হাজার কোটি টাকা লোকসান!

ডেস্ক রিপোর্ট : দুর্নীতি, ঋণ অনিয়ম এবং পদ্ধতিগত ভুলের কারণে লোকসানি ব্যাংকে পরিণত হয়েছে সরকারি বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি)। যথাযথ তদারকির অভাবে লোকসান কিছুতেই কমছে না। বর্তমানে বিকেবির প্রকৃত লোকসান হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। যদিও ব্যাংকটি তথ্য গোপনের মাধ্যমে লোকসান দেখিয়েছে ৫১১ কোটি টাকা। এছাড়া মূলধন ঘাটতি ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ১৮ হাজার কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ৪ হাজার কোটি টাকা। ২০১৭ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়সহ ৪৩টি শাখার ওপর করা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশদ পরিদর্শনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংকের আজকের পরিস্থিতির জন্য শুধু দুর্নীতিই দায়ী নয়, এর বাইরেও কিছু কারণ রয়েছে। যা ব্যাংকটিকে ধীরে ধীরে লোকসানি করে তুলছে। তাদের মতে, বিকেবির ৯০ শতাংশ ঋণ যাচ্ছে কৃষকের কাছে। এখানে পরিচালন ব্যয় বেশি। সাধারণত এ ধরনের ঋণে কোনো লাভ করা যায় না। তবে আংশিক বাণিজ্যিক ঋণে কিছুটা লাভ হয়। যেহেতু লাভের চেয়ে লোকসানি ঋণ বেশি তাই প্রতি বছর লোকসানের পরিমাণ বাড়ছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, হিসাবের মারপ্যাঁচে লোকসান বাড়ছে। কারণ বিকেবির কস্ট অব ফান্ড ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ। কিন্তু ঋণ দেয়া হচ্ছে ৯ শতাংশ সুদে। ফলে হিসাবসংক্রান্ত পদ্ধতিগত ভুলের কারণে লোকসান বাড়ছে। তিনি বলেন, যারা অনিয়ম করেছেন তাদের কাউকে ছাড় দেয়া হচ্ছে না। তবে বিকেবির অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে যথাসাধ্য চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।

সূত্র জানায়, ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। অনিয়ম আর দুর্নীতির ফলে মূলধন ঘাটতি, খেলাপি ঋণ আর লোকসানি শাখা বাড়ছে বিশেষায়িত এ ব্যাংকটির। বছরের পর বছর গুনছে নিট লোকসানও।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও কৃষি ব্যাংক সূত্র জানায়, রাষ্ট্রায়ত্ত অন্যান্য ব্যাংকের মতোই নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছে কৃষি ব্যাংক। এসব অনিয়মের ফলে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে বিশেষায়িত খাতের এ ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা। ২০১৫ সালের জুনে যার পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা। ব্যাংকটির নিট লোকসানের পরিমাণ ৯৮১ কোটি টাকা। এছাড়া ১ হাজার ৩১ শাখার মধ্যে ১৪৮টি শাখা লোকসানে। সূত্র জানায়, কৃষি ব্যাংকের ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট ও ফেনীসহ বেশকিছু জেলার শাখাগুলোতে ঋণ অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। এসব অনিয়মে প্রায় অর্ধশত কর্মকর্তা সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এ প্রসঙ্গে কৃষি ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইসমাইল হোসেন বলেন, এবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। এ টাকা ফেরত পাওয়া অনেক কঠিন। কারণ তাদের পেটে ভাত নেই। ফসল উৎপাদন করবে কোথা থেকে? একইভাবে সিডরসহ প্রাকৃতিক সব দুর্যোগে বিকেবি কৃষকের পাশে থেকে সাহায্য-সহযোগিতা করে যাচ্ছে। সে কারণে প্রতি বছরই একটু একটু করে লোকসান বাড়ছে। এছাড়া পুরনো কিছু ঋণ অনিয়ম রয়েছে। তবে অনিয়ম করা কর্মকর্তাদের কোনো ছাড় দেয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, কৃষি ব্যাংকে অপরাধ করে কারও বাঁচার উপায় নেই। ধারাবাহিকভাবে প্রত্যেককে শাস্তির আওতায় আনা অব্যাহত রয়েছে। ব্যাংকটির আরও কিছু সমস্যার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কৃষি ব্যাংকে দ্রুত এমডি পরিবর্তন হয়। ব্যাংকের উন্নয়নের জন্য এমডির ধারাবাহিকতা খুবই জরুরি। এছাড়া আইনি জটিলতায় ব্যাংকটি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারছে না। এটিও একটা সমস্যা হিসেবে দেখছেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখা যায়, জালিয়াতির মাধ্যমে লোকসান কম দেখিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। একইসঙ্গে ৩৯৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা প্রভিশন ঘাটতি ও উইনডো ড্রেসিং বা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা অতিরিক্ত আয় দেখানো হয়েছে। ফলে নিট লোকসান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শিত ৪৩টি শাখা বাদে অন্য সব শাখার প্রভিশন ও আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব দ্রুত পরিদর্শন বিভাগকে অবহিত করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কৃষি ব্যাংকের এক মহাব্যবস্থাপক বলেন, কৃষি ব্যাংকে কিছু দুর্নীতি হয়েছে। এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে দুর্নীতির বাইরেও লোকসানের অনেক কারণ রয়েছে। তিনি বলেন, কৃষককে দেয়া ৬০ শতাংশ ঋণে লোকসান গুনতে হয়। তবে কিছুটা লাভ হয় ৪০ শতাংশ বাণিজ্যিক ঋণে।

পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ব্যাংকের মোট লোকসান ৫৮৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, আলোচ্য সময়ে নতুন করে উদঘাটিত ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ৩৯৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা লোকসানের সঙ্গে সমন্বয় করলে কৃষি ব্যাংকের নিট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৭৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এর সঙ্গে চাতুরীর মাধ্যমে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা বেশি আয় দেখানো হয়েছে। ফলে ব্যাংকটির নিট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৮১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ ছিল ২১ হাজার ১৮২ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। মোট কর্জের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৮৪৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা। বিনিয়োগের পরিমাণ ৪ কোটি ৬ লাখ টাকা। বিগত পরিদর্শন তারিখে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা। আগের তুলনায় বিনিয়োগ কমেছে ২০ লাখ টাকা। যুগান্তর