বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের দৃষ্টিতে হযরত ইদরিস (আ.)

আল্লামা জামালুদ্দিন কাতফি (রহ.) তাঁর রচিত তারিখুল হুকামা’ গ্রন্থে লিখেছেন, মুফাস্সির ও ইতিহাসবিদগণ যেসব কথা লিখেছেন সেগুলো খুবই প্রসিদ্ধ কথা। সুতরাং সেগুলোর পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই। অবশ্য বিজ্ঞানী ও দার্শনিকগণ তাঁর সম্পর্কে বিশেষভাবে যা-কিছু বর্ণনা করেছেন তা-ই উদ্ধৃত করা হলো।

হযরত ইদরিস (আ.) -এর জন্মস্থান ও তাঁর প্রতিপালিত হওয়ার স্থান কোথায় এবং তিনি নবুওতপ্রাপ্তি আগে কার কাছ থেকে বিদ্যা অর্জন করেছেন,এ-সম্পর্কে বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের মত বিভিন্ন প্রকার। একদলের মতে, হযরত ইদরিস (আ.) -এর নাম ছিলেন হারমাসুল হারামিসা। তিনি মিসরের মানাফ নামক গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। গ্রিকরা হারমাস’কে আরমিস বলে। আরমিস শব্দের অর্থ বুধ গ্রহ। (আরমিস অথবা হারমিস গ্রিসের একজন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ও জ্যোতিষশাস্ত্রজ্ঞ ছিলেন। এ-কারণেই তাঁকে আরমিস বলা হতো। গ্রিকরা আরমিস ও ইদরিসকে একই ব্যক্তি মনে করে। অথচ এটা একটি প্রকশ্য ভুল। এর পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই।) অপর দল মনে করে, তাঁর নাম গ্রিক ভাষায় তিরমিস’ হিব্রু ভাষায় খানুখ এবং আরবি ভাষায় আখনুখ। আর কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা তাঁর নাম ইদরিস বলেছেন। আবার একই দল বলে, তাঁর গুরুর নাম ছিলো গুসা যাইমুন বা আগুসা যাইমুন (মিসরি)। গুসা যাইমুন সম্পর্কে এই দল এর চেয়ে বেশি আর কিছুই বলে না যে তিনি মিসরের অর্থ গ্রিসের নবীগণের (আলাইহিমুস সালাম) মধ্য থেকে একজন নবী ছিলেন। আবার এই দলই গুসা যাইমুনকে দ্বিতীয় ইদরিন এবং হযরত ইদরিস (আ.) -কে তৃতীয় ইদরিন উপাধি দিয়ে থাকে। গুসা যাইমুন শব্দের অর্থ অত্যন্ত সৎকর্মপরায়ণ। তাঁরা এটাও বলেন যে হারমাস মিসর থেকে বের হয়ে গোটা ভূ-মন্ডল ভ্রমণ ও পর্যবেক্ষণ করেছেন। এরপর তিনি মিসরে প্রত্যাবর্তন করলে ৮২ বছর বয়সে আল্লাহপাক তাঁকে নিজের সান্নিধ্যে উঠিয়ে নেন।

তৃতীয় আরেকটি দল বলে, ইদরিস (আ.) বাবেলে (ব্যাবিলনে) জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানে তিনি প্রতিপালিত হন ও বেড়ে ওঠেন। প্রথম জীবনে তিনি হযরত শীস বিন আদম (আ.) থেকে বিদ্যা অর্জন করেন। আকায়িদ শাস্ত্রের বিখ্যাত আলেম আল্লামা শাহারেস্তানি বলেন, আগুসা যাইমুন হযরত শীস (আ.) -এরই নাম। হযরত ইদরিস (আ.) জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়ার বয়সে উপনীত হলে আল্লাহ তাআলা তাঁকে নবুওত দানে ভূষিত করেন। তখন তিনি দুষ্ট-প্রকৃতি ও ফাসাদ সৃষ্টিকারী লোকদেরকে হেদায়েতের দাওয়াত ও তাবলিগ শুরু করেন। কিন্তু ফাসাদ সৃষ্টিকারী ও বিস্তারকারীরা তাঁর কোনোও কথায় কান দিলো না। হযরত আদম (আ.) ও হযরত শীষ (আ.) -এর শরিয়তের বিরোধীই থেকে গেলো। অবশ্য ক্ষুদ্র একটি দল ইসলাম গ্রহণ করলো। হযরত ইদরিস (আ.) ওখানে এই ধরনের গতিবিধি ও হাবভাব দেখে ওখান থেকে হিজরত করে অন্য এলাকায় চলে যাওয়ার জন্য মনস্থির করলেন। তিনি তাঁর অনুসারীবৃন্দকেও হিজরত করতে বললেন। ইদরিস (আ.) -এর অনুসারীরা এ-কথা শোনার পর জন্মভূমি পরিত্যাগ করা দুঃসহ ও যন্ত্রণাদায়ক মনে করে বললেন, বাবেল শহরের মতো এমন সুন্দর বাসস্থান আমাদের ভাগ্যে আর কোথাও হতে পারে! হযরত ইদরিস (আ.) তাঁর অনুসারীদেরকে সান্তানা দিয়ে বললেন, তোমরা যদি আল্লাহর পথে এই কষ্টটুকু সহ্য করো, তাহলে তাঁর রহমত অতি ব্যাপক, তিনি তোমাদেরকে অবশ্যই এর উত্তম বিনিময় প্রদান করবেন। সুতরাং তোমরা সাহস হারিও না। আল্লাহ তাআলার নির্দেশের সামনে নিজেদের মস্তক অবনত করো।

মুসলমানদের সম্মতি লাভের পর হযরত ইদরিস (আ.) এবং তাঁর অনুসারীগণ মিসরের উদ্দেশে হিজরত করলেন। এই ক্ষুদ্র দলটি যখন নীল নদের প্রবাহ এবং তার পাশের অববাহিকার সবুজ শ্যমালিমা ও সজীব দৃশ্য দেখতে পেলো, উৎফুল্ল ও আনন্দিত হলো। হযরত ইদরিস (আ.) এই দৃশ্য দেখে তাঁর অনুসারীদেরকে বললেন, বাবলিউন এই বিশাল নদীটির অববাহিকা-ভূমি তোমাদের বাবেলের মতোই সবুজশ্যামল ও সজীব। তাঁরা উত্তম স্থান নির্বাচন করে নীল নদের পাশেই বসবাস করতে লাগলেন। হযরত ইদরিস (আ.) বাবলিউন শব্দটি এতই বিখ্যাত হয়ে পড়লো যে আরব জাতি ছাড়া প্রাচীনকালের সব জাতিই এই ভূখন্ডটিকে বাবলিউন’ বলতে শুরু করলো। অবশ্য আরবরা একে বলতো মিসর। মিসর নামকরণের কারণ হিসেবে তাঁরা বলেছেন, হযরত নুহ (আ.) -এর প্লাবনের পর এই জায়গাটি মিসর বিন হামের বংশধরগণের বসবাসস্থল হয়েছিলো।
হযরত ইদরিস (আ.) ও তাঁর অনুসারী দল মিসরে বসবাস করতে থাকলেন। ওখানেও তিনি আল্লাহ তাআলার পয়গামের দাওয়াত এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে বারণ করার কর্মে ব্রতী হলেন। কথিত আছে যে তাঁর যুগে বাহাত্তরটি ভাষা প্রচলিত ছিলো। তিনি আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে সে-যুগের সব ভাষাতেই অভিজ্ঞ ছিলেন এবং প্রত্যেক সম্প্রদায়কে তাদের ভাষাতেই হেদাযেত, দাওয়াত ও তাবলিগ করতেন।

হযরত ইদরিস (আ.) আল্লাহর দীনের প্রতি দাওয়াত ও তাবলিগ ছাড়াও দেশ শাসন, শহরের জীবনযাপন পদ্ধতি এবং সহজীবনযাপনের নিয়ম শিক্ষা দিয়েছিলেন। শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে তিনি প্রতিটি সম্প্রদায় থেকে শিক্ষার্থী সংগ্রহ করে তাদেরকে দেশ শাসন ও তার মূলনীতি এবং শাখা বিধি-বিধান শেখালেন। এই শিক্ষার্থীরা পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা অর্জনের পর নিজ নিজ সম্প্রদায়ে ফিরে গেলো এবং শহর ও বসতিসমূহ আবাদ করলো। এসব শহর ও বসতিগুলোকে তারা শিক্ষালব্ধ নীতি ও নিয়ম অনুযায়ীই আবাদ করলো। তাদের আবাদকৃত শহরের সংখ্যা ন্যূনাধিক দুইশো ছিলো। এদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিলো রাহা শহর। হযরত ইদরিস (আ.) এই শিক্ষার্থীদেরকে অন্যান্য শাস্ত্রও শিখিয়েছিলেন। তার মধ্যে দর্শনশাস্ত্র ও জ্যোতিষশাস্ত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

হযরত ইদরিস (আ.) -ই প্রথম ব্যক্তি যিনি সর্বপ্রথম দর্শন শাস্ত্র ও জ্যোতিষশাস্ত্র প্রবর্তন করেছিলেন। কারণ, আল্লাহ তাআলা তাঁকে নক্ষত্রম-লী এবং তাদের বিন্যাস, তারকারাজি এবং তাদের একত্র হওয়া ও দূরে সরে যাওয়ার গুরুত্ব এবং পারস্পরিক আকর্ষণের রহস্য শিক্ষা দিয়েছিলেন। তা ছাড়া তাঁকে সংখ্যা ও গণিতশাস্ত্রেও অভিজ্ঞ বানিয়েছিলেন। যদি আল্লাহ তাআলার এই নবীর মাধ্যমে এসব শাস্ত্রের বিকাশ না ঘটতো মানুষের স্বভাব ও প্রকৃতির পক্ষে ঐ পর্যন্ত পৌঁছা দুষ্কর হয়ে যেতো। তিনি বিভিন্ন দল ও সম্প্রদায়ের জন্য তাদের অবস্থা অনুযায়ী আইন-কানুন ও রীতিনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। ভূমন্ডলকে চারভাগে বিভক্ত করেছিলেন এবং প্রত্যেক চতুর্থাংশের জন্য একজন গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন। গভর্নর সেই ভূখন্ডের শাসন ও আধিপত্যের দায়িত্বশীল সাব্যস্ত হয়েছিলেন। আর ভূমন্ডলের সেই চারটি অংশের জন্য এটা আবশ্যক করে দেয়া হয়েছিলো যে এসব আইন-কানুন ও রীতিনীতির চেয়ে আল্লাহর ওহির মাধ্যমে যেসব আইন-কানুন তাদেরকে শিক্ষা দেয়া হয়েছে সেগুলো অগ্রগণ্য থাকবে।