রাতের কৃত্রিম আলো উদ্ভিদের মৌসুমে বিরূপ প্রভাব ফেলছে

ফারমিনা তাসলিম: রাতের পৃথিবীর ছবির ওপর এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রত্যেক বছরে রাতের আলো তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। ২০১২ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত রাতের বেলা তোলা পৃথিবীর ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রাতের বেলা কৃত্রিম আলো প্রত্যেক বছরই দুই শতাংশের বেশি করে বেড়েছে। যার প্রভাব পড়ছে গাছ-পালা, পশু-পাখি অর্থাৎ পরিবেশ, এমনকি মানুষজনের ওপরে। তারা এটিকে আলোর দূষণ বলেও উল্লেখ করছেন।

গবেষণায় রাতের পৃথিবীর যেসব ছবির তথ্য, উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে নাসার একটি স্যাটেলাইট থেকে। তবে আলোর তীব্রতা বা উজ্জ্বলতা সব দেশে সমান নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও স্পেনে আলোর তীব্রতা ততটা বাড়েনি। তবে বেশি তীব্র হয়েছে দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা এবং এশিয়াতে। আবার কোনও কোনও দেশে এ উজ্জ্বলতা আগের তুলনায় কমেছে। যেমন ইয়ামেন, সিরিয়া- এ দুটি দেশে যুদ্ধে প্রায় লন্ডভন্ড হয়ে গেছে।

এসব নিয়ে বিবিসি বাংলার সাথে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন।

রাতের অন্ধকার কমে গিয়ে কৃত্রিম আলোর তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় গাছ-পালার ওপর কী রকমের প্রভাব পড়ছে?

ড. মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, উদ্ভিদের ফুল ধারণের ওপরে, আলো এবং অন্ধকারের দৈর্ঘ্যর বিশাল একটা প্রভাব আছে। এ প্রভাবের ওপর ভেদ করে উদ্ভিদ জগতকে দুইভাগে ভাগ করা হয়। একটা হচ্ছে শর্ট দ্যা প্ল্যান্ট, আরেকটা হচ্ছে লং দ্যা প্ল্যান্ট। শর্ট দ্যা প্ল্যান্টটা হচ্ছে উদ্ভিদের জন্য অন্ধকারের দৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশি লাগে ফুল ধারণের জন্য। লং দ্যা প্ল্যান্টটা হচ্ছে উদ্ভিদের ক্ষেত্রে ফুল ধারণের জন্য অন্ধকারের দৈর্ঘ্য তুলনামূলকভাবে কম লাগে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যেসকল প্ল্যান্টকে শর্ট দ্যা বলা হচ্ছে তাদের অন্ধকারের দৈর্ঘ্য কোন কারণে পূরণ না হলে হলে তারা ফুল ধারণের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে।

যেসব নিশাচর পোকা-মাকড়ের মাধ্যমে পরাগায়ণ ঘটে সেখানেও কি প্রভাব পড়তে পারে?

জবাবে মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, যেসকল প্রাণী এবং পোকামাকড়রা সচরাচর অন্ধকারে বিচরণ করে, তাদের বৈজ্ঞানিক ভাষায় নক্টার্ন্যাল বা নিশাচর বলা হয়ে থাকে। তারা যদি সারাক্ষণ আলো পায় তাহলে তাদের প্রজনন, বিচরণ, জীবনচক্র, খাদ্যগ্রহণ ছাড়াও তারা বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে পরাগায়ণও বাধাগ্রস্ত হয়।

যেভাবে ফুল ফুটছে, আগে যেভাবে ফুটতো, এখন যেভাবে ফোটে তা আলোর কারণে যেসব পরিবর্তন হচ্ছে সে সম্পর্কে তিনি বলেন, লক্ষ্য করে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের যেসকল গাছপালা আছে তাদের ফুল ফোটার সময় কিন্তু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। যেসকল গাছে সাধারণত গ্রীষ্মকালে বা বসন্তকালে ফুল ফোটার কথা কিন্তু দেখা যাচ্ছে শীতকালে ফুল ফুটছে। আবার যেগুলো শীতকালে ফোটার কথা সেগুলো বর্ষাকালে ফুটছে। যেমন – কদম ফুল বর্ষাকালে ফোটার কথা থাকলেও বছরের বিভিন্ন সময় সে ফুল ফুটছে।  আবার দেখা যাচ্ছে মাধবীলতা সাধারণত বসন্তকালের শেষের দিকে ফোটে। কিন্তু এবার এটা শীতকাল নভেম্বরে ফুটে গেছে।

এ পরিবর্তনের কারণ কি রাতের অন্ধকার কমে গিয়ে তীব্র কৃত্রিম আলো দায়ী নাকি আবহাওয়ার পরিবর্তনও দায়ী?

এ প্রসঙ্গে ড. মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, এখানে প্রাকৃতিক অনেকগুলো বিষয় কাজ করে, এর মধ্যে আলো একটা বিষয়। সেটাতে মনে হচ্ছে নড়বড় হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।

জসিম উদ্দিন বলেন, গতবছর এ সংক্রান্ত একটা রিপোর্ট করেছি। ২০১৬ সালে পলাশ ফুল ফুটেছে অনেক আগে প্রায় শীতের মধ্যে, শিমুল ফুল ফুটেছে শীতে। যেটা সাধারণত আমরা ফ্রেব্রুয়ারিতে লক্ষ্য করে থাকি।

রাত বললে যেটা আমরা বুঝি সেটা হচ্ছে অন্ধকার। এখন আমরা যারা কৃত্রিম আলো দেখছি রাতের বেলা সেটা জ্বলজ্বল করছে, প্রচন্ড তীব্র আলো যা অস্বাভাবিক, পশু-পাখির ওপরে এটার কি প্রভাব আছে?

জবাবে মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, কিছু কিছু প্রাণী আছে নিশাচর। যেমন বাদুর, খাটাস, সজারু, তাছাড়া কিছু শিয়াল আছে তারা প্রাকৃতিক নিশাচর। তারা অন্ধকারে বিচরণ করেই তারা খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করে। এখন কোন এলাকা যদি সারাক্ষণ আলোকিত হয়ে যায় সেখানে তাদের খাদ্য সংগ্রহ অর্থাৎ সবকিছুতে বড় ধরণের প্রভাব পড়বে। ফলে এক সময় দেখা যাবে তারা আর খাদ্য পাবে না, বিচরণ করতে পারবে না। ফলে তারা ধীরে ধীরে প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। একসময় এসে এসব প্রাণিগুলো অনেক মূল্যবান হয়ে যাবে। একসময় এসে পৃথিবী থেকে এ প্রাণিগুলো বিলীন হয়ে যাবে।

সূত্র – বিবিসি বাংলা