সহস্রাধিক আটকের মধ্যে কারাবন্দি ৫২৫
জামিনে মুক্ত জঙ্গিরা পালাচ্ছে বিদেশে

ডেস্ক রিপোর্ট : আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটকের পর আদালতের মাধ্যমে জামিনে মুক্ত জঙ্গিরা হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। শর্তমতো তারা আর আদালতে যাচ্ছে না। পরোয়ানা হলেও ঠিকানা বদল করায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের খুঁজে পাচ্ছে না। দুর্ধর্ষ এসব জঙ্গি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বিদেশে আত্মগোপন করেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে পুলিশের কাছে খবর রয়েছে। তারা নাশকতা ও কারাবন্দি জঙ্গিদের ছাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। সর্বশেষ তথ্যমতে, আটক সহ¯্রাধিক জঙ্গির মধ্যে কারাবন্দি রয়েছে মাত্র ৫২৫ জন। বাকিরা জামিনে মুক্ত হয়েই লাপাত্তা। এমন বেশ কয়েকজন জঙ্গি ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে গ্রেপ্তারের পর মিলেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, ২০১৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত পুলিশ সারাদেশে ২৪৩ জন জঙ্গি আটক করেছে। এছাড়া কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিট (সিটিটিসি), র‌্যাব ও ডিবি পুলিশও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জঙ্গি আটক করেছে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ইন্টিলিজেন্স এন্ড স্পেশাল অ্যাফেয়ার্স এ নিয়ে কাজ করছে।

বিভিন্ন সময়ে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে সহ¯্রাধিক আটকের পর কারাবন্দি ৫২৫ জনের মধ্যে ৩৮৭ জন হাজতি ও ১৩৮ জন কয়েদি রয়েছে। বাকিরা আদালতের মাধ্যমে জামিন পেয়েছে। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নারীও রয়েছে। গত ২১ সেপ্টেম্ব^র পর্যন্ত দেশের ৬৮টি কারাগারে সন্ত্রাস দমন (জঙ্গি) আইনে মোট ৬২৪ জন বন্দি ছিলেন। ২৬ নভেম্বর ছিল ৫২৫ জন। অর্থাৎ দুই মাসের মধ্যে কারামুক্তি হয়েছে শতাধিক জঙ্গির।

আদালত, কারা সূত্র ও গোয়েন্দা তথ্য মতে, পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন সন্ত্রাস দমন আইনে দায়ের করা মামলার প্রায় ৫০০ এজাহারভুক্ত আসামি। পুলিশের কাছে থাকা তথ্য মতে তারা সবাই জঙ্গি। যাদের মধ্যে কয়েক বছরে উধাও হয়েছে ৪৪০ ‘জঙ্গি’। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ বলছেন তারা (জঙ্গিরা) সীমান্ত অঞ্চলে লুকিয়ে আছেন। তবে একটি গোয়েন্দা সংস্থা বলছে, তারা বিদেশে পালিয়ে গেছেন।

অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল মো. ইকবাল হাসান বলেছেন, সারাদেশে কারাগারে প্রায় ৮০ হাজার বন্দি রয়েছে। এরমধ্যে ৬০ হাজার বন্দির মামলা বিচারাধীন। তিনি বলেন, মামলার বর্ণনা মতে ৩৮৭ জন হাজতি ও ১৩৮ জন কয়েদি সন্ত্রাস দমন আইনের আসামি। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে ৯৯ জন নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সদস্য। এদের মধ্যে ২৪ জনের মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিয়েছেন আদালত। সন্ত্রাস দমন আইনের মামলার আসামিদের মধ্যে কারাগার থেকে অনেকে জামিনে ছাড়া পেয়েছে বলে তিনি জানান। বিষয়টি আদালত পুলিশ দেখভাল করে বলেও তিনি জানান।

সূত্র মতে, সেপ্টেম্ব^রের শেষ দিকে জঙ্গি প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির বৈঠকে জামিন নিয়ে পলাতক জঙ্গিদের তথ্য তুলে ধরে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা। বৈঠকে পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বিদেশে পালিয়ে যাওয়া আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।

ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এমন কয়েকজন জানান, একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী জামিন নিয়ে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া ৩৩১ জনের বিরুদ্ধে সরাসরি জঙ্গিবাদে জড়ানোর প্রমাণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে রয়েছে। বাকিরা সন্দেহভাজন। বাংলাদেশি এসব জঙ্গির বিদেশে অনুপ্রবেশ এবং সেখানে গিয়ে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার তথ্য ওই বৈঠকে উঠে আসে। পালিয়ে যাওয়া আসামিদের ফিরিয়ে আনতে মামলা দায়েরকারী সংশ্লিষ্ট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি), আদালত পুলিশ ও পাবলিক প্রসিকিউটরকে নির্দেশনা দিয়েছে কমিটি।

এদিকে ভারতের দিল্লি থেকে সম্প্রতি ‘আল কায়েদার প্রধান কর্মী সংগ্রাহক’ সামিউন রহমানকে গ্রেপ্তার করে সে দেশের পুলিশ। সামিউন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক। ভারতীয় পুলিশের দাবি, চলতি বছরের জুলাইয়ে তিনি সিলেট সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেন। তার দেয়া তথ্যের সূত্রে ভারতের কলকাতায় জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের (এবিটি) আরেক সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে সেখানকার স্পেশাল টাস্কফোর্স (এসটিএফ)। ২৩ নভেম্বর বৃহস্পতিবার রাতে শিয়ালদহ স্টেশনসংলগ্ন জগৎ সিনেমা হল থেকে শাহদাত হোসেন ওরফে বাবু নামে ওই জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করা হয়। শাহদাতের বাড়ি বাংলাদেশের যশোরের বেনাপোলে। এর আগে ২১ নভেম্বর মঙ্গলবার কলকাতা থেকে এবিটির আরো তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি। তারা হলো, সামসাদ মিয়া ওরফে তানভীর ও রিয়াজুল ইসলাম ওরফে সুমন। তাদের সঙ্গে মনোতোষ দে নামে এক ভারতীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। সে এবিটি জঙ্গিদের অস্ত্রের জোগান দিত।

এসটিএফের দাবি, জঙ্গিরা বাংলাদেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি এবিটি নেতাদের ছাড়ানোর ছকও কষেছিল। আটককৃতরা বাংলাদেশে ব্লুগার হত্যার হিটলিস্ট তৈরি করছিল। ওই তালিকার শীর্ষে আছে ব্লুগার ফারুক সাদিকের নাম। সামসাদ ভুয়া ‘আধার’ কার্ড (জাতীয় পরিচয়পত্র) তৈরি করিয়ে স্থায়ী হয়। সে বাংলাদেশের সিলেটে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়েছে বলে স্বীকার করেছে। সামসাদ ও রিয়াজুল গত বছরের জুলাই মাসে ভারতে প্রবেশ করে।

কলকাতায় গ্রেপ্তার সামসাদ ও রিয়াজুল এবিটি সদস্য বলে নিশ্চিত করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের উপকমিশনার মহিবুল ইসলাম। তিনি বলেন, তাদের খোঁজ করা হচ্ছিল। গ্রেপ্তার করার পর ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি ঢাকাকে জানিয়েছে।

অন্যদিকে সেপ্টেম্বরে জঙ্গি প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির বৈঠকে ময়মনসিংহের ত্রিশালে জঙ্গি ছিনতাই ঘটনার উদাহরণ টেনে বলা হয়, সেদিন পুলিশের প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে জেএমবির সালাউদ্দিন সালেহীন, রাকিব হাসান রাসেল (হাফেজ মাহমুদ) ও জাহিদুল ইসলামকে (বোমারু মিজান) ছিনিয়ে নেয়া হয়। প্রিজন ভ্যানে হামলাকারী আনোয়ার হোসেন ফারুক জামিনে মুক্ত ছিলেন। পরে অবশ্য কলকাতা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ভারতের পুলিশ।
বৈঠকে গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ২০০ জন সন্দেহভাজন এবং ১৪৮ জন অভিযুক্ত ‘জঙ্গি’ কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। আগস্টের ৩০, ৩১ এবং ১ সেপ্টেম্ব^র ২০ জন ‘চিহ্নিত জঙ্গি’ কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হন। এরপর থেকে তারা হাওয়া।

কারা সূত্র মতে, গত ৩১ আগস্ট কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পায় নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের নেতা আবদুল বাতেন। বাতেনের বিরুদ্ধে মানিকগঞ্জে দুটি, রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি এবং বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা রয়েছে। একই দিন একই কারাগার থেকে মুক্তি পান তিন জঙ্গি আবুল কালাম, মিজানুর রহমান ও সেলিম মিয়া। তাদের বিরুদ্ধে রাজধানীর দারুস সালাম থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা রয়েছে। পরদিন ১ সেপ্টেম্ব^র জামিন পান মামুনুর রশিদ, ইয়াসিন, জাহিদুল ইসলাম ও মোর্শেদ ওরফে মাসুম নামে আরও চার জঙ্গি। মামুনুর রশিদ ও ইয়াসিনের বিরুদ্ধে ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানায় সন্ত্রাসবিরোধী, জাহিদুলের বিরুদ্ধে গেন্ডারিয়া থানায় এবং মাসুমের বিরুদ্ধে মিরপুর থানায় সন্ত্রাস দমন আইনে একটি মামলা রয়েছে। জামিনপ্রাপ্তদের অধিকাংশ জেএমবি সদস্য। ভোরের কাগজ