আগেই ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে আয়ের কৌশল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের

জাহিদ হাসান : বলা হয়ে থাকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের শেষ ভরসা। যথন কোনো শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে কোথাও চান্স না পায় তখন সে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দারস্ত হয়। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আগেই হওয়ার বিষয়টি একটু আশ্চর্যের।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালেয় অধীনে কয়েক বছর আগেও অনার্স-মাস্টার্স পাশ করে বের হতে দীর্ঘ সময় লেগে যেত। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া এখন নেই। ক্রাশ প্রোগামের মাধ্যমে এখন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই অনার্স-মাস্টার্স পাশ বের হয়ে যাওয়া সম্ভব। এই রিপোর্টির প্রতিবেদক বর্তমানে সরকারি টিটার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকাতে ব্যাচেলর অব এডুকেশন অনার্সের চতুর্থ বর্ষে অধ্যায়রণরত। আমি নিজেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রাশ প্রোগ্রামের সুবিধা ভোগ করছি। ক্রাশ প্রোগ্রামে এমন হয়েছে যে কোর্চের নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ফরম পূরণ শুরু হয়ে যায়। ফলে তাড়াহুড়ো করে শ্রেণি শিক্ষকরা পাঠদার শেষ করে দেন!

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাবি অধিভুক্ত রাজধানীর সাত কলেজে ভর্তির সুযোগ না পাওয়া শিক্ষার্থীদের শেষ ভরসা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলো। কিন্তু এবার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানীর সাত কলেজের ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কার্যক্রম শেষের পথে। অথচ আগে কখনোই এমনটি হয়নি। এতে হাজারো শিক্ষার্থীর আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বিপাকে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইতোমধ্যে যারা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে গেছেন, তারা যদি পরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা ঢাবি অধিভুক্ত ৭ কলেজের কোনোটিতে ভর্তির সুযোগ পান, তবে বড় অংকের টাকা গচ্চা দিতে হবে। কেননা, সেক্ষেত্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিশোধ করা ভর্তির আবেদন ফি, রেজিস্ট্রেশন ফি এবং ভর্তির জন্য পরিশোধ করা টাকা ফেরত পাবেন না তারা।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার কৌশল হিসেবেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সবার আগে ভর্তি কার্যক্রম শুরু করেছে। এছাড়া, এতে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পরে ভর্তি বাতিলের কারণে বিপুলসংখ্যক আসন শূন্য হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিপরীতে, হাজারো শিক্ষার্থী থাকবেন, যারা কোথাও ভর্তির সুযোগ পাননি। পরে পরীক্ষা হলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পাওয়া শিক্ষার্থীরা এগুলোয় ভর্তি হতে পারতেন।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বুঝে শুনেই এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেক শিক্ষার্থী। তারা বলছেন,শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার জন্যই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এই কাজটি করেছে। রাজধানীর সাত কলেজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে ঢাবি অধিভুক্ত হওয়ার জের ধরে এমনটি করা হতে পারে বলেও মনে করছেন অনেকে।

তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, অর্থ নয় বরং ‘ক্রাশ প্রোগ্রামের’ আওতায় সেশন জট কমানোর জন্যই ভর্তি কার্যক্রম সবার আগে শুরু করা হয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সারাদেশের তিন লাখ ৯১ হাজার ৫৫টি আসনের বিপরীতে ২০ সেপ্টেম্বর শেষ দিন পর্যন্ত আবেদন পড়ে পাঁচ লাখ ৩১ হাজার। বিশ্ববিদ্যালয়টি ক্লাসও শুরু করেছে ১৫ অক্টোবর থেকে।

চলতি ২০১৭-২০১৮ শিক্ষাবর্ষে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিচ্ছুদের কাছ থেকে আবেদন গ্রহণ শুরু করে ২৪ আগস্ট থেকে। তার আগের ২০১৬-২০১৭ শিক্ষাবর্ষে আবেদন গ্রহণ শুরু করেছিল ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে। আর ২০১৫-২০১৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তির আবেদন গ্রহণ শুরু করেছিল ১ অক্টোবর থেকে।

এবার দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের ভর্তি কার্যক্রম শুরু করে অক্টোবর থেকে।

তবে রাজধানীর শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশালের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস এবং চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও ভর্তি কার্যক্রম শেষ হয়নি। এখনও ভর্তি পরীক্ষা বাকি রয়েছে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের।

রাজধানীর সাত সরকারি কলেজে স্নাতক শ্রেণির প্রায় ২০ হাজার আসনের বিপরীতে ভর্তি পরীক্ষা শুরু হয়েছে ১ ডিসেম্বর থেকে।

এদিকে, গত ২০ নভেম্বর এক নোটিশে দ্বিতীয় রিলিজ স্লিপের তালিকাকে সর্বশেষ তালিকা উল্লেখ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ভর্তি কার্যক্রম শেষ করার ইঙ্গিত দিয়েছে।

শিক্ষার্থী প্রতি ভর্তির আবেদন এবং রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েছে ৭৩৫ টাকা করে। আবার ভর্তি ফি বাবদ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলো নিয়েছে পাঁচ থেকে ১৫ হাজার টাকা।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত রাজধানীর সরকারি বিজ্ঞান কলেজে ভর্তি হওয়া শাওন তালুকদার বলেন, ‘আমি গ্রামের ছেলে। বাবা কৃষক। অনেক কষ্টে এ কলেজে ভর্তি হয়েছি। আবার ঢাবি অধিভুক্ত ৭ কলেজ এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি পরীক্ষা দিচ্ছি। যদি এর কোনোটিতে ভর্তির সুযোগ পাই, তাহলে আমি বিজ্ঞান কলেজ থেকে ভর্তি বাতিল করবো। কিন্তু কলেজ কর্তৃপক্ষ ভর্তির আবেদন ফি ও রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ ৭৫০ টাকা এবং ভর্তি ফি বাবদ নেওয়া প্রায় ১৫ হাজার টাকা তো ফেরত দেবে না।’

শাওন তালুকদার বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কৌশলে বিপুল টাকা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিতেই আগেভাগে ভর্তি কার্যক্রম শুরু করেছে। শাওন তালুকদারের মতোই তার কয়েকজন বন্ধুর এ প্রতিবেদকের কাছে একই অভিযোগ করেন।

রাজধানীর সিটি কলেজে ভর্তি হওয়া আসিফুল কাদির বলেন, ‘গত বছর তো রাজধানীর সাত সরকারি কলেজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল। এখন এগুলো ঢাবি অধিভুক্ত। স্বাভাবিকভাবেই এই সাত কলেজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ থেকেও এগিয়ে রয়েছে। ফলে কেউ যদি ঢাবি অধিভুক্ত এসব কলেজে ভর্তি হওয়া সুযোগ পায় তাহলে তারা কেউ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজে যাবে না। আমি নিজেও সুযোগ পেলে অন্য কোথাও চলে যাবো।’

ভর্তির টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে সরকারি বিজ্ঞান কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ড. মো. হারুন অর রশিদ বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি কোষাগারে সেই টাকা পৌঁছে যায়। ভর্তি বাতিল করলেও সেই টাকা ফেরত দেওয়ার সুযোগ আমাদের হাতে নেই।‘

ভর্তি কার্যক্রম সবার আগের শুরু করার বিষয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব আন্ডারগ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের ডিন অধ্যাপক ড. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘ভর্তি কার্যক্রম আগে শুরু করার উদ্দেশ্যই হলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভয়ানক সেশনজট থেকে বাঁচানো। এছাড়া অন্য কোনও উদ্দেশ্য নেই।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রাজধানীর ওই সাত কলেজের ভর্তি পরীক্ষা শেষে হয়ত বেশকিছু শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যাবে, কিন্তু আমাদের কিছু করার নেই। কারণ, সেশনজট কমাতে সময়মতো ক্লাস শুরু করতে হয়। ঢাবি অধিভুক্ত সাত কলেজ ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা শেষ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করলে আমাদের অনেকদিন বসে থাকতে হয়। অপেক্ষা করলে তো আমরা আমাদের কলেজগুলোকে সেশনজট মুক্ত করতে পারবো না।’

ভর্তি বাতিল করলে শিক্ষার্থীদের ভর্তির টাকা ফেরত দিতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন,‘ভর্তির সময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ ভর্তি বাতিল করলে তাকে অবশ্যই ফেরত দিতে হবে। ভর্তি নির্দেশিকাতেও সেটাই উল্লেখ করেছে। কোনও কলেজ কর্তৃপক্ষ যদি না দেয় তাহলে শিক্ষার্থীরা আমাদের জানালে ওই কলেজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে ভর্তির আবেদন এবং রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নেওয়া ৭৩৫ টাকা ফেরত দেওয়া হয় না।’

কিছুটা সংযুক্ত ও বাকি অংশ বাংলা ট্রিবিউন অবলম্বনে