প্রবাসের তৃপ্তি

রাকেশ রহমান : প্রবাসের অনেক না বলা কথা নিয়ে এসেছি পাঠকের কাছে। আমি থাকি ইউরোপের একটি দেশে জীবিকার জন্য করতে হয়েছে পড়ালেখা, জীবিকার জন্য করতে হচ্ছে চাকুরী। দার্শনিক মন আমার তাড়িয়ে বেরায় আমাকে সবসময়ে। আমি ঘুরতে পছন্দ করি আমি জানতে পছন্দ করি যেই দেশে থাকি সেই দেশের আইন কানুন। পাশাপাশি গোটা ইউরোপের আইন কানুন জানার পিছনেও আমার এক ধরনের দর্শন কাজ করে। কি যেন এক মান অভিমানে ১৩ বছরের ইউরোপের প্রবাসী জীবনে বাংলাদেশে যাইনী গত দশ বছর। দেশকে খুব মিস করি কিন্তু ধীরে ধীরে কেন জানি কিসের এক অভিমানে দেশে যাওয়া, চাওয়ার ও পাওয়ার ইচ্ছে টাকে ধমন করে চলেছি নিরবভাবে। আজকের লেখায় তুলে ধরবো ইউরোপের মানুষের জীবন-যাপনের কিছু কথা।

আমি চেষ্টা করি সেই জায়গাগুলোই ঘুরতে যেই জায়গা গুলোতে আমাদের বাংলাদেশীরা থাকেন না কারন ঐ জায়গা গুলোতে ঘুরতে গিয়ে ঐ জায়গার মানুষগুলোকে পরিচিত করাতে পারি আমার দেশ বাংলাদেশের সাথে।

আমি থাকি ইটালীতে, ইটালীর বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়। তবে খুব ভালো ব্যবসায়ী ছাড়া সকল প্রবাসীরাই ইটালীর পার্সপোট নিয়ে ইউরোপিয়ান নাগরিক হয়ে পারি জমাচ্ছে ইংল্যান্ডে।

সেখানে রয়েছে অবাধ চাকুরী বাকুরী ও ব্যবসার সুযোগ তাছাড়াও সরকারী সুযোগ সুবিধা।তবে সরকারী সুযোগ সুবিধার দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে ইংল্যান্ডেও আগামী ২০১৯ থেকে আসছে নতুন আইন।

কারন সরকারী সুযোগ সুবিধা ইউরোপিয়ানদের জন্য বন্ধ করতেই ইংল্যান্ড ইউরোপ ইউনিয়ন থেকে বিছিন্ন হয়েছে।
বর্তমানে ইটালীতে লিবিয়া থেকে এসে বাংলাদেশীদের সংখ্যা হয়েছে সর্বকালের সেরা পরিসংখ্যান।

ইটালিয়ান সরকার লিবিয়া থেকে আসা লোকদের রাজনৈতিক সুযোগ সুবিধার পাশাপাশি দিচ্ছে বসবাসের জায়গা, খাবার ও হাত খরচ এবং কর্মের জন্য করাছে বিভিন্ন কোর্স ।গত চার বছর ধরে ইটালীতে বন্ধ আছে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক আনা।
সবকিছুর পরেও সুনিশ্চিত ভর্বিষত ইটালীতে না থাকলেও বসবাসের জন্য আমার মতে শান্তির একটি দেশ ইটালী কারন সৌখিন ও শিল্প উন্নত দেশগুলোর ভিতরে বিশ্ব বিখ্যাত দেশগুলোর একটি ইটালী।

কথায় আছে না হাতী মরলেও লাখ টাকা তেমন ইটালীর অর্থনৈতিক মন্দা হলেও খাবার দাবারে, পোশাকে ফ্যাশনে এখনও বিশ্বের এক নাম্বার।

আমি সপ্তাহে পাঁচদিন কর্ম দিনের পর শনিবার, রবিবার ঘুরতে খুব পছন্দ করি।কোন সপ্তাহে কাউকে বাসায় আমন্ত্রন করি এক সাথে খাওয়া দাওয়া গল্প করি।দুই মাসে একবার কোন না কোন ইটালীয়ান পরিবারকে আমন্ত্রন করি থাকি,তাদের সাথে পরিচিত করাই আমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার গুলোর সাথে, পাশাপাশি দেশের গল্প শুনাই তাদের কারন আমি সুদীর্ঘ এক যুগ আছি এই দেশটিতে ইটালীয়ানদের অবশ্যই জানাতে হবে আমাদের দেশের কথা।

যতবার ইটালীয়ান পরিবার এসেছে ততবার সব পরিবার গুলোর সাথে আড্ডা দিতে দিতে রাত ১ টা বেজে গিয়েছে।
মন মানসিকতায় ইটালীয়ানরা অনেক উদার তবে কেউ যদি খারাপ হয় তাহলে আমাদের জন্যই হয়েছে।
তারা বিদেশিদের অপছন্দের পিছনে অনেক কারন রয়েছে।
আজ ছোট একটা ভ্রমন কাহিনি তুলে ধরবো;

কয়েক বছর আগে আমার এক বন্ধু নিউজিল্যান্ড থেকে ইটালীতে আশায় পরিকল্পনা করলাম বিশ্ব বিখ্যাত ভেনিস নগরীতে গোটা রাত আমরা ঘুরবো পরিবার নিয়ে।

অনেকের রাতের ঘুরা অপছন্দ কিন্তু রাত জাগা যেহেতু আমাদের বন্ধুদের পছন্দ তাই আমরা পরিবার নিয়ে চলে গেলাম ভেনিসে।

রাত ১০ টায় ভেনিসের প্রথম পুল পার হয়ে ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করলাম ভেনিসের মেইন পয়েন্ট সান মারকোর দিকে মার্চ মাস ভালো ঠান্ডা।

ছবি তুলছি আর আমরা হেঁটে চলেছি ,লোকজন বিদায় হচ্ছে বাড়ী ফিরছে আর আমরা ভিতরের দিকে যাচ্ছি।
রাতের ভেনিস যত দেখছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি পুড়ান পুড়ান বাড়ী গল্লি এযেন আমাদের পুরানো ঢাকার তিপান্ন গলির শহর ,বাতাসে কেমন যেন একটা পরিচিত শহরের গন্ধ পাচ্ছি।

পরিবার সহ প্রিয় বন্ধুর সাথে গল্প করছি গরম কপি পান করছি আর হেঁটে চলেছি কি যে এক আনন্দের অনুভুতি মনে হচ্ছিলো এরকম এক আনন্দ মূখর রাতের জন্য মনে হয় অনেক বছর অপেক্ষায় ছিলাম।

সমস্যার সমস্যা হলো রাত বারোটার পর সব কপিশপ বন্ধ হয়ে গেল।

মাঝে মাঝে নেশাখোর দুই একজন এগিকে এদিকে ছুটছে প্রথমে ভয় ভয় লাগছিলো সাথে মেয়েরা আছে তারপর দেখলাম একটু পর পর এক এক মোরে দামী দামী দোকান পাহাড়ায় পুলিশ আছে ও টহল দিচ্ছে তখন নিশ্চিতে এগুতে থাকলাম।
অবশেষে রাত ২টায় সেই বিখ্যাত মেইন পয়েন্ট সান মারকো পেলাম।

কি চমৎকার লাগছে আলোক সজ্জায়, অদ্ভুত! কন কনে শীতেও পানির ঢেউ এর কলকলে শব্দ, মাঝে মাঝে গাং চিলসহ আরো কিছু নাম না জানা পাখির শব্দে মুখরিত করছিলো পরিবেশকে।

মনে হচ্ছে আমাদের জন্য সরকার খালি করে রেখেছে,আমরা ছাড়া কেউ নেই আশেপাশে।
ভেনিসে আমি বহুবার গিয়েছি কিন্তু এত তৃপ্তি কখনও পাইনী। আমাদের জীবনের সেরা রাত গুলোর একটি হবে সেই রাত।
প্রায় একঘন্টা সেখানে থেকে সামনে যেখানে নৌকাগুলো ( ভেনিসের বিখ্যাত গোন্দোলা) বাঁধা থাকে এবং বোর্ড গুলো ছাড়ে সেখানে হাটছি আর অদ্ভুত রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করছি। মনে হচ্ছিল সকাল হতে যে সময়টা বাকি সেই সময় টুকু ঐখানেই বসে থাকি।

বাকি ছিলো অনেক সময় তাই ফিরতে শুরু করলাম ফিরছি আর মজার অতিতের গল্প করছি কারন বন্ধুর সাথে দেখা হয়েছে সাত বছর পর।

আস্তে আস্তে এগুছি আমরা আর ভোর হওয়া শুরু করেছে একটা পোলের উপড় এসে আমরা থামলাম লোক জন বেরে যাচ্ছে কিছু টুরিস্ট কিছু কর্মজীবি লোক ছুটছে কর্মের তাগিদে বেশ মনোরম দৃশ্য ভালোই লাগছিলো।

মনেহলো বহুদিন পর ঢাকায় ভোর হওয়া দেখতে যেমন বের হতাম তেমনই বহু বছর পর বিদেশে দুই বন্ধু পরিবার নিয়ে একটা মনের বাসনা পূরন করলাম।

পুরো কুয়াশা ভরা সকাল হয়ে গেল আমরা পাশের একটা কাফেটেরিয়ায় সকালের নাস্তা করতে রাস্তায় বিছানো চেয়ার টেবিলে বসলাম ঘুম ঘুম ভাব কিন্তু একটা সুখের তৃপ্তি মুখে।

আজ এই পর্যন্তই থাক আবার অন্য কোন বিখ্যাত জায়গার সৌন্দর্য বনর্নার গল্প নিয়ে হাজির হবো।