সাহাবাদের চোখে কেমন ছিলেন শেষ নবী!

শাহ্ আলম বাচ্চু : “বালাগাল উলা বিকামালিহি, কাশা ফাদ্দুজা বিজামালিহি, হাসুনাত জামি’উ খিসালিহি সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহি।” অর্থ: ‘তিনি নিজ কৃতিত্ব ও পূর্ণতার গুণে পৌঁছেছেন মর্যাদার শীর্ষে, অন্ধকার বিদূরিত হয়েছে তাঁর সৌন্দর্যে। তাঁর চরিত্রাবলী সৌন্দর্যমন্ডিত হয়েছে।’ তাই আমি দৃঢ় কন্ঠে বলি তোমাকে যদি ফুল বলি ভুল হবে আমার। তোমাকে যদি চাঁদ বলি ভুল হবে আমার। তুমি চাঁদের চেয়েও সুন্দর ও অতুলনীয়।

মুক্তির পয়গাম বিনী সূতায় ছড়িয়ে দিলেন ইথারে ইথারে! সৃষ্টিকুল ব্যস্ত হয়ে পড়ে এই সত্যকে বরণ করে নেয়ার জন্য! ব্যস্ততো হবারই কথা। তিনি কি যেই সেই মানব ! তিনি যে আর কেউ নন। তিনি সৃষ্টির সেরা সাইয়েদুল মুরসালিন, হাবীবে ইলাহী, প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:)। ৬৩ বছরের মহান জীবনের সবটুকু সময় ব্যয় করেছেন তিনি সকল অনাচার আর পাপাচারের বিষবৃক্ষের মূল নির্মূলে। কায়িম করেছেন অসভ্য পৃথিবী থেকে সভ্যের পৃথিবী। যার শুভ আগমনে বদলে গেল জাহিলিয়াতের বর্বর যুগ, মানুষ পেল মুক্তির বার্তা। সেই প্রিয় নবীর শুকরিয়া ও সৌন্দর্য বর্ণনা করা কি আমাদের কর্তব্য নয় ?

সুন্দর সৃষ্টি কলার এই স্বপ্নিল লীলাভূমে যাঁর অনিন্দ্য সুন্দর দেহকান্তির কোনোই তুলনা মেলেনি; আকাশের বিমল উজ্বল দ্বাদশীর চাঁদের সাথে তুলনা করেও কিনারা মেলেনি যাঁর রুপ সৌকর্যের; লক্ষ্য তারার আলোকিত সৌন্দর্যের ফোয়ারাও নিষ্প্রভ হয়ে এসেছে যাঁর উপচে পড়া রুপ লাবন্যের পাদ-প্রান্তে, তিনি তো আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:)। শান্ত বিমোহিত চারিদিক। ঝির ঝির বাতাসের স্নিগ্ধ ছোঁয়ায় গাছের পাতাগুলো টপটপ খসে পড়ছে। হৃদয় জুড়ানো হিমেল হাওয়া বইছে ধীরে ধীরে। তাই মদীনা আজ ঘুমন্ত নগরী, স্বপ্নের নগরী। এমনি এক প্রেমময় স্বপ্নীল রজনীতে বিমোহিত রাসূলুল্লাহ (সা:) ও সহধর্মীনী হযরত আয়িশা (রা:) দম্পত্তি। তাঁরা আজ সীমাহীন পুলকিত আনন্দিত। জননী হযরত আয়িশা (রা:) বলেন, যদি জুলেখার সখিরা হযরত ইউসুফ (আ:) এর সৌন্দর্য দর্শনে তাঁকে ফেরেশতা আখ্যায়িত করেছিলো এবং এতে তাআজ্জুব হয়ে অন্য মনস্ততায় বিভোর রুপে ফল কাটতে গিয়ে নিজেদের হাত কেটে ফেলেছিলো বলে পবিত্র কুরআনে রয়েছে, সেখানে তারা যদি রাসুল্লাহ (সা:)কে দেখতো, তাহলে কী করতো তা ভাবাই যায় না। হয়ত তারা তাঁর সৌন্দর্যের চমকে তাদের কলিজাই কেটে ফেলতো।

হিজরতের সময় মহনবী (সা:) কিছুক্ষণ উম্মে মা’বাদের তাঁবুতে অবস্থান করেছিলেন। তাঁবু মদিনার দিকে রওয়ানা হওয়ার পর উম্মে মা’বাদ স্বামীর কাছে নবীজীর যে পরিচয় তুলে ধরেছিল, তা নি¤œরুপ : “চমকানো গায়ের রং, উজ্জ্বল চেহারা সুন্দর গঠন, সটান সোজা নয়, আবার ঝুঁকে জড়াও নয়। অসাধারণ সৌন্দর্যের পাশাপাশি চিত্তাকর্ষক দৈহিক গঠন, সুরমা রাঙ্গা চোখ, লম্বা পলক, ঋজু কণ্ঠস্বর, লম্বা ঘাড়, সুক্ষè ও পরষ্পর সম্পৃক্ত আব্রæ, চমকানো কালো চুল। চুপচাপ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন, কথা বলার সময় আকর্ষণীয়। দূর থেকে দেখে মনে হয় সবার চেয়ে উজ্বল ও সৌন্দর্য মন্ডিত। পিছন থেকে দেখলে মনে হয় তিনি সুন্দর ও সুমহান পুরুষ। কথায় মিষ্টতা ও প্রকাশ ভঙ্গি সুস্পষ্ট। কথা খুব সংক্ষিপ্ত নয়, আবার অতিদীর্ঘও নয়। কথা বলার সময় মনে হয় যেন মূখ থেকে দাঁতের ফাঁক দিয়ে মুক্তার দানা ঝরছে।

হযরত আলী (রা:) এর বর্ণনায় আছে, “তাঁর মাথা ছিল বড়, জোড়ার হাড় ছিল ভারী, বুকের মাঝখানে ছিল কালো চুলের হালকা রেখা। তিনি চলার সময় এমনভাবে চলতেন, দেখে মনে হত কে যেন উঁচু থেকে নিচুতে অবতরণ করছে। তিনি ছিলেন, সর্বাদিক সাহসী। সবচেয়ে বেশী দানশীল, সত্যবাদী, বিনয়ী, সর্বাধিক অঙ্গীকার পালনকারী, সর্বাধিক কোমল প্রাণ।” (তিরমিয) হযরত আনাস (রা:) বলেন, “নবীজীর হাতের তালু ছিল প্রশস্ত, গায়ের রং দুধে আলতা মিশ্রিত ছিল। ওফাতের সময় পর্যন্ত তাঁর মাথা ও চেহারার মাত্র বিশটি চুল সাদা হয়েছিল।” (বুখারী)

হযরত জাবির ইবনে সামুরা (রা:) বলেন “একদিন পূর্ণিমা রজনীতে মহানবীকে লাল রংয়ের চাদর পরিহিত অবস্থায় অবলোকন করলাম। আমি একবার রাসূলের দিকে আর একবার চাঁদের দিকে তাকাচ্ছিলাম। আমার পর্যবেক্ষণে রাসূলুল্লাহ (সা:)কে চাঁদের চেয়েও সুন্দর মনে হল।” তাইতো কবি বললেন, “ওরে, ও চাঁদ উদয় হলি কোন জোসনা দিতে? দেয় অনেক বেশি আলো আমার নবীর পেশনীতে।” (তিরমিয)
হযরত আয়িশা (রা:) মহানবী (সা:) কে সৌন্দর্যের আকর আখ্যা দিয়ে আবেগ ভরা ছন্দে আবৃত্তি করেন, “একটি সূর্য আমাদের আর একটি সূর্য ঐ নভোমন্ডলের, আমার সূর্য অতুলনীয় চাইতে সেই জাগতিক ভাস্করের। জগতের ঐ সূর্য সকালে উদিত হয়ে চারিদিকে ফর্সা করে, আমার সূর্য রাতকে রওশন করে উদয় হয় ইশার পরে।” (মিশকাত শরীফ)
সত্য দিনের সূর্য নিভে যখন রাতের আঁধার নেমে আসতো, তখন হযরত আয়িশা (রা:) ঘরে আরেক নতুন সূর্যের উদয় দেখতে পেতো। একদা রাতের বেলা আয়িশা (রা:) জলন্ত প্রমান পান। তিনি বলেন “একদিন রাতের বেলা আমি কাপড় সেলাই করছিলাম। হঠাৎ আমার হাত থেকে সুঁই পড়ে গেল। আমি সুঁইটি তন্ন তন্ন করে খুজলাম, কিন্তু কোথাও পেলাম না। এমনি সময় রাসুল (সা:) এসে হাজির হলেন। ফলে তাঁর পবিত্র চেহারার নূরানীর আভায় সুঁইটি স্পষ্ট দেখতে পেলাম।” প্রিয় নবীর বদন থেকে খোশবু ছড়াতো। শরীর থেকে গড়িয়ে পড়া শ্বেত বিন্দু সুরভি বিলাতো মেশকের মত। একবার নবীজী (সা:) উম্মে সুলাইমের গৃহে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। নবীজী (সা:) পবিত্র দেহ ঘর্মাক্ত হলে উম্মে সুলাইম একটি শিশির মধ্যে সেই পবিত্র শ্বেত বিন্দু জমা করতে লাগলেন। ইতিমধ্যে নবীজী জাগ্রত হয়ে ইরশাদ করলেন-“উম্মে সুলাইম একি করছো তুমি,” জবাব এলো ইয়া রাসূলুল্লাহ্ এ হচ্ছে আপনার পবিত্র বদনের ঘাম মুবারক। আমরা এটি আমাদের খোশবুর সাথে মিলিয়ে নেব। কেননা এটি উত্তম সুগন্ধি। (মুসলিম) হযরত জাবির বলেন-“যে পথ দিয়ে নবী যেত বুঝা যেত এ পথ দিয়ে নবীজী গেছে। কারণ সারা পথ খোশবুতে মাতোয়ারা ছিল।” (মিশকাত) এই ছিলো সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল নবীয়ে রহমত, দুজাহানের সর্দার হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর সৌন্দর্য ও মাধুর্য। নীলাভ আকাশের পূর্ণিমার চাঁদও যার সৌন্দর্যের কাছে হার মানতে বাধ্য।