জিয়া পরিবারের ১২শ কোটি টাকা বিনিয়োগে তোলপাড়

মামুন : বিদেশে জিয়া পরিবারের ১২শ কোটি টাকা বিনিয়োগের বিষয়টি নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় চলছে। পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারির ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই সৌদি আরবে জিয়া পরিবারের ৫০০ কোটি টাকা গচ্ছিত রাখার তথ্য ফাঁসের ঘটনা সাম্প্রতিক রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এছাড়া দুবাই, কাতারসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১২শ কোটি টাকা লেনদেন করেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান- দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে এমন খবর প্রকাশের পর বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। এ নিয়ে বাকযুদ্ধে নেমেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনকে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে সরকারপক্ষ। অন্যদিকে বিদেশে খালেদা জিয়া ও তার পরিবারের সম্পদ নিয়ে সরকারপক্ষের বক্তব্য প্রত্যাহার করা না হলে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিয়েছে বিএনপি।

প্রসঙ্গত, জিয়া পরিবারের দুবাইসহ ১২টি দেশে ১২শ কোটি টাকা পাচার সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গোয়েন্দা সংস্থা গ্লোবাল ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্কের (জিআইএন) রিপোর্ট সরকারের হাতে এসেছে বলে গত ১৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদকে জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ নিয়ে তদন্ত চলছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তদন্তে জিআইএনের রিপোর্টের সত্যতা প্রমাণিত হলে যারা দেশের জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করে বিদেশে পাচার করেছে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। একই সঙ্গে পাচারকৃত অর্থ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফেরত আনা হবে।

জিআইএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী শুধু দুবাই নয়, ১২টি দেশে জিয়া পরিবারের সম্পদ আছে- যার পরিমান ১ হাজার দুইশ কোটি টাকা। তথ্যমতে, সৌদি আরবে আহমদ আল আসাদের নামে আল আরাবা শপিং মল রয়েছে। কিন্তু শপিং মলটির প্রকৃত মালিকানা হলো খালেদা জিয়ার। কাতারে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন ইকরা। এটির মালিকও খালেদা জিয়া ও তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান। এছাড়া খালেদা জিয়ার ভাতিজা তুহিনের নামে কানাডায় তিনটি বাড়ি রয়েছে।
সৌদি আরবে স¤প্রতি দুর্নীতির অভিযোগে কয়েকজন শাহজাদা ও দায়িত্বপাপ্ত মন্ত্রীকে আটক করা হয়।

এদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তাদের দুর্নীতির সঙ্গে বিশ্বের আরো অনেক দেশের রাজনীতিক জড়িত। এদের মধ্যে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তার পরিবারের সদস্যদের নামও এসেছে। জিয়া পরিবারের সদস্যরা মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে সে দেশে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। জিয়া পরিবার সৌদি আরবে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে এই অর্থ বিনিয়োগ করেছে। খালেদা জিয়ার পাশাপাশি তার বড় ছেলে তারেক রহমান, খালেদার ভাই শামীম ইস্কান্দারের নাম রয়েছে।বৃহস্পতিবার বিকেলে গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে সৌদি আরবে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার সংক্রান্ত বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দেশের মানুষই এর বিচার করবে। আর দেশের প্রচলিত আইনানুযায়ীও তার বিচার হওয়া উচিত। অবশ্যই তার বিচার হবে। এর পরই বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
বাকযুদ্ধে আওয়ামী লীগ-বিএনপি : জিয়া পরিবারের অর্থ পাচার সংক্রান্ত তথ্য ফাঁসের ঘটনায় মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে দুই মেরুর দুই দল।

জিয়া পরিবাবের বিদেশে অর্থ বিনিয়োগের বিষয়টি প্রমাণিত হলে বিএনপিকে ক্ষমা চাইতে হবে- এমন দাবি করে এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে আওয়ামী লীগ। গতকাল শনিবার ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ১২টি দেশে ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে জিয়া পরিবার। আর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেল প্রকল্পে দুর্নীতির যে অভিযোগ করেছেন তা প্রমাণ করতে হবে। প্রমাণ করতে না পারলে বিএনপির বিরুদ্ধেও মামলা করব।
কানাডিয়ান টেলিভিশনের খবরের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অকপটে এ বিষয়ে কথা বলেছেন উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, শেখ হাসিনা যা বলেছেন জেনেশুনে বলেছেন। তথ্য প্রমাণ আছে বলেই বলেছেন। সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার দেয়া বক্তব্য খণ্ডন করতে গিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আরেক সংবাদ সম্মেলনে যে অশ্রাব্য ভাষা ব্যবহার করেছেন সেটাই বিএনপির চরিত্রের আসল বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেন কাদের।

আওয়ামী লীগের এ নেতা আরো বলেন, সৌদি আরবের বর্তমান প্রিন্স দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু করেছেন। সেখানে ১১ জন প্রিন্স অভিযুক্ত ও কেউ কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন বলেছেন, খালেদা জিয়া, তারেক রহমান ও শামীম ইস্কান্দার ব্যবসায়িক কাজে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। সৌদি আরব, কাতারসহ ১২টি দেশে তারা বিনিয়োগ করেছেন। এ খবরে বিএনপির কেন গাত্রদাহ। দুদকের প্রতি আহ্বান জানাই, তদন্ত করে সঠিক তথ্য বের করে এত বড় কেলেঙ্কারি বিচারের আওতায় আনা হোক। দুদকে গিয়ে প্রমাণ করুন আপনারা (বিএনপি) নির্দোষ।

এদিকে, জিয়ার দল বিএনপি এই অভিযোগকে মিথ্যা, ভিত্তিহীন বলে পাল্টা প্রধানমন্ত্রীর দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে কল্পিত পাচারকৃত সম্পদের বর্ণনা এবং কল্পিত সংবাদ মাধ্যমে তা প্রকাশের কল্পিত কাহিনী প্রকাশ করেছেন- যা সর্বৈব মিথ্যা, বানোয়াট, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন। দেশের ‘সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রীর’ ভাবমূর্তি বিনষ্ট করা এবং তাকে রাজনৈতিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করাই এর উদ্দেশ্য বলে অভিযোগ করেন বিএনপি মহাসচিব। এই মানহানিকর তথ্য প্রচারের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান জানান ফখরুল। অন্যথায় আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবেন বলে সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি। ভোরের কাগজ