প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে স্বপ্ন দেখাচ্ছে যশোর বোর্ডের প্রশ্নব্যাংক

মাইকেল : প্রশ্ন ফাঁস রোধ, অর্থ ও সময় বাঁচানো, সর্বোপরি শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে যশোর বোর্ড উদ্ভাবিত প্রশ্নব্যাংক। বছর তিনেক আগে হাতে নেওয়া এ প্রকল্পের মাধ্যমে বোর্ডের সার্ভারে ইতিমধ্যে যুক্ত হয়েছে ৫০ লাখ নৈর্ব্যত্তিক, সৃজনশীল ও রচনামূলক প্রশ্ন, যেখান থেকে বাছাইকৃত এক সেট প্রশ্ন অনলাইনের মাধ্যমে মাধ্যমিক স্তরের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার মাত্র এক ঘণ্টা আগে পৌঁছে যাচ্ছে কেন্দ্রে কেন্দ্রে। এর ফলে একদিকে যেমন মানসম্মত প্রশ্নপত্র তৈরি হচ্ছে, তেমনি পরীক্ষার আগে প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার কোনো আশঙ্কা থাকছে না। সংশ্লিষ্ট বোর্ড কর্মকর্তারা জানান, ২০১৫ সালের প্রথম দিকে ‘প্রশ্নব্যাংক’-এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালের মার্চে পরীক্ষামূলকভাবে এটি চালু করা হয়। এর পর থেকে শিক্ষকরা বিষয়ভিত্তিক ইউনিক প্রশ্ন তৈরি করে অনলাইনের মাধ্যমে প্রশ্নব্যাংকে জমা দিচ্ছেন। ইতিমধ্যে অন্তত ৫০ লাখ প্রশ্ন জমা পড়েছে। জমা পড়া এসব প্রশ্ন যাচাই-বাছাইয়ের জন্য প্রতিটি বিষয়ে ২০ সদস্যের একটি সম্পাদনা প্যানেল রয়েছে, যে প্যানেলের অনুমোদিত প্রশ্নপত্র নির্ধারিত সফটওয়্যারে জমা থাকে। এখান থেকে নির্দেশনা অনুযায়ী সফটওয়্যার এক সেট প্রশ্ন তৈরি করে দেয়, যা পরীক্ষার মাত্র এক ঘণ্টা আগে প্রধান শিক্ষকরা নিজ নিজ পাসওয়ার্ড দিয়ে ডাউনলোড করে পরীক্ষা গ্রহণ করেন। শুরুর কথা : দীর্ঘদিন ধরে দেশের পাবলিক পরীক্ষা ছাড়াও বিভিন্ন চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে চলেছে। কোনোভাবেই এ সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব হচ্ছে না।

২০১৫ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন নজরুল ইসলাম খান। তিনি একবার যশোর এসে প্রশ্ন ফাঁস রোধে একটা উপায় খুঁজে বের করার পরামর্শ দেন বোর্ড কর্মকর্তাদের। তখনই এই প্রশ্নব্যাংক পদ্ধতির কথা ভাবতে শুরু করেন বোর্ড কর্মকর্তারা। ওই বছরেরই মার্চে প্রশ্নব্যাংকের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। ২০ জুন অনলাইন প্রশ্নব্যাংকের মাধ্যমে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ২১ জুন এ-সংক্রান্ত ফাইলে স্বাক্ষর করেন যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাধব চন্দ্র রুদ্র। আর এখন প্রশ্নব্যাংক পদ্ধতির মাধ্যমে ২০১৯ সালে পাবলিক পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনা করছে মন্ত্রণালয়। চলতি বছরের মাঝামাঝিতে যশোরের একটি অভিজাত হোটেলে প্রশ্নব্যাংকে প্রশ্ন আপলোড ও ডাউনলোড বিষয়ক এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক-১) চৌধুরী মুফাদ আহমেদ বলেন, ‘যশোর শিক্ষা বোর্ডের অনলাইন প্রশ্নব্যাংক অত্যন্ত মানসম্মত ও যুগোপযোগী। দেশের শিক্ষাবিদরা এই প্রশ্নব্যাংক পদ্ধতির প্রশংসা করেছেন। যশোর বোর্ডকে অন্য শিক্ষা বোর্ডগুলো মডেল হিসেবে গ্রহণ করছে। আগামীতে প্রশ্নব্যাংকের প্রশ্নে জাতীয় পর্যায়ের পরীক্ষাগুলো কীভাবে নেওয়া যায় তা নিয়ে আলোচনা চলছে। ’ যেভাবে কাজ করে প্রশ্নব্যাংক : প্রশ্নব্যাংকের মূল কাজটি করেন শিক্ষকরা। বোর্ডের অধীনে থাকা ২৫০০ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকরা এখানে বাধ্যতামূলকভাবে নিজের তৈরি প্রশ্ন আপলোড করেন। নিজ নিজ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এসব শিক্ষককে চূড়ান্ত করেন। মনোনীত শিক্ষকরা তাদের তৈরি করা নৈর্ব্যত্তিক, সৃজনশীল ও রচনামূলক প্রশ্ন নিজেদের আইডি ব্যবহার করে আপলোড করেন। শিক্ষকদের তৈরি করা এসব প্রশ্ন সম্পাদনা করতে প্রতি বিষয়ের জন্য রয়েছে ২০ জনের একটি সম্পাদনা প্যানেল, যারা প্রশ্ন পাকা করে নির্দিষ্ট সার্ভারে জমা করেন। সেখান থেকে প্রশ্ন চূড়ান্তকরণের জন্য রয়েছে তিন সদস্যের আরও একটি টিম। চূড়ান্ত প্রশ্ন থেকে কম্পিউটার সফটওয়্যার নির্দেশনা অনুযায়ী এক সেট মানসম্মত প্রশ্ন তৈরি করে, যা প্রধান শিক্ষকরা তাদের নিজস্ব আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে ডাউনলোড করে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেবেন।

এখনো পর্যন্ত সফলতা : এখনো পর্যন্ত যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে থাকা স্কুলগুলোতে চার দফায় এই পদ্ধতিতে পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়েছে। সর্বশেষ বোর্ডের ২৫০০ বিদ্যালয়ের ২০১৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ১৭টি বিষয়ের নির্বাচনী পরীক্ষা এ পদ্ধতিতে গ্রহণ করা হয়। এর আগে শুরুতে বোর্ডের নির্বাচিত ১৪১টি বিদ্যালয়ের, দ্বিতীয় দফায় ৬৬২টির এবং তৃতীয় দফায় এক হাজার ৩১১টি বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা গ্রহণ করা হয় এ পদ্ধতিতে। আর এখন বোর্ডের সব বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা এই প্রশ্নব্যাংক পদ্ধতিতে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে বোর্ডের সব স্কুলের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বার্ষিক, অর্ধবার্ষিক, প্রাকনির্বাচনী ও নির্বাচনী পরীক্ষা গ্রহণ করা হবে এই প্রশ্নব্যাংকের প্রশ্নে। যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাধব চন্দ্র রুদ্র বলেন, ‘ইতিমধ্যে যশোর শিক্ষা বোর্ডের সব কার্যক্রম অনলাইন প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হচ্ছে। পরীক্ষা গ্রহণ পদ্ধতি অনলাইনে আনার জন্য প্রশ্নব্যাংক চালু করা হয়েছে। ইতিমধ্যে আমরা পরীক্ষামূলকভাবে চারটি পরীক্ষা সম্পন্ন করেছি। এই পদ্ধতিতে প্রশ্ন ফাঁস যেমন রোধ হবে, তেমনি শিক্ষার মানও বাড়বে। কেননা এই পদ্ধতিতে শিক্ষকরা ইউনিক প্রশ্ন তৈরি করে জমা দেন। ফলে তাদের লেখাপড়া করতে হয়। এটা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হলে নোট ও গাইড বইয়ের দৌরাত্ম্য কমবে। ফলে শিক্ষার গুণগত মান বাড়বে। ’ সব বোর্ডের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে প্রশ্নব্যাংক তৈরি ও নিরাপত্তা উপকমিটি নামে একটি কমিটি আছে। এ কমিটির সদস্যসচিব যশোর বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাধব চন্দ্র রুদ্র। তিনি বলেন, ২০১৯ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের টেস্ট পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে ২০১৮ সালে। সারা দেশের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের এই টেস্ট পরীক্ষা প্রশ্নব্যাংক পদ্ধতিতে নেওয়া হবে বলে প্রশ্নব্যাংক তৈরি ও নিরাপত্তা উপকমিটির সর্বশেষ সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরপর মূল পাবলিক পরীক্ষাও এ পদ্ধতিতে নেওয়া শুরু হবে।

সূত্র : বিডি প্রতিদিন