মিডিয়ায় প্রথমে তুচ্ছ করা হলেও পরে খ্যাতির অভাব হয় না

মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মজুমদার: মিডিয়ায় ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে প্রথমদিকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্লের শিকার হলেও এক সময় তা খ্যাতির সমাহারে পরিনিত হয়। বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে এমনই বলেছেন বাংলাদেশ বেতারের প্রবীণ উপস্থাপক কাজী হোসনে আরা।

তিনি রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা অনুষ্ঠান উপস্থাপক হিসেবে কাজ শুরু করেন ১৯৬৬ সালের শেষ দিকে।

বেতারে কাজ করার কোন ইচ্ছা বা পূর্ব পরিকল্পনা তার ছিল না। কিন্তু তার এক বান্ধবী বেতারে অনুষ্ঠান ঘোষণার জন্য পরীক্ষা দেবার সময় কাজী হোসনে আরার নামও দিয়েছিলেন। এভাবেই তার অডিশন দেয়া হলো, পাসও করলেন।

হোসনে আরা ছিলেন রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে। বেতারের অডিশনে পাস করার চিঠি যখন বাড়িতে এলো, তখন তার বাবা বললেন, স্কুল-কলেজে মেয়েরা কাজ করলে অসুবিধে নেই, কিন্তু এ বাড়িতে থেকে রেডিওতে কাজ করা যাবে না।

হোসনে আরা ততদিনে বিবাহিতা। তাই স্বামীর বাড়িতে উঠে যাওয়ার পর তার রেডিওতে কাজ করতে আর কোন বাধা রইলো না।
তিনি বলেন , অনুষ্ঠানের সূচি তৈরি করা হতো একটা ‘কিউ শীটে – এতে লেখা থাকতো কোন অনুষ্ঠান সরাসরি প্রচার হবে, কোনটা টেপ থেকে বাজবে ইত্যাদি।”
স্টুডিওতে কাচের পর্দার মধ্যে দিয়ে উপস্থাপক, ইঞ্জিনিয়ার বা অনুষ্ঠানের শিল্পীরা একে অপরকে দেখতে পেতেন।

ইঞ্জিনিয়ার ‘অন এয়ার’ বাতি জ্বালিয়ে দিলে উপস্থাপক ঘোষণাটি পড়তেন, তার পরই সরাসরি শিল্পী গাইতে শুরু করতেন, বা টেপ বাজতে শুরু করতো।
তবে তখনকার দিনে মানুষ অনেক বেশি ঐকান্তিক এবং নিবেদিতপ্রাণ ছিল। এখন মানুষ অনেক কিছু করে, অনেক কিছুর দিকে মন দেয়, এবং সবাই খুব অস্থির।
বাংলাদেশর স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালের দিকে টেলিফোনে সময় বলার জন্য একটি সেবা চালু হয়েছিল – যাতে গ্রাহকরা ১৪ ডায়াল করলে তখন সময় কত তা জানতে পারতেন।

এর জন্য একটা ‘বেস্ট ভয়েস’ পরীক্ষা হয়েছিল – তাতে প্রথম হয়েছিলেন কাজী হোসনে আরা। তার কণ্ঠেই ফোনের সেই সময় ঘোষণা বাজতো।
তিনি বলেন , তখনকার দিনে রেডিও বিশেষ বিশেষ অনেক অনুষ্ঠান উপস্থাপনার জন্য কাজী হোসনে আরা ডাক পেতেন। ‘ভালো কন্ঠ’ তার – এই স্বীকৃতিটা ছিল।
রেডিও এমন একটি মাধ্যম যা শুধু কানে শোনার জিনিস, ঘোষক-ঘোষিকাকে শ্রোতারা চোখে দেখতে পান না। কিন্তু এর মধ্যে দিয়েই খ্যাতি তৈরি হয়েছিল তার।

হোসনে আরা বললেন, তখন সমাজ এমন ছিল যে একটি মেয়ে অফিসে কাজ করে শুনলে ভাবা হতো, ও বোধ হয় ভালো না। এটাই ছিল সত্যি কথা, জানিনা বলা ঠিক হলো কিনা। পাড়াপ্রতিবেশী, স্বজনদের মধ্যেও ভেতরে ভেতরে একটা তুচ্ছ করা, অসম্মান করার দৃষ্টিভঙ্গী ছিল, এটা বুঝতে পারতাম। কখনো কখনো খারাপ লাগতো, মনে হতো কাজ করাটাই যেন একটা অন্যায় করা হচ্ছে। এখন এমন হয়েছে যে ‘ও রেডিওতে কাজ করে’ শুনলে লোকে এগিয়ে এসে কথা বলে।

এখন যে মেয়েদের কাজ করাটা সামাজিকভাবে গৃহীত হয়ে গেছে, অনেক মেয়ে নানা রকম কাজ করছে – এটা দেখে ভালো লাগে। আমাদের সময় এমন ছিল না।

রেডিওতে শব্দের উচ্চারণ বা পড়ার ভঙ্গি – এসব ক্ষেত্রে আগে যেমন মান রক্ষা করা হতো সে ব্যাপারে হোসনে আরা বললেন, “স্পষ্ট এবং শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করা এটা তো বদলে যাবার কোন কারণ নেই। কিন্তু ততটা আগের মতো পরিশীলিত নেই। তিনি অনেক নবীন অনুষ্ঠান উপস্থাপককে প্রশিক্ষণও দিয়েছেন, এখনো সপ্তাহে তিন দিন কাজ করেন তিনি।

তার কণ্ঠ যে এখনো ঠিক আছে এটা আল্লাহর অশেষ দান বলেই মনে করেন তিনি।এ জন্য আল্লাহর কাছে তিনি কতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।