এ মাসেই নিরপেক্ষ সরকারের রূপরেখা দেবে বিএনপি

রাহাত : সহায়ক সরকার নয়, এবার নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করবে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি। চলতি মাসের শেষ সপ্তাহেই এ রূপরেখা ঘোষণা করবেন দলীয় চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। একই সঙ্গে এ রূপরেখার পক্ষে দেশ-বিদেশে জনমত গড়ার জোর তৎপরতা চালাবে বিএনপি। সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সূত্র জানায়, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ইস্যুতে অহিংস কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে থেকে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে চায় বিএপি। এজন্য ইতিবাচক রাজনীতির মাধ্যমে প্রথমে সরকারের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করবে দলটি। তাই হরতাল-অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচির পরিবর্তে সভা- সেমিনার, গোলটেবিল আলোচনার মাধ্যমে নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের দাবির পক্ষে জনমত গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির। পাশাপাশি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে ভোটে কাবু করতে নানা ধরনের ছকও তৈরি করে রাখা হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লন্ডন থেকে ফিরেই সহায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করার কথা ছিল বিএনপিপ্রধান খালেদা জিয়ার। রূপরেখার খসড়াও সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। এ রূপরেখা নিয়ে লন্ডনে বসেই তারেক রহমানের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন তিনি। আলাপের একপর্যায়ে রূপরেখায় অন্তর্ভুক্ত কিছু বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করে সংশোধনীর পরামর্শ দেন তারেক রহমান। এমনকি খালেদা জিয়া লন্ডন থেকে ফিরে আসার পরে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সিনিয়র নেতারাও রূপরেখা নিয়ে আপত্তি তোলেন। এমনকি সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে বৈঠকেও সহায়ক সরকারের বিষয়টি তোলা হলে বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবিকে সমর্থন দেননি তিনি।

বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মতে, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলসংক্রান্ত রায়ের পর ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ে আরো দুই মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে পারে বলে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে। তাই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হওয়ার সুযোগ রয়েছে। সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা সম্ভব হলে সংবিধান পরিবর্তন করে প্রয়োজনে আরো এক মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে সরকার বাধ্য হবে। তাই সহায়ক সরকারের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

সূত্র জানায়, সব বিষয় বিবেচনা করে সহায়ক সরকারের রূপরেখা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যান বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। এমনকি বিভিন্ন সভা-সমাবেশে দলটির সিনিয়র নেতারা কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যান। এত আলোচনার পরে বিষয়টি নিয়ে চুপ থাকা দলের ‘প্রেস্টিজ ইস্যু’ বলে মনে করেন বিএনপিপ্রধান। অবশেষে দলের বুদ্ধিজীবী ও সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে রূপরেখার কিছু জায়গায় সংশোধনী এনে ‘নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের’ মোড়কে নতুন রূপরেখা তৈরির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন খালেদা জিয়া। যার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। চলতি মাসের শেষ সপ্তাহেই এ রূপরেখা ঘোষণা করবেন বিএনপি চেয়ারপার্সন।

সূত্র আরো জানায়, সরকার যদি দাবি মেনে নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে রাজি হয় তাহলে সেই টেবিলেই সরকারের কাছে আরেকটি রূপরেখা চাইবে বিএনপি। উভয় দলের রূপরেখা নিয়ে সন্তোষজনক সমাধানের মধ্য দিয়ে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ইস্যুর সমাপ্তি চায় দলটি। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া না পেলে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথে হাঁটবে দলটি।

এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বর্তমান সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই। তবে আলোচনা ও সমঝোতার পথ খোলা আছে। দলীয়প্রধান শিগগিরই একটি নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করবেন। ওই রূপরেখা নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে।

অন্যদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনকে ‘না’ জানিয়ে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছে বিএনপি। দলীয়প্রধানসহ সর্বস্তরের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাজা ঝুঁকি থাকলেও তা মোকাবেলা করে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও নির্বাচনের জন্য তৈরি হচ্ছে শীর্ষ নেতৃত্ব। তারা মনে করেন, বিএনপিকে নেতৃত্বশূণ্য করার ষড়যন্ত্র সফল হবে না। আপতকালীন পরিস্থিতিতে দলের হাল ধরার লক্ষ্যে একটি সংক্ষিপ্ত কমিটি প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। নেতাদের দাবি, দলের পাশাপাশি জোটের শরিকদেরও শক্তি অর্জনে নির্দেশনা দিয়েছেন জোটপ্রধান খালেদা জিয়া। ভোটের জন্য শরিক দলগুলোকেও প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। তৃণমূল নেতৃত্বও ইতোমধ্যে নেমে গেছে ভোটের মাঠে।

এ বিষয়ে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, নির্বাচনের জন্য বিএনপি সব সময়ই প্রস্তুত রয়েছে। মামলা দিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের কাবু করা যাবে না। খালেদা জিয়ার মামলার সাজা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দলীয় চেয়ারপার্সনকে সাজা দিয়ে জেলে নেয়ার ক্ষমতা সরকারের নেই। তবে এমন বাস্তবতা যদি সামনে এসেই যায়, তবে সংকটকালীন হাল ধরতে দলে বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি আছে।

দলটির স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে দলের পক্ষ থেকে এ বছরের একটি নিরপেক্ষ সরকারের রূপরেখা দেয়া হবে। একই সঙ্গে সরকারের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টাও থাকবে। ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেলে ভালো, তা না হলে আন্দোলনের বিকল্প নেই। ভোরের কাগজ