ওহির আসল পরিচয় কী?

ওয়ালি উল্লাহ সিরাজ : আভিধানিক অর্থ : ওহির অভিধানগত মূল অর্থ হলো গোপনে জানানো। আল হাররালি নিকট আভিধানিক অর্থে ওহি হলো গোপনীয়ভাতে অন্তরে অর্থ প্রক্ষেপণ। আযহারি বলেছেন, ইশারা ইঙ্গিতকেও ওহি বলে। অনুরূপভাবে লেখাকেও ওহি বলা হয়। রাগেব আল ইসফাহানি বলেন, ওহির মূল অর্থ হলো দ্রুত ইশারা করা। আর যেহেতু ওহি দ্রুততার অর্থবহ এ জন্যেই বলা হয়েছে যে ওহিজাত নির্দেশ। অর্থাৎ যে কথা ইশারা ইঙ্গিতের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। (সূত্র : আয-যুবাদি, তাজুল আরুস, ১০/৩৮৫, গ্রাগুক্ত ও আল ইসফাহানি, মুফরাদাত ফি গারিবিল কুরআন, পৃষ্ঠা নাম্বার ৫৩৬ )

এ জন্যেই ওহির সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, অর্থাৎ গোপনীয়তা ও দ্রুততাসহ কাউকে কিছু জানানো, যা কেবল উদ্দিষ্ট ব্যক্তিই জানতে পারে এবং অন্যদের থেকে গোপন থাকে। রাগেব আল ইসফাহানির কথা অনুযায়ী গোপনীয়তা ও দ্রুততার সঙ্গে কাউকে কিছু জানানো চারভাবে হতে পারে- ১. ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে কথা বলা। ২. শব্দের সম্মিলন ব্যতীত কেবল আওয়াজের মাধ্যমে কথা বলা। ৩ . অঙ্গ দ্বারা ইশারা করা। ৪. লেখা। আভিধানিক অর্থে ওহির প্রকার: ১. মানুষের প্রতি প্রাকৃতিক ইলহাম, অর্থাৎ কারো অন্তরে বিশেষ অনুভূতি প্রক্ষেপণ করা। যেমনটি ছিল মূসা আলাইহিস সালামের মায়ের ক্ষেত্রে। ইরশাদ হয়েছে, আর আমি মূসার মায়ের প্রতি ওহি (নির্দেশ) পাঠালাম। (সূরা আল কাসাস : ৭) ২. জীবজন্তুর স্বভাব-সংক্রান্ত ইলহাম, যেমন মৌমাছির প্রতি ইলহাম। ইরশাদ হয়েছে, আর তোমার রব মৌমাছিকে ইঙ্গিতে জানিয়েছেন যে, তুমি পাহাড়ে ও গাছে এবং তারা যে গৃহ নির্মাণ করে তাতে নিবাস বানাও (সূরা আন-নাহল : ৬৮) ৩. জড়পদার্থের প্রতি আল্লাহ তাআলার মহবৈশ্বয়িক নির্দেশ। ইরশাদ হয়েছে, যখন প্রচ- কম্পনে যমীন প্রকম্পিত হবে। আর যমীন তার বোঝা বের করে দেবে। আর মানুষ বলবে, এর কী হল? সেদিন যমীন তার বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে, যেহেতু তোমার রব তাকে নির্দেশ দিয়েছেন (সূরা আয-যিলযাল : ১-৫) ৪. কোনো অঙ্গ দ্বারা ইঙ্গিতসূচক দ্রুত ইশারা, যেমন যাকারিয়া আলিইহিস সালামের ইশারা। ইরশাদ হয়েছে, অতঃপর সে মিহরাব হতে বেরিয়ে তার লোকদের সামনে আসল এবং ইশারায় তাদের বলল যে, তোমরা সকাল ও সন্ধ্যায় তাসবীহ পাঠ করো। (সূরা মারয়াম : ১১) পারিভাষিক অর্থ : আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীদের নিকট শরীয়ত অথবা কিতবের যা পৌঁছাতে চান তা তাদের পরোক্ষ অথবা প্রত্যক্ষভাবে জানিয়ে দেয়া। পারিভাষিক অর্থে ওহির প্রকার: আল্লাহ পক্ষ থেকে ওহি লাভ বিভিন্নভাবে হতে পারে। সূরা আশ-শুরা থেকে এ ব্যাপারে ধারণা নেয়া যায়। ইরশাদ হয়েছে, আর আমরা আশা করি আমাদের রব আমাদের গোনাহ্ মাফ করে দেবেন, কেননা, সবার আগে আমরা ঈমান এনেছি [সূরা আশ-শুরা:৫১] এক. সত্যস্বপ্ন আকারে : স্বপ্ন হলো ওহির প্রথম ধাপ। নবুওতের শুরুতে শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওহিও ছিল এ প্রকৃতির সত্যস্বপ্ন। আয়শা (রা.) থেকে এক বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ওহি প্রেরণের শুরুটা ছিল ঘুমন্ত অবস্থায় সত্য স্বপ্ন আকারে। অতএব তিনি যখন কোনো স্বপ্ন দেখতেন তা (রাতের পর) সকাল আসার মতোই সত্য হত। (বুখারি ও মুসলিম)

শুধু নবুওতের শুরুতে নয়, বরং পরবর্তীতেও তিনি সত্য স্বপ্নাকারে ওহি পেয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, অবশ্যই আল্লাহ তাঁর রাসুলকে স্বপ্নটি যথাযথভাবে সত্যে পরিণত করে দিয়েছেন। তোমরা ইনশাআল্লাহ নিরাপদে তোমাদের মাথা মু-ন করে এবং চুল ছেঁটে নির্ভয়ে আল-মাসজিদুল হারামে অবশ্যই প্রবেশ করবে। (সূরা আল ফাতহ:২৭)

দুই. সরাসরি অন্তরে প্রক্ষেপন : অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা যার কাছে ওহি পাঠাতে চান তার অন্তরে এমনভাবে সরাসরি প্রক্ষেপণ করা, যার পর সামন্যতম সন্দেহও থাকে না যে তা আল্লাহর তাআলার পক্ষ থেকে আসেনি। এর প্রমাণ: হলো, ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয় রুহুল কুদস আমার অন্তরে ফুঁকে দিয়েছেন যে, কোনো আত্মা ততক্ষণ পর্যন্ত মরবে না যতক্ষণ না সে তার রিযক পূর্ণ করে নেয়। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় করো ও সুন্দরভাবে চাও। (ইবনে হিব্বান, হাকেম, ইবনে মাজাহ) তিন. পর্দার আড়াল থেকে সরাসরি কথা বলা : বেশ কয়েকজন নবী-রাসূলের (আ.) সঙ্গে আল্লাহ তাআলা এভাবে কথা বলেছেন বলে আল কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ থেকে জানা যায়। যেমন, মূসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে। ইরশাদ হয়েছে, আর আল্লাহ মূসার সঙ্গে সুস্পষ্টভাবে কথা বলেছেন। (সূরা নিসা:১৬৪)