্রেতা আবদুল করিম বলেন, এসব মনোহারি পণ্যের দাম সপ্তাহ বা মাসে মাসে বাড়ে না। কিন্তু যখন বাড়ে তখন অনেক বেড়ে যায়। পারভীন আক্তার নামে এক গৃহিণী বলেন, তারা স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে ও শ্বশুর-শাশুড়ি মিলে ছয়জনের পরিবার। মাসে কমপক্ষে তিন কেজি ডিটারজেন্ট দরকার হয়। বাসন পরিস্কারের জন্য বড় মাপের দুটো সাবান তো লাগেই, লাগে গায়ে মাখার আলাদা কয়েকটি সাবান। বাচ্চাদের আলাদা পেস্ট, শ্বশুরের জন্য পাউডার আর বাকিদের পেস্ট। লাগে পাঁচটা টয়লেট পেপার। এগুলো এখন এমন পণ্য যে না হলে একদিনও চলে না। ফলে দাম কমবেশি দেখার সুযোগ নেই। কিনতেই হচ্ছে।

এ বিষয়ে ক্যাব সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, সাবান দেশের আপামর জনসাধারণ ব্যবহার করে থাকে। এমন আরও দৈনন্দিন ব্যবহার্য বহু পণ্য রয়েছে, যেগুলোর দাম বাড়লে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়। কিন্তু এ বিষয় অনেকটা দৃষ্টির আড়ালেই থেকে যায়। ফলে উৎপাদক কোম্পানিগুলো বিনা বাধায় দাম বাড়িয়ে যাচ্ছে। সমকাল