চুক্তির বাস্তবায়নে অসততা

গোলাম মোর্তোজা : ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’- এই চুক্তির কোথাও লেখা নেই ‘শান্তি চুক্তি’। কিন্তু পরিচিতি পেয়েছে ‘শান্তি চুক্তি’ নামে। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির যে সশস্ত্র সংগঠন ছিল, তার নাম কখনো ‘শান্তিবাহিনী’ ছিল না। কিন্তু পরিচিতি পেয়েছিল ‘শান্তিবাহিনী’ নামে। সাধারণ পাহাড়িদের উপর যে নিপীড়ন-নির্যাতন, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র সংগঠন। ফলে পাহাড়িরা তাদের নাম দিয়েছিলেন ‘শান্তিবাহিনী’। লোকমুখে যা ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বত্র।

২৫ বছরের অধিক সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে শান্তিবাহিনীর যুদ্ধ চলেছিল। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে জনসংহতি সমিতির চুক্তির মাধ্যমে সেই সশস্ত্র যুদ্ধের অবসান ঘটেছিল। ফলে, যা পরিচিতি পেয়েছে ‘শান্তি চুক্তি’ নামে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসীম সাহসিকতা এবং বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে এই চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। চুক্তিতে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশের প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্য স্বীকার করে, বাংলাদেশের সংবিধান মেনে চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, পাহাড়িদের অবিসংবাদিত নেতা জোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন।

এখন প্রতি বছর চুক্তির বর্ষপূর্তিকে সামনে রেখে সরকার এবং জনসংহতি সমিতি বক্তব্য দেয়। সরকার বলে, চুক্তির প্রায় পুরোটা বাস্তবায়ন হয়ে গেছে। যা হয়নি সেটাও হবে। জনসংহতি সমিতি বলে, চুক্তির মৌলিক বিষয়ের কোনোটাই বাস্তবায়ন হয়নি।
চুক্তির বাস্তবায়ন প্রসঙ্গ নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা।

০১.
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সব ধারা যদি বাস্তবায়ন করা হয়, ‘ভূমি সমস্যা’র সমাধান যদি করা না হয়, তাহলে অন্য সবকিছু অর্থহীন হয়ে পড়বে। ভূমি সমস্যাই পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধানতম সমস্যা। ফলে চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে কথা বলার আগে সংবেদনশীলতার সঙ্গে পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে। ১৯৯৭ সালে যে পাহাড়ি শিশুটির জন্ম হয়েছিল, সে আজ ২০ বছরের যুবক। ১৯৭৩ সালের পর যে স্কুল-কলেজের পাহাড়ি শিক্ষার্থীরা জঙ্গলে চলে গিয়েছিলেন, হাতে তুলে নিয়েছিলেন অস্ত্র।
১৯৯৭ সালে অস্ত্র জমা দিয়ে ফিরে আসা এই শান্তিবাহিনীর গেরিলা যাদের বয়স ছিল ৩৫ বা ৪০ বছর, এখন তাদের বয়স ৫৫ বা ৬৫ বছর। কারও কারও আরও বেশি। শান্তিবাহিনীতে যাওয়ার আগে এদের সবার ঘর-বাড়ি, আবাদি জমি ছিল। এখন তাদের অধিকাংশেরই কিছু নেই। ২০ বছরের সন্তানেরা দেখছে, তাদের জায়গা-জমি, বাড়ি সব দখল হয়ে গেছে। চুক্তি অনুযায়ী তাদের ঘর-বাড়ি, জমি ফিরিয়ে দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু ফিরিয়ে দেয়া হয়নি।

০২.
পার্বত্য চট্টগ্রাম বহুকাল আগে থেকে বিশেষশাসিত অঞ্চল। তাদের জীবনযাপন, ভূমি ব্যবস্থাপনার একটা বিশেষ রীতি আছে। সহজভাবে বললে, পাহাড়িদের বাড়ি-জমির সেই অর্থে কোনো কাগজপত্র ছিল না। যে যেখানে থাকতেন, যে যে জমি আবাদ করতেন- সেই জমি তার হিসেবে পরিচিত ছিল। অমুক পাহাড় অমুকের- এভাবেই ছিল মালিকানা। ১৯৭৪ সালে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলনরত এমএন লারমাকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ‘পাঁচ লাখ, দশ লাখ বাঙালি ঢুকিয়ে দেব…।’

বঙ্গবন্ধুর এই কথার বাস্তবায়ন শুরু করেছিল সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান। এরশাদ, খালেদা জিয়ার সময় তা অব্যাহত ছিল। ১৯৯৬ সালের শেখ হাসিনা সরকারের সময় তা কমলেও, পরবর্তীতে এবং বর্তমানেও তা নিরবে চলছে, আগের মতো অত ব্যাপক না হলেও।

সমতল থেকে নিয়ে যাওয়া বাঙালিদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পাহাড়িদের জায়গা-জমি, বাড়ি দখল করিয়ে দেয়া হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যার সমাধান করতে হলে, বাঙালিদের দিয়ে দখল করানো পাহাড়িদের জমি পাহাড়িদের ফেরত দিতে হবে। গত ২০ বছরে এই কাজটির কিছুই হয়নি।

কয়েকবার ভূমি কমিশন গঠন করা হয়েছে। এখনকার আইনটি প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু বাস্তবায়নের উদ্যোগ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। ভূমি কমিশনের দায়িত্ব যাদের দেওয়া হয়েছিল, তারা পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি না বুঝে, বাংলাদেশের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী অগ্রসর হতে চেয়ে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই ধারাটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অগ্রগতি শূন্য বললে কম বলা হয়, বলতে হবে মাইনাস অবস্থানে আছে।

০৩.
ভূমি সমস্যার সমাধান না করে চুক্তির পরে সরকারের নানা সংস্থা হাজার হাজার একর জায়গা নিয়ে নানা ‘উন্নয়ন’ কর্মকাণ্ড করেছে। যেসব জায়গায় ‘উন্নয়ন’ নামক অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে, তার মধ্যে অনেকগুলো ছিল পাহাড়িদের গ্রাম এবং তাদের বাগান বা জুম চাষ বা হলুদ-আনারসের আবাদি জমি-পাহাড়। পাহাড়ের ‘উন্নয়ন’র কথা বলা হলেও, বাস্তবে তা পাহাড়িদের জন্যে অভিশাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
চুক্তির মৌলিক বা গুরুত্বপূর্ণ আরও যেসব কাজের প্রায় কিছুই করা হয়নি-

ক. চুক্তি অনুযায়ী গঠিত হয়েছে ‘আঞ্চলিক পরিষদ’। গত ২০ বছরেও আইন-বিধি প্রণয়ন করে আঞ্চলিক পরিষদের ক্ষমতায়ন করা হয়নি। যে সমস্ত কাজ আঞ্চলিক পরিষদের মাধ্যমে বা সমন্বয় করে করার কথা, পাশ কাটিয়ে প্রশাসন তা সরাসরি করে। আইন-বিধি পরিবর্তন-সংশোধন, পরিমার্জন করে আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়নি। সমস্যা জিইয়ে রাখা হয়েছে।
খ. জেলা পরিষদগুলোতে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়নি। চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে ভোটার করা হয়নি। জেলা পরিষদের আইনগত কর্তৃত্ব চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়নি।
গ. প্রায় ২ হাজারের মতো শান্তিবাহিনীর গেরিলা যারা অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন, চুক্তি অনুযায়ী তাদের পুনর্বাসনের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
ঘ. ভারত থেকে ফিরে আসা পাহাড়ি শরণার্থীদের বড় অংশটা এখন পুনর্বাসনের বাইরে রয়ে গেছে। তারা মানবেতর জীবনযাপন করছে। ভূমি সমস্যার সমাধান অর্থাৎ দখল হয়ে যাওয়া জমি-বাড়ি তাদের ফিরিয়ে দেয়া হয়নি।
ঙ. চুক্তির এসব মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ না নিয়ে, অসত্য তথ্য সামনে আনা হচ্ছে। বলা হচ্ছে চুক্তির ৭২ টি বিষয়ের মধ্যে ৪৮ টি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বাস্তবে বাস্তবায়ন হয়েছে ২৫ টি, আর কয়েকটি আংশিক। প্রচারণা চালিয়ে অসত্য তথ্য হাজির করে, আর যাই হোক পাহাড়িদের বা পার্বত্য চট্রগ্রাম সমস্যার সমাধান হবে না। পার্বত্য চট্রগ্রাম সমস্যা সামরিক উপায়ে সমাধান করা যায়নি, রাজনৈতিক উদ্যোগে সমাধানের সূচনা হয়েছিল- আওয়ামী লীগ সরকার নিজেই তা ভুলে গেছে।

০৪.
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আলোচনাকে শেষ পর্যন্ত একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়, ‘কেন বাংলাদেশের বাঙালিরা সেখানে থাকতে পারবেন না। কেন জমি কেনা যাবে না’। সমতল থেকে নিয়ে যাওয়া ‘সেটেলার বাঙালিরা কোথায় যাবে, তাদের পুনর্বাসনের এত জায়গা তো নেই’… ইত্যাদি।

প্রশ্নগুলোর উত্তরের জন্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের হৃদয়টা সংবেদনশীল হতে হবে। দেশ-বিদেশের দিকে দৃষ্টি দিয়ে ‘বিশেষ শাসিত’ অঞ্চল বলে যে একটি বিষয় আছে, তা নির্মোহভাবে উপলব্ধি করতে হবে।

ধরুন আপনার বাড়ি বরিশাল। মোট লোকসংখ্যা ধরে নেই ১০ লাখ। এখন পাশের জেলা থেকে আরও ১০ লাখ লোক এনে নদী-খাল, সরকারের খাস জমি, আপনার বাড়ির আঙিনা-পতিত জমি, কারও কারও আবাদি জমি তাদের দিয়ে দখল করিয়ে দেয়া হলো। তখন আপনি কী করবেন, কী বলবেন? কোনো কথা না বলে চুপচাপ বসে থাকবেন? বলবেন, হ্যাঁ এরা বাংলাদেশের নাগরিক, এদের অধিকার আছে এখানে এভাবে থাকার? নিশ্চিত করে বলা যায়, তা আপনি করবেন না। প্রতিবাদ করবেন, প্রতিরোধ করবেন। একই বিবেচনায় পাহাড়িদের কথা ভাবেন।

ভারতের ত্রিপুরা, দার্জিলিং… আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ইচ্ছে করলেই কোনো ভারতীয় জায়গা-জমি কিনতে পারে না। কারণ এগুলোও পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো বিশেষ শাসিত অঞ্চল। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপের অনেক দেশে এমন অঞ্চল আছে। যেমন ইতালির জার্মান-অস্ট্রিয়া সীমান্ত অঞ্চল বোলজানো। বোলজানোবাসী ইতালিয়ান শাসকদের নির্যাতনের স্বীকার হয়ে জার্মানির সঙ্গে চলে যেতে চেয়েছিল। বোলজানো এখন বিশেষ শাসিত অঞ্চল। ইতালির সবচেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্ত চকচকে-ঝকঝকে অঞ্চল। এমন উদাহরণ পৃথিবীতে আরও বহু আছে।
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিশেষ শাসিত অঞ্চল। সেই বিশেষ শাসনও বাংলাদেশের সংবিধান মেনে নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারই পরিচালনা করবেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম। বিশেষ যে কোনো পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী, সামরিক বাহিনীর সেখানে ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকবেই। অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পগুলোর জায়গায় পুলিশ ক্যাম্প থাকবে। বিজিবি থাকবে, থাকবে আনসার। ক্যান্টনমেন্টগুলো থাকবে পার্বত্য চট্টগ্রামেই। সুতরাং এই অঞ্চল বাংলাদেশে থাকল না, এই আতঙ্কে আতঙ্কিত হওয়া- অন্যদের আতঙ্কিত করা, বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। যার বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই। মনে রাখতে হবে চুক্তির আগে পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের সঙ্গে না থাকার একটা প্রেক্ষাপট ছিল। চুক্তির মাধ্যমে যা সম্পূর্ণরূপে দূর হয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়ন না হলে, আবার জটিলতা দেখা দেয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

০৫.
‘সমতল থেকে নিয়ে যাওয়া চার পাঁচ লাখ বাঙালির অন্যত্র পুনর্বাসন সম্ভব নয়’- কথাটা সঠিক নয়। ইচ্ছেটা আন্তরিক হলে তা অবশ্যই সম্ভব। পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িরা ভালো নেই, ভালো নেই সেটেলার বাঙালিরাও। তাদেরও অধিকাংশ রেশন নির্ভর অনিশ্চিত জীবনযাপন করেন। বারো চৌদ্দ লাখ রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ যদি পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে পারে চার পাঁচ লাখ নিজ দেশের মানুষের একটু ভালো ব্যবস্থাপনায় পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে পারে না, তা বিশ্বাসযোগ্য কথা নয়। আন্তরিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধান চাইলে, তা অবশ্যই সম্ভব।

০৬.
চুক্তি বাস্তবায়ন করা দরকার বাংলাদেশের স্বার্থে, শুধু পাহাড়িদের স্বার্থে নয়। বিষয়টি বাঙালি শাসকদের উপলব্ধিতে আসা দরকার। উপলব্ধিতে না আসলে যতটা মূল্য পাহাড়িদের দিতে হবে, তার চেয়ে অনেক বেশি দিতে হবে জাতি রাষ্ট্র বাংলাদেশকে।
গোলাম মোর্তোজা : সম্পাদক, সাপ্তাহিক।
[email protected]। পরিবর্তন