মিয়ানমারে ফিরতে আগ্রহী নয় রোহিঙ্গারা

তরেক : মিয়ানমার-বাংলাদেশের মাঝে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও মিয়ানমারে ফেরত যেতে আগ্রহ নেই বেশিরভাগ রোহিঙ্গার। উখিয়া উপজেলার কুতুপালং ও বালুখালীতে আশ্রয় নেয়া অধিকাংশ রোহিঙ্গা জানিয়েছেন, তাদের ফিরিয়ে নেয়ার চুক্তির পর তারা জানা-অজানা আতঙ্কে ভুগছেন। অতীতে নির্মম অত্যাচারের অভিজ্ঞতার আলোকে তাদের অধিকাংশের দেশে ফেরার আগ্রহ নেই। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা তাদের নিরাপত্তা নিয়ে যেমন আতঙ্কিত, তেমনি তাদের ভিটেমাটি ফেরত পাবেন কিনা, তা নিয়েও আশঙ্কায় রয়েছেন। প্রত্যাবাসন স্বারক সম্পাদনের পর থেকেই মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিরাজ করছে ভয়। উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালীতে আশ্রয় নেয়া অধিকাংশ রোহিঙ্গা জানিয়েছেন, দুঃখ কষ্ট হলেও আশ্রয় নেয়ার পর থেকে তাদের কোনো কিছুর ঘাটতি নেই।

বরং দৈনন্দিন পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে ত্রাণসামগ্রী অন্যত্র বিক্রি করছেন তারা। এনজিওগুলো দিচ্ছে অফুরন্ত ত্রাণ। রোহিঙ্গারা বলছেন, এখানে ভালোই আছি। বেঁচে আছি সুন্দরভাবে। মিয়ানমারে গেলে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দেবে কে? অনেকেই বলেন, মিয়ানমার মিলিটারি যদি আবার নির্যাতন শুরু করে, আবার যদি আমাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয় তাহলে কি হবে? যদি মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড, পুলিশ আবার সন্ত্রাসী ও জঙ্গি দমনের নামে নারী নির্যাতন, ধ্বংসাত্মক তাণ্ডব চালায়, তাহলে আমরা কোথায় যাব? চুক্তির শর্তানুযায়ী, মিয়ানমার তাদের স্বল্প সময়ের জন্য অস্থায়ী আশ্রয় নিশ্চিত করবে। বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা মেনে শরণার্থীরা রাখাইন প্রদেশে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার অনুমতি পাবে। ২০১২ সালে রাখাইনে সহিংসতায় বাস্তুচ্যুত এক লাখের বেশি রোহিঙ্গা সেখানে শরণার্থী শিবিরে কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে বসবাস করে আসছে।

সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে ১৯৯২ সালে সম্পাদিত যৌথ চুক্তির আলোকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করা হবে। তিন সপ্তাহের মধ্যে একটি ‘জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ’ তৈরির কথা বলা হলেও দৃশ্যমান নয় অনেককিছু। এ ছাড়া দ্রুত সময়ের মধ্যে আরেকটি চুক্তি বা সমঝোতা স্বাক্ষরের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার মূল কার্যক্রম শুরু হবে বলা হলেও তাও অন্ধকারে। এ ছাড়া, মিয়ানমার ছেড়ে আসা শরণার্থীদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় রাখাইনে তাদের নিজ বাড়িতে অথবা আশপাশের ‘নিরাপদ এবং সুরক্ষিত’ স্থানে ফেরাতে উৎসাহ দেবে ইয়াঙ্গুন।

তবে রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ মনে করে, তাদের ফেরত নেয়া হলেও আগের সেই বসতভিটা, জমিজমা আর ফেরত দেবে না মিয়ানমার সরকার। তাদের মতে, মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে দীর্ঘদিন ধরে প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে শরণার্থী হিসেবে। তাদের নিজেদের যেমন বাড়িঘর নেই, নেই জাতিগত পরিচয়ও। এখনো ইয়াঙ্গুনে শরণার্থী করেই রাখা হয়েছে এই পাঁচ লাখ রোহিঙ্গাকে। নিজ দেশে শরণার্থী হয়ে থাকতে হবে কিনা, তা নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা নতুন-পুরাতন রোহিঙ্গারা বেশ আতঙ্কিত। সচেতন অনেক রোহিঙ্গাই জানালেন, রোহিঙ্গারা কখনোই স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে রাজি হবে না, যদি তাদের গ্রামে ফেরা এবং জমির মালিকানা ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা না করা হয়। কারণ, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের স্বাক্ষরিত ১৯৯২ সালের একই ধরনের একটি চুক্তি হয়েছিল। ওই চুক্তির পর প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা রাখাইনে ফিরলেও এখনো নাগরিকত্বসহ অন্যান্য সঙ্কটের সমাধান হয়নি।

জাতিসংঘ বলছে, গত আগস্টের শেষের দিকে রাখাইনে শুরু হওয়া সহিংসতায় এখন পর্যন্ত ৬ লাখ ২০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযান থেকে পালিয়ে আসা এ রোহিঙ্গারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় জনাকীর্ণ শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছেন। ওয়াশিংটন এবং জাতিসংঘ মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওই অভিযানকে জাতিগত নিধন হিসেবে চিহ্নিত করলেও সমপ্রতি জাতিসংঘের আচরণে হতাশা ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। মানবজমিন