দুদকের তালিকায় কোচিং বাণিজ্যে জড়িত শিক্ষকরা

ডেস্ক রিপোর্ট : শ্রেণিকক্ষের বাইরে অতিমাত্রায় কোচিং বাণিজ্যে জড়িত শিক্ষকদের তালিকা এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হাতে। ইতিমধ্যে রাজধানীর ২১টি স্কুলের ৫২২ জনের তালিকা করে তাদের দ্রুত অন্যত্র বদলির সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। এরপর থেকে ওই কোচিং বাণিজ্যে জড়িত শিক্ষকরা আতঙ্কে রয়েছেন। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর ও দুদকে ভিড় করছেন জানার জন্য তালিকায় তার নাম আছে কী না। কেউ আবার তার নাম বাদ দেয়ার তদবির করছেন।
এদিকে দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ওই শিক্ষকরা ১০ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৩৩ বছর পর্যন্ত একই বিদ্যালয়ে রয়েছেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতার পাশাপাশি কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত থেকে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে অর্থ উপার্জন করছেন।
দুদকের সুপারিশে আরো বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষক কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত থাকলে তার এমপিও স্থগিত, বাতিল, বেতন ভাতাদি স্থগিত, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত, বেতন এক ধাপ অবনমিতকরণ, সাময়িক বরখাস্ত ও চূড়ান্ত বরখাস্ত করা যেতে পারে। এমপিও বিহীন প্রতিষ্ঠান কোচিং করালে এমপিও স্থগিত ছাড়া বাকি সব শাস্তি তার জন্য প্রযোজ্য হবে। এসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে পরিচালনা পর্ষদ ব্যবস্থা না নিলে সরকার পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিতে পারেন। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের স্বীকৃতি বাতিল ও অধিভুক্তি বাতিল করতে পারেন। আর সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে বিধিমালা ১৯৮৫ অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। কোচিং বাণিজ্য কমাতে হলে জড়িত শিক্ষকদের এক স্কুল থেকে অন্য স্কুলে বা শাখা দিবা থেকে প্রভাতী কিংবা প্রভাতী থেকে দিবা শাখায় নির্দিষ্ট সময় অন্তর বদলি করা দরকার।
এ ব্যাপারে মাউশির মহাপরিচালক প্রফেসর এসএম ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, দুদকের ওই তালিকার কথা আমি শুনেছি। তবে এখনো আমার হাতে এসে পৌঁছেনি। কোচিং-এর সঙ্গে জড়িত শিক্ষকদের বদলিসহ যেসব সুপারিশ করা হয়েছে তা পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।
জানা গেছে, গত ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি বাণিজ্য, কোচিং বাণিজ্য ও নিয়োগ বাণিজ্যের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের একটি অভিযোগ তদন্ত শুরু করে দুদক। দুদকের পরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি দল তদন্ত শেষে সম্প্রতি কমিশনের কাছে শিক্ষকদের তালিকাসহ প্রতিবেদন দাখিল করেছে।
মাউশির কর্মকর্তারা বলছেন, এসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। এ জন্য শিক্ষা আইন খুবই জরুরি। এই আইনটি খুব শিগগিরই হতে যাচ্ছে। এসব শিক্ষকের শিক্ষা আইনের আওতায় আনা হবে নাকি প্রচলিত আইনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায় তা নিয়ে ভাবা হচ্ছে। দুদক তালিকা তৈরির প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে একটি গোয়েন্দা সংস্থা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে সরকারি ও বেসরকারি স্কুলের কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের তালিকা পাঠিয়ে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করে। ওই তালিকা এবং দুদক নিজস্ব তদন্ত করে এসব শিক্ষকের তালিকা করা হয়েছে এবং কোচিংয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। সরজমিনে পরিদর্শনকালে দুদক কর্মকর্তারা দেখতে পেয়েছেন মতিঝিলে এজিবি কলোনি, শাহজাহানপুর, সিদ্ধেশ্বরী ও মতিঝিলের আরো বেশ কয়েকটি এলাকায় নীতিমালা ভঙ্গ করে কোচিং করাচ্ছেন শিক্ষকরা। জিজ্ঞাসাবাদে তারা তা স্বীকার করেছে। ভবিষ্যতে তারা এরূপ কোচিং করবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দেন।
কারা আছেন দুদকের তালিকায়: দুদকের তালিকায় রাজধানীর সরকারি ও বেসরকারি ২১টি স্কুলের কোচিং বাণিজ্যে জড়িত শিক্ষক স্থান পেয়েছে। স্কুলগুলো হলো আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল মডেল স্কুল, মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়, ভিকারুন্নিসা নূন স্কুল, উইলস লিটলস ফ্লাওয়ার স্কুল, ধানমন্ডি গভ: বয়েজ হাই স্কুল, ধানমন্ডি সরকারি বালিকা স্কুল, গর্ভনমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, শেরে বাংলা নগর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, শেরে বাংলা নগর বালক স্কুল, মিরপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মনিপুর স্কুল, আজিমপুর গভর্নমেন্ট হাই স্কুল, কাকলি হাই স্কুল, উদয়ণ উচ্চ বিদ্যালয়, মীরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউট, ন্যাশনাল বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়, আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, মাইলস্টোন কলেজ, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ ও বিসিআইসি কলেজ।
ভিকারুন্নিসা নূন স্কুলের শিক্ষকরা হলেন, মূল শাখার পদার্থ বিজ্ঞানের (কলেজ শাখা) ড. ফারহানা, সহকারী শিক্ষক (দিবা) শাহনেওয়াজ পারভীন, ইংরেজির শিক্ষক সুরাইয়া নাসরিন, ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষক কামরুন্নাহার চৌধুরী (ইংরেজি), লক্ষ্মী রানী ফেরদৌসা, নুশরাত জাহান। আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষকরা হলেন, মতিঝিল শাখার প্রভাতী শাখার ইংরেজির সহকারী শিক্ষক নিজাম উদ্দিন, রসায়নের সহকারী শিক্ষক আব্দুল মান্নান, বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচিতির সহকারী শিক্ষক উম্মে ফাতিমা, দিবা শাখার বাংলার সহকারী শিক্ষক আজমল হোসেন, রসায়নের সহকারী শিক্ষক আশরাফুল আলম ও বাবু সুবাস চন্দ্র পোদ্দার, গণিতের গোলাম মোস্তফা, বনশ্রী শাখার গণিতের শিক্ষক আব্দুল হালিম, প্রভাতী শাখার সহকারী শিক্ষক লাভলী আখতার, তাসমিন নাহার, ইংরেজি ভার্সনের মতিনুর ও উম্মে সালমা, ব্যবসা শিক্ষার আব্দুল জলিল, দিবা শাখার রসায়নের ফখরুদ্দিন, প্রভাতী ইংরেজির শিক্ষক মনির জাহান, গণিতের ফাহমিদা খানম পরী, লুৎফন নাহার, হামিদা বেগম ও নাজনীন আক্তার। দিবা শাখার ইংরেজি শিক্ষক উম্মে সালমা, তৌহিদুল হক, সুরাইয়া জান্নাত, গণিতের সফিকুর রহমান, নুরুল আমিন, ইংরেজির মনিরুল ইসলাম ও সমাজ বিজ্ঞানের রফিকুল ইসলাম। মতিঝিল শাখার গণিতের শিক্ষক গোলাল মোস্তফা, বাংলার অহিদুজ্জামান, মাকসুদা বেগম মালা, আলী নেওয়াজ আলম করিম, আবুল কালাম আজাদ ও আব্দুর রব। বনশ্রী শাখার ইংরেজি শিক্ষক শফিকুল ইসলাম পদার্থ বিজ্ঞানের মাহবুবুর রহমান ও গণিতের মোয়াজ্জেম হোসেন।
মতিঝিল মডেল হাই স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক এনামুল হক, ইংরেজি সিনিয়র শিক্ষক মেজবাহুল ইসলাম, গণিতের সিনিয়র শিক্ষক সুবীর কুমার সাহা, প্রাথমিক শাখার সহকারী শিক্ষক (দিবা) সাইফুল ইসলাম, প্রভাতীর সহকারী শিক্ষক মোহনলালন ঢালী, মতিঝিল স্কুল শাখার সিনিয়র শিক্ষক বকুল বেগম, খ ম কবির হোসেন, শহীদুল ইসলাম, শুবদেন ঢালী, মঞ্জুরি হিলালী, আমান উল্লাহ আমান, হামিদুল হক খান, রমেশ চন্দ্র বিশ্বাস, চন্দন রায়, বাসুদেব সমদ্দার, ইংরেজি সহকারী শিক্ষক আসাদ হোসেন, দিবা শাখার প্রদীপ কুমার বসাক, আবুল খায়ের, শারমীন খানম। বাসাবোর মাধ্যমিক শাখার প্রধান শিক্ষক কবীর হোসেন, দেলোয়ার হোসেন, কামরুল হাসান, রুহুল আমিন। খিলগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নাছির উদ্দিন চৌধুরীর নাম রয়েছে।
মতিঝিল সরকারি বালক স্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষক কবীর চৌধুরী, প্রভাতী শাখার ভৌত বিজ্ঞানের শিক্ষক আবুল হোসেন মিয়া, ইংরেজির মোখতার আলম, আফজালুর রহমান, ইমরানা আলী, গণিতের মাইনুল হাসান ভূইয়া, বেলায়েত হোসেন। দিবা শাখার সহকারী শিক্ষক এবিএম ছাইফুদ্দিন ইয়াহু, মিজানুর রহমান, আবুল কালাম আজাদ, জহিরুল ইসলাম, জামাল উদ্দিন বেপারী। মতিঝিল সরকারি বালিকা স্কুলের দিবা শাখার গণিতের শিক্ষক সাইফুর রহমান, ইংরেজি শিক্ষক শাহ আলম, সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষক নুরুন্নাহার সিদ্দিকা ও ভূগোলের নাছিমা আক্তার। মনিপুর স্কুলের শিক্ষকরা হলেন দিবা শাখার সহকারী শিক্ষক, রসায়নের তুহিনুর রহমান, (ব্র্যাঞ্চ-৩) ইংরেজি দেলোয়ার হোসেন, গণিতের মাছুদ আলম ও গণিতের শিক্ষক নুরুদ্দিন, মোখলেছুর রহমান, ইংরেজির সহীদুল রহমান বিশ্বাস, ফেরদৌস হাসান, (ব্র্যাঞ্চ-১) গণিতের সহকারী শিক্ষক যোবাযেদ মাহমুদ ও মেহেদী হাসান, শহীদুল ইসলাম, (ব্র্যাঞ্চ-২), মূল শাখার রসায়নের শিক্ষক নুরুজ্জামান, ইংরেজির সাইফুল্লাহ, বাংলার শামসুন্নাহার ও তাজুল ইসলাম।
গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলের কোচিংবাজ শিক্ষকরা হলেন, প্রভাতী শাখার গণিতের শিক্ষক শাহজাহান সিরাজ, মোহাম্মদ ইসলাম, জাকির হোসেন, রণজিৎ কুমার শীল, শাহজাহান, সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষক আবদুল ওয়াদুদ খান, ইংরেজির আলতাফ হোসেন খান ও আযান রহমান।
রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের যেসব শিক্ষকরা কোচিংয়ের জড়িত তারা হলেন, সহযোগী অধ্যাপক ইংলিশ মিডিয়াম এ বি এম মইনুল ইসলাম, মর্নিং শিফিটের আল আকবর, বাংলা মিডিয়ামের রেজাউল রহমান, কামরুল ইসলাম ও রসায়নের কামরুজ্জামান। মানবজমিন