গণপরিবহন নারীর জন্য নিরাপদ নয়

ডেস্ক রিপোর্ট : ২০১৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জে শুভেচ্ছা পরিবহনের চলন্ত একটি বাসে তরুণী ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় বাসচালক ও সহযোগী গ্রেফতার হন। ২০১৫ সালের ১২ মে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে চলন্ত বাসে এক পোশাককর্মীকে ধর্ষণ করে ফেলে দেন বাসচালক ও চালকের সহকারী। ঢাকায় এক গারো তরুণীকে চলন্ত মাইক্রোবাসে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। গত বছরের ২৩ জানুয়ারি বরিশালে সেবা পরিবহনের একটি বাসে দুই বোনকে ধর্ষণ করে পাঁচ পরিবহনকর্মী। ওই বছরের ১ এপ্রিল টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী থেকে ঢাকাগামী বিনিময় পরিবহনের একটি বাসে ধর্ষণের শিকার হন এক পোশাককর্মী। পরে পুলিশ ওই বাসের তিন কর্মীকে গ্রেপ্তার করে। চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি ময়মনসিংহের নান্দাইলে একটি বাসে এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে বাসচালকসহ তিন পরিবহনকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সর্বশেষ টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয় রূপাকে। এসব ঘটনায় গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

সহজেই বোঝা যায় গণপরিবহন নারীদের জন্য নিরাপদ নয়। প্রয়োজনের খাতিরে গণপরিবহনের যাত্রী হয়ে প্রতিদিন অসংখ্য নারী সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। এ সব ঘটনার একভাগও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় কিনা এ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞজনেরা। তারা বলেন, নারীরা গণপরিবহনে চলাচল করতে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, বিভিন্ন ধরনের অঙ্গভঙ্গি, কটুক্তিসহ নানা সহিংসতার শিকার হন। যে কারণে শতকরা ৪৯ ভাগ নারী গণপরিবহনকে অনিরাপদ মনে করেন। এখানে প্রতিবাদের সংস্কৃতি অনুপস্থিত। নারীরা সহিংসতার শিকার হতে দেখলেও তাত্ক্ষণিক প্রতিবাদ কমই দেখা যায়। এছাড়া গণপরিবহনের নকশা ও চলাচলের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে জেন্ডার সংবেদনশীলতার বিষয়টি মাথায় রাখা হয় না। মূলত পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, ধর্মীয় মৌলবাদ ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে নারী আজ নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। এটা এখন জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রকেই এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে বলে জানান সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

সম্প্রতি উন্নয়ন সংস্থা একশনএইড-এর ‘কার শহর’ শীর্ষক নতুন এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানা যায়, দেশের শহরগুলোর গণপরিবহন ও নগর কাঠামো নারীবান্ধব নয়। যে কারণে শহরের শতকরা ৫৪ শতাংশ নারী সহিংসতায় শিকার হন। গবেষণা বলছে, নারীর প্রতি সহিংসতা নিরসনে বাংলাদেশে সমন্বিত আইন আছে। তবে গণপরিসরে নারীদের যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য কোন সুনির্দিষ্ট আইন নেই। আবার যে আইন আছে সেখানে যৌন হয়রানি বন্ধে সরাসরি কোন বিধান নেই। যে কারণে জনপরিসরে যৌন হয়রানি হলে আইনিভাবে প্রতিকার খুবই কম পান নারীরা। আবার ঘরের বাহিরে সংঘটিত যেকোন যৌন হয়রানিকে বিবেচনা করে কোন আইন প্রণীত হয়নি। কোন আইনে ‘যৌন হয়রানি’ শব্দটির পরিষ্কারভাবে সংজ্ঞায়ন নেই।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪৯ শতাংশ নারী গণপরিবহনে এবং ৪৮ শতাংশ গণসেবা গ্রহণে অনিরাপদ অনুভব করেন। গণপরিবহনে নারী যে হয়রানির শিকার হন, দুই একটি ব্যতিক্রম ছাড়া তার কোন প্রতিবাদ হয় না।
ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে— নগরে নারী তাদের প্রতিদিনের কাজ করতে গিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। শহরের ৫৪ দশমিক ৭ শতাংশ নারী কোন না কোনভাবে সহিংসতার শিকার হন। এর বিরুদ্ধে অভিযোগ করতেও নারী নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। বাংলাদেশের শহরের সহিংসতার শিকার নারীদের ৬৫ ভাগ সমাধান খুঁজতে গিয়ে দ্বিতীয়বার হয়রানির শিকার হন পুলিশের কাছে। তাই ৫৭ শতাংশ নারী মনে করেন, তাদের অভিযোগ গুরুত্ব সহকারে নেয়া হবে না। গবেষণা প্রতিবেদন বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নগর পরিকল্পনা জেন্ডার সংবেদনশীল নয়। শহরের যে কোন রাস্তা বা স্থাপনা নির্মাণের সময় নারীদের কথা বিবেচনা করা হয় না। বাংলাদেশের নগর পরিকল্পনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীর অংশগ্রহণ নগণ্য।

গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে র্যাব-এর আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মোহাম্মদ মুফতি মাহমুদ খান এ বিষয়ে বলেন, সহিংসতার মাত্রা একদম শূন্যের কোটায় নিয়ে আসা কঠিন। রাস্তা-ঘাটে নারীদের হয়রানি বা সহিংসতার বিষয়ে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া কঠিন। কারণ সহিংসতাকারীদের পাওয়া যায় না। অনেক সহিংসতার ঘটনা ঘটে কিন্তু সেটা নিয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা পর্যন্ত প্রমাণসহ আসতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহনাজ হুদা বলেন, দুঃখের বিষয় যৌন হয়রানি বন্ধে এখনো আমাদের সুনির্দিষ্ট আইন নেই। তাই সহায়তা চাইতে গেলে পুলিশের কাছে কম সহযোগিতা পান নারীরা। উল্টো নারীদের যেভাবে প্রশ্ন করে সেটাও কিন্তু এক ধরনের অপরাধ। রাস্তা-ঘাটে যে হয়রানি করা হয়, তা থামানোর জন্য আইন করতে হবে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. মালেকা বানু বলেন, সারা বিশ্বে নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয়টি সামগ্রিক উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ। নারী-পুরুষের মধ্যে ক্ষমতার অসম সম্পর্ক আমাদের সমাজে স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধর্ষণের যে ক্রমবর্ধমান হার তা আমাদের আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলেছে। প্রতিটি পরিবার থেকে নারীকে যথাযথ শিক্ষা দেয়ার, স্বাধীনভাবে গড়ে তোলার, ক্ষমতায়িত করার প্রচেষ্টা থাকে। কিন্তু তা সম্ভব হয় না। কারণ প্রতিটি পরিবারই নারীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটান। একটি জাতি যখন উদ্বেগের মধ্য দিয়ে যায় তা রাষ্ট্রের জন্যও ক্ষতিকর। এ বিষয়ে পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে অন্যদিকে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবীর বলেন, গেল ৪০-৪৫ বছরেও আমরা নারীর নিরাপত্তার জন্য শহরে যাত্রী ছাউনি করতে পারিনি। ঘরে, বাইরে, রাস্তায় যেভাবে নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তাতে আমরা উদ্বিগ্ন। এ শহরে নারীকে বাদ দিয়ে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। এখন আমরা এমন একটি অবস্থানে দাঁড়িয়ে, যেখানে সবার মধ্যে সচেতনতা বাড়াতেই হবে।