কারিগরি সামর্থ্যভাব ও সচল হৃদপিণ্ডের দুষ্প্রাপ্যতায় দেশের চিকিৎসা পিছিয়ে: এম মহিবুল্লাহ

ফারমিনা তাসলিম: দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে প্রথমবারের মতো মানবদেহে হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন সফলভাবে সম্পূর্ণ হয় ১৯৬৭ সালে। হার্টসার্জন ক্রিশ্চিয়ান বার্নারের নেতৃত্বে চার জন চিকিৎসকের একটি দল সম্পূর্ণ করেন সে অস্ত্রোপাচার।

বাংলাদেশে হৃদরোগের চিকিৎসা বিষয়ে বিবিসি বাংলার সাথে কথা হয় কার্ডিয়াক সোসাইটির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. এ. কে. এম মহিবুল্লাহর।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে হৃদরোগের প্রকোপ দিন দিন বেড়েই চলছে। এক সময় বাংলাদেশে নিউমেটিক হৃদরোগের প্রকোপ বেশি ছিল। কিন্তু আমাদের সামাজিক উন্নয়ন এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে হৃদরোগ অনেকাংশে কমে গেছে। এখন বাংলাদেশে  ফরেইনারি হৃদরোগ এবং উচ্চ রক্তচাপ সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশের পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী উচ্চ রক্তচাপে প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এবং ফরেইনারি হৃদরোগে প্রায় ৪ থেকে ৬ শতাংশ লোক ভুগছে। এছাড়াও জন্মগত হৃদরোগ আছে। আমাদের দেশে হার্ট ফেইলর ছাড়াও অন্যান্য হৃদরোগও দেখা যায়।

সফলভাবে হৃদপিন্ড প্রতিস্থাপনের ৫০ বছর পূর্তির পরেও বাংলাদেশে চিকিৎসা সেভাবে গড়ে ওঠেনি কেন?

এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. মুহিবুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশে গড়ে উঠতে না পারার দুইটা কারণ আমরা শনাক্ত করতে পেরেছি। প্রথমটা হলো বাংলাদেশে সচল হৃদপিণ্ড পাওয়ার অবস্থা নাজুক। কারণ হৃদপিণ্ড সচল অবস্থায় লাগাতে হবে। একজনের দেহ থেকে এনে অন্য আরেকজনের দেহে হৃদপিণ্ড সচল অবস্থায় লাগাতে হবে। এ সচল অবস্থায় হৃদপিণ্ড পাওয়া আমাদের জন্য দুষ্কর। দ্বিতীয়ত, এ হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপনের জন্য উন্নতর কারিগরী সামর্থ্য প্রয়োজন। সে সামর্থ্য এখনো বাংলাদেশে অর্জন করতে পারেনি।

এ চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের মতো একটা দেশের জন্য কতখানি কঠিন?

জবাবে ডা. মুহিবুল্লাহ বলেন, চ্যালেঞ্জ আমাদের জন্য যথেষ্টভাবে কঠিন। কিন্তু আমরা চেষ্টা করছি প্রাথমিকভাবে আমাদের দেশে অন্যান্য সব ক্ষেত্রে যখন উন্নতি করবে তখন অত্যাধুনিক এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের চিকিৎসা করা সম্ভব হবে। সারা বিশ্বে প্রতিবছরে ৩৫০০ হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন হয়। তার মধ্যে একমাত্র ২৫০০ হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন করছে যুক্তরাষ্ট্র। আর সারাবিশ্বে বাকি ১ হাজার হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপিত হয় সারা বছরে । বাংলাদেশের কাছাকাছি ভারত ও শ্রীলঙ্কায়ও শুরু হয়েছে হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন। আর বাংলাদেশে হৃদপিণ্ড স্থাপনের সামর্থ্য এখনো হয়নি।

হৃদপিন্ডের প্রতিস্থাপন ছাড়াও হৃদরোগের যে উন্নততরও চিকিৎসা দেখা যায় আর্থিকভাবে যারা সচ্ছল তারা চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরেও চলে যান। যাদের সামর্থ্যও নেই তাদের জন্য এদেশে সে ধরণের সেবা পাওয়া কতখানি সম্ভব?

এ প্রশ্নের জবাবে ডা. মুহিবুল্লাহ বলেন, হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপন ছাড়া বাংলাদেশে হৃদরোগের সমস্ত রকমের চিকিৎসা বর্তমানে বিদ্যমান। স্বাভাবিকভাবে হৃদপিণ্ড চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা একটু ব্যয়বহুল। অনেকেই বিদেশে যায় কিন্তু বাংলাদেশেও এখন বহুলোক চিকিৎসা নিচ্ছে। গতবছর একমাত্র বাংলাদেশে আমরা এগারো হাজারেরও বেশি হৃদপিণ্ডের অপারেশন করেছি। ইন্টারভেশনাল কার্যক্রম ও বিভিন্ন পদ্ধতি এবং পরীক্ষা-নিরিক্ষা আমরা করতে পেরেছি ৬৬ হাজারের মতো। হৃদপিণ্ডের চিকিৎসা ব্যয়বহুল এটা ঠিক। সবার পক্ষে চিকিৎসা করানো সম্ভব না এবং একবার হৃদরোগে আক্রান্ত হলে সারাজীবন ধরে তাকে ওষুধ খেতে হয়। সে ওষুধও ব্যয়বহুল। অর্থাৎ সকলের পক্ষে সম্পূর্ণভাবে হৃদরোগের চিকিৎসা করা সম্ভব হয় না।

এটি হয়তো শহরাঞ্চলে সহজে সম্ভব হয় কিংবা রাজধানীর মতো জায়গায় বাংলাদেশের প্রান্তিক অঞ্চলে হৃদরোগীদের যে পরিস্থিতি সেখানে সেবা পাওয়ার বিষয়টি সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে কতখানি সম্ভব?

ডা. মুহিবুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশের বেশিরভাগ হৃদরোগের চিকিৎসা ঢাকা কেন্দ্রীক। ইদানিং চট্টগ্রামে কিছু কিছু হৃদরোগের চিকিৎসা শুরু হয়েছে। কিন্তু আমরা আমাদের প্রান্তিক পর্যায়ে যেসব হাসপাতালগুলো রয়েছে বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে, সেখানে আমরা একজন করে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়েছি। এখানে যদি হৃদরোগটা প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করতে পারে এবং প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারে। তারপর আমরা সে রোগীগুলো আমাদের সরকারি হাসপাতালে নিয়ে আসতে পারি। আমাদের দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে হৃদরোগের চিকিৎসা খুব একটা ব্যয়বহুল না। আমাদের দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে হৃদরোগের চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল।

সূত্র- বিবিসি বাংলা