ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ বিরোধে হারিরিকে বাজি ধরলো সৌদি

কামরুল আহসান : মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হয়েছে নতুন নাটক। নাটকের চিত্রনাট্য কে লিখছে তা অবশ্য বোঝা যাচ্ছে না। কে যে প্রধান কুশিলব তাও বোঝা যাচ্ছে না। কে পরিচালক কে অভিনেতা তাও বোঝা যাচ্ছে না। সমস্ত কিছু অস্পষ্ট। এর মধ্যেই চলছে সৌদি-ইরান-হিজবুল্লাহ-ইসরায়েল নাটকের প্রথম অংক। শেষ অংক কোথায় হয় কে জানে! তবে এটুকু আড়ালে আড়ালে সবাই জানে এই নাটকের পেছনে প্রধান প্রযোজক হিসেবে আছে যুক্তরাষ্ট্র।

খেলাটা শুরু হয়েছে হঠাৎ করে মঞ্চে প্রবল প্রতাপে সৌদি ক্রাউন প্রিন্সের আবির্ভাব দিয়েই। ক্ষমতায় এসেই তিনি চটজলদি কিছু ঘোষণা দিলেন সৌদিকে আমূল বদলে ফেলার। যার মধ্যে অন্যতম কট্টরপন্থা থেকে বেরিয়ে এসে সৌদিকে মধ্যপস্থি ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার। এর সঙ্গেই তিনি আরো কিছু কাজ করলেন। ১১ জন সৌদি প্রিন্স এবং ৪ জন মন্ত্রীকে আটক করলেন দূর্নীতির দায়ে। তার পরের সপ্তাহেই নাটকের দৃশ্যে দারুণ এক মোচড় এলো। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরব এসে পদত্যাগ করলেন। এমন ঘটনা ইতিহাসে আর হয়নি। এক দেশের প্রধানমন্ত্রী আরেক দেশে এসে পদত্যাগ করেছেন। তার উপর তাকে রিহাদ বিমানবন্দর থেকে রীতিমতো পুলিশি তৎপরতায় ডাকাতি করে ধরে আনা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বয়ং বিশ্বখ্যাত সাংবাদিক রবার্ট ফিক্স। হারিরি জানিয়েছেন, তিনি কারো কথায় পদত্যাগ করেননি। নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবেই তিনি পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগের এক সপ্তাহ পর্যন্ত তার কোনো খবরও পাওয়া যাচ্ছিলোনা। সোমবার অবশ্য তিনি সাংসাবিদকদের সামনে এসেছেন। জানিয়েছেন দেশে ফিরবেন। লেবালনের প্রেসিডেন্টও তাকে দেশে ফেরার আহবান জানিয়েছেন। কিন্তু, এর আড়ালে আরো ঘটনা আছে। হারিরিকে আটক করার এক সপ্তাহ আগে সৌদি সফরে গিয়েছিলেন ট্রাম্পের জামাতা কুশনার। এর সঙ্গে কুশনারের সম্পর্ক কী? প্রথম কথা কুশনার একজন ইহুদি। দ্বিতীয় কথা ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল চায়, যে- কোনো মূল্যে লেবানন সীমান্ত থেকে হিজবুল্লাহদের উৎখাত করতে। কারণ হিজবুল্লাহ ইরানের মদদে গড়ে ওঠা একটি দল, যাদের পশ্চিমারা, ইউরোপ, ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠি হিসেবেই বিবেচনা করে। অন্যদিকে, সৌদি আরব ও ইসরায়েলের কমন শত্রু ইরান। আর মধ্যপ্রাচ্যে নিজের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য ইরানকে দমন করা ছাড়া বিকল্প নেই সৌদি ও ইসরায়েলের। এখন কথা হচ্ছে কে আসলে কাকে নিয়ে খেলছে? ইরানকে ধ্বংস করার জন্য হিজবুল্লাহকে আগে ধ্বংস করা অনিবার্য। কথা হচ্ছে কে কার কাঁধে বন্দুক রেখে মারবে? সৌদি কি ইসরায়েলকে ব্যবহার করবে? নাকি ইসরায়েলই সৌদির মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খাচ্ছে!

ইরানকে বা হিজবুল্লাহকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা লড়াইয়ে সাদ হারিরি সৌদি ও ইসরায়েলের একটা বাজির কার্ড মাত্র। সৌদির কথা হারিরি শুনতে বাধ্য। কারণ সৌদি আরবে শুধু তার পরিবার নয়, রয়েছে বিরাট ব্যবসাক্ষেত্র, প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছেন সেখানে। সাদ হারিরির পরিবর্তে সৌদি এখন লেবাননে বরং তার ভাই বাহা হারিরিকে ক্ষমতায় বসাতে চায়। বাহা হারিরি ক্রাউন প্রিন্সের আরো বেশি হাতের পুতুল। হিজবুল্লাহ ধ্বংসে ইয়েমেনের মতো লেবাননেও হয়তো সৌদি আরো এক যুদ্ধ চাপিয়ে দিতে চায়। কিন্তু, তাও আবার অসম্ভব হয়ে যাবে কারণ লেবাননে বাস করে প্রায় ৯ লাখ ম্যারোনাইট খ্রিস্টান। ইউরোপীয় ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খ্রিস্টানরা চায় না হিজবুল্লাহ ধ্বংসের হাত ধরে লেবাননের খ্রিস্টানদেরও ওপরও কোনো যুদ্ধ নেমে আসুক। সে ব্যাপারেও সৌদিকে হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে। সৌদি হয়তো এ ক্ষেত্রে নানারকম রাজনৈতিক কূটচালই বেছে নেবে, যেমনটা করেছে সাদ হারিরিকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করিয়ে। নাটকের শেষ দৃশ্য কী হবে তা এখনো বলা যাচ্ছে না। হয়তো এক ভয়াবহ যুদ্ধ নেমে আসবে মধ্যপ্রাচ্যে। যাই হোক, আপনি নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখবেন না! সম্পাদনা : পরাগ মাঝি