টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ

ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী : টেকসই উন্নয়ন বর্তমানে বিশ্বজুড়ে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি শব্দ। অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেন বিমানবন্দরে একটি নোটিস দেখে এটি আরো বেশি প্রতীয়মান হয়। ইউনিসেফ লিখেছে ০.৫০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার দিলে অনুন্নত বিশ্বে একজন নাগরিক দু’দিন সুপেয় পানি পাবে। টেকসই উন্নয়নের জন্যে আমাদের সরকার নানাবিধ প্রয়াস নিয়েছেন। সরকারের এ প্রয়াসের লক্ষ্য স্থিতিশীল অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বেগবান করা। দেশে বর্তমানে অতি দারিদ্র্য হচ্ছে ১২.৯% এবং তুলনামূলক দারিদ্র্য হচ্ছে ২৪.৩%। সব উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি পূর্বশর্ত থাকে। আর তা হলো জনসংখ্যা। যদিও উন্নত বিশ্বের অর্থনীতিবিদরা জনসংখ্যাকে আজকাল ‘পপুলেশন ডিভিডেন্ড’ হিসেবে দেখতে চাচ্ছেন। তারা কিন্তু বিষয়টি তাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বলছেন। আমাদের দেশের অবস্থায় এটিকে ‘পপুলেশান ডিভিডেন্ড’ তখনই বলা যাবে যখন আমরা এ জনসংখ্যার আধিক্যকে কার্যত বিদেশে প্রেরণ উপযোগী করতে পারব।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন সরকারের পাশাপাশি এনজিওরা বিশাল ভূমিকা পালন করে চলেছে। প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা এনজিওদের বাজারে চলমান রয়েছে— যার মধ্যে পিকেএসএফের সরবরাহকৃত টাকার পরিমাণ সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকা। এ অর্থচক্র মানুষের মানবিক মর্যাদা এবং অগ্রসর জীবনযাত্রা, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং স্ব-কর্ম উদ্যোগী কিংবা কর্মসংস্থান উপযোগী মানবসম্পদের গড়ে তোলার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ-এর ভাষায় “অধিকার” ও “উন্নয়ন”— দুটো সমার্থক শব্দ যা মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে থাকে। তবে দারিদ্র্য বলুন, ক্ষমতায়ন বলুন সুষম খাদ্যের বণ্টন নিশ্চিত করা করুন, অধিকার প্রতিষ্ঠা বলুন বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে টেকসই উন্নয়নের বৃহত্তর স্বার্থে হয় জনসংখ্যা রোধকল্পে নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই একটি বাস্তবসম্মত নীতি বাস্তবায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে, অথবা বিদেশে রপ্তানিযোগ্য মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশ যেহেতু বর্তমানে ডেল্টা প্ল্যান তৈরি করছে আশা করব প্রথমটি নীতিনির্ধারকরা যদি গুরুত্ব না দেয়, শেষোক্তটি অনুযায়ী অবশ্যই সুষ্ঠু নীতিমালা প্রণয়ন, টেকসই যোগ্য ও অঞ্চল এবং জনগোষ্ঠীভিত্তিক মানব উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে কেবল সরকার নয় বরং এনজিও ও কর্পোরেট হাউসগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

বস্তুত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় সর্বক্ষেত্র থেকে দারিদ্র্য ও বঞ্চনা দূর করার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন সূচনাগুলোতে ভালো করছে। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় নারী উন্নয়নে শীর্ষে রয়েছে। শিশু মৃত্যুর হার, সুপেয় পানি প্রাপ্তি, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, জীবনে বেঁচে থাকার ব্যাপ্তি সর্বত্র বাংলাদেশ দক্ষতা ও কার্যকারিতার সঙ্গে উন্নয়নকে প্রসারমান ও বেগবান করতে সক্ষম হয়েছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ক্ষেত্রে নানামুখী উদ্ভাবনী শক্তির প্রয়োগ ঘটাচ্ছে। তারপরও দেখা যায়, বাংলাদেশ একদিক দিয়ে বিদেশ থেকে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেন, অন্যদিকে এদেশে কার্যকর ও দক্ষ জনশক্তি না থাকায় আবার বিদেশ থেকে জনশক্তি আনতে হয়। বিদেশ থেকে যারা দেশে অর্থ প্রেরণ করেন তাদের অধিকাংশই হচ্ছে “ব্লু কলার লেবার” (Blue Collar labour)। অন্য দেশে দেখেছি ব্লু কলার হোক কিংবা হোয়াইট কলার হোক বাইরে থেকে যারা দেশে অর্থ পাঠায় বিমানবন্দরগুলোতে তারা কেমন ভালো ব্যবহার পায়। সম্প্রতি শাহজালাল বিমানবন্দরে একজন শ্রমিকের সঙ্গে ইমিগ্রেশনে এমন ব্যবহার করতে দেখলাম ও শুনলাম যে ব্যথিত না হয়ে পারলাম না। মনে মনে বললাম, ধরণী দ্বিধা হও। দু’একজন ইমিগ্রেশন অফিসারের মধ্যে বুঝিবা পাকিস্তানি পুলিশের প্রেতাত্মা ভর করে ওঠেছিল সেদিন। বিদেশে যেমন প্রতি বছর যেকোনো ক্ষেত্রেই সাইকোলজিক্যাল টেস্ট সত্যিকার অর্থে হয়, বাংলাদেশেও বিশেষত ইমিগ্রেশন অফিসারসহ সকল চাকরিজীবীর ক্ষেত্রেও তাই করা উচিত।

পিকেএসএফ তার দু শতাধিক পার্টনার অগ্রানাইজেশনের মাধ্যমে প্রায় দু শ ইউনিয়নে সমৃদ্ধি নামে একটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এটি একটি হোলিস্টিক অ্যাপ্রোচ। এতে উন্নয়নের পূর্ণাঙ্গ একটি রূপরেখা দেওয়া আছে। এক্ষেত্রে বলা চলে মাইক্রো ক্রেডিট, মাইক্রো ফিন্যান্সিং মানুষকে আত্মমর্যাদাবান করে তোলে, তার জীবনযাত্রার পরিপূর্ণতা আনয়নে সহায়তা করে। অন্য প্রকল্পে অর্থ কাটছাঁট করে হলেও ‘সমৃদ্ধি’ কর্মসূচিটি অধিক হারে বাস্তবায়নের সুপারিশ থাকল। নিজের গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল দেখেছি যে, ‘সমৃদ্ধি’ কর্মসূচি যেখানে বাস্তবায়ন হচ্ছে সেখানে মানুষের কর্মসংস্থান, নন ফার্ম এক্টিভিটিজসহ জীবন যাত্রার মান উন্নয়নের ধাপগুলো দৃশ্যমানভাবে পরস্ফুিট হয়েছে।

তবে একটি কথা না বললেই নয় যে, ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের উপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তাকে যদি স্থানীয় পর্যায়ে অংশীদারিত্বমূলক উন্নয়নে আনতে হয় তবে ক্ষুদ্র বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশ এবং স্থানীয় অর্থনীতির সুবিধা বিবেচনায় এনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার যা কেবল কমিউনিটি ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে সম্ভব। নীতিনির্ধারকরা বিবেচনায় আনতে পারেন কনভেনশনাল ব্যাংকিং-এর আওতায় অঞ্চলভিত্তিক দারিদ্র্য, গোষ্ঠীভিত্তিক অসহায়ত্ব যেহেতু দূর করা যায় না সেহেতু নন কনভেনশনাল উপায়ে পৃথক রেগুলেটরের মাধ্যমে কিংবা অন্য কোনো উপযুক্ত সংস্থার তত্ত্বাবধানে কমিউনিটি ব্যাংকিং চালু করে ক্ষুদ্র সঞ্চয় ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগ ও সরবরাহজনিত সমস্যা দূরীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায় কিনা। আমাদের দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে আইন থাকলেও যেভাবে আমরা ভেজাল মেশাই আর ভেজাল খাই এটি কিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে তা সুদূর কষ্টসাধ্য। বিদেশে সাধারণ মানুষও খাদ্যে ভেজাল ও বিষাক্ততা নিয়ে সোচ্চার। অথচ যারা এখানে কিছুটা হলেও শিক্ষার আলো পেয়েছে তারাও ভেজাল দিতে কদাচিত্ পিছপা হন। তাই বোধহয় আমাদের পূর্বসূরিরা আমাদের ক্লাস ফাইভের অংক বইতে কীভাবে দুধে পানি মিশ্রণ করে দুধের পরিমাণ নির্ধারণের অংক কষতে দিতেন। যেহারে কৃষিজ জমি কমছে তা যেন আর না কমে সে জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। জমি বণ্টন ব্যবস্থায় আধুনিকায়ন আনা এবং জমির ব্যবহারকে সুনিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি তিন ফসলি জমিতে যাতে শিল্প স্থাপন করা না হয় সেদিকে লক্ষ রাখা দরকার। এদেশে উন্নয়নের ক্ষেত্রে মানুষকেন্দ্রিক তাদের প্রয়োজন-চাহিদা বিবেচনায় এনে মডেল তৈরি করে সেটি বাস্তবায়ন করতে হবে। অনেক সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা থাকে না। হয়ত কোনো প্রকল্প ভালো কাজ করল মেয়াদ শেষে এটি যাতে মানব মর্যাদা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে সেদিকে লক্ষ রাখা দরকার।

বর্তমান সরকারের আমলে অতি দারিদ্র্য এবং তুলনামূলক দারিদ্র্য উভয়েই হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু এটাকে ধরে রাখতে হলে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে, এবং তা তখনই কেবল সম্ভব হবে যখন প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থান সব সময়ে যুক্ত থাকবে। আমাদের দেশে পাহাড়ি অঞ্চলের দারিদ্র্যের হারটি পৃথক জরিপের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। অন্যদিকে রংপুর বিভাগে দারিদ্র্য বাড়ছে বলে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে সেটি কেন এবং কিভাবে হচ্ছে খুঁজে বের করে সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তা ও টেকসই কৃষি উন্নয়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়ে তোলার যে আহবান তা বাস্তবায়ন করতে হলে প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত যে সমস্ত সমস্যা রয়েছে তার জন্য আগে থেকেই প্রিভেনটিভ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বস্তুত যে সমস্ত জরিপ বিবিএস দেয় সেগুলো বিশ্বাসযোগ্য করার দায়িত্ব তাদের। যেমন শীতকালে অতিরিক্ত কর্মসংস্থান হয়। অথচ বিবিএস বলেছে যে, এ সময়ে অতিরিক্ত কর্মহীনতার কারণে জীবন যাত্রার মান নেমে যায়, দারিদ্র্য বাড়ে। আসলে যারা গবেষণা করছেন, তাদের কাছে বাংলাদেশে বর্ষাকালীন সময়ে জলাবদ্ধতার বিষয়টি মোটেই নজরে ছিল না। বর্ষাকালে কৃষি শিল্প প্রায় ৪০/৪২টি জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়— সাপ্লাই চেইনজনিত সমস্যা হয়— মানুষ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হয়। বিবিএস এর উচিত বিভ্রান্তিকর তথ্যউপাত্তগুলো সংশোধন করা। বাংলাদেশের উন্নয়নে বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ সরকার নিয়েছেন, এগুলোর মধ্যে বেছে বেছে কার্যকরগুলোই কেবল গ্রহণ করতে হবে।

n লেখক :ম্যাক্রো ও ফিন্যান্সিয়্যাল ইকোনোমিস্ট

ই-মেইল: [email protected] gmail.com। ইত্তেফাক