বিশেষ সাক্ষাৎকার:মুহাম্মাদ মুসা
রোহিঙ্গা শরণার্থীর যৌথ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন

ডেস্ক রিপোর্ট : ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক ডা. মুহাম্মাদ মুসা চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ; তিনি দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সামাজিক ও মানব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে। তিনি প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন রোহিঙ্গা শরণার্থী পরিস্থিতি ও শরণার্থী ব্যবস্থাপনার নানা দিক নিয়ে।

প্রশ্ন: আপনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করেছেন। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঢল ও এই সংকটের ধরনটির আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য আছে কী?

মুহাম্মাদ মুসা : এই সংকটের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক লোক শরণার্থী হয়েছে এবং মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এটা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। শরণার্থীসংকট বিশ্বের অনেক দেশেই আছে, কিন্তু এত অল্প সময়ে এত বিপুল জনগোষ্ঠীর শরণার্থীতে পরিণত হওয়ার উদাহরণ পাওয়া কঠিন। বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীরা উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নিয়েছে। এখানকার মোট জনসংখ্যা পাঁচ লাখের মতো। অথচ এখানে এখন আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের সংখ্যা ছয় লাখের বেশি। এর সঙ্গে আগের তিন লাখ শরণার্থী যোগ করলে মোট শরণার্থী নয় লাখের মতো। বলা যায় যে স্থানীয় জনসংখ্যার প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে। এটা একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। আর থাইল্যান্ড ও বুরুন্ডির শরণার্থী শিবিরের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, শিবিরগুলো সাধারণত স্থানীয় জনবসতি থেকে দূরে হয়ে থাকে। আমাদের পরিস্থিতি তা থেকে ভিন্ন।

প্রশ্ন: রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশে আসা শুরু হওয়ার পর প্রায় আড়াই মাস সময় চলে গেছে। শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় এখন বেশ শৃঙ্খলা এসেছে। সরকার ও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্র্যাকও এর সঙ্গে জড়িত এবং আপনারা মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে করেন?

মুহাম্মাদ মুসা : এত বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর উপস্থিতি উখিয়া ও টেকনাফের ডেমোগ্রাফি বা জনমিতি পরিবর্তন করে ফেলেছে। স্থানীয় জনগণ ও শরণার্থীদের মধ্যে একটি সমন্বয়মূলক পরিস্থিতি বজায় রাখাই এই সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, এই শরণার্থীদের প্রভাব স্থানীয় সমাজে পড়েছে এবং পড়ছে। বাজারে প্রভাব পড়েছে, জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, বাড়িভাড়া বেড়েছে। এসব বাস্তবতা স্থানীয় পর্যায়ে অসন্তোষ তৈরি করতে পারে। ফলে শরণার্থী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্থানীয় লোকজনকে নানাভাবে যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। এবং তাদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকটি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। এই কাজটি করতে না পারলে সামনে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এটা সত্যিই এক বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রশ্ন: এর বাইরে শরণার্থী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আপনারা কোন দিকগুলোতে বর্তমানে নজর দিচ্ছেন?

মুহাম্মাদ মুসা : ব্র্যাক ওই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। উখিয়া ও টেকনাফ অঞ্চলে আমাদের উপস্থিতি আগে থেকেই ছিল। সেখানে আমাদের ক্ষুদ্রঋণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি ও পয়োনিষ্কাশন, সামাজিক ক্ষমতায়নের মতো কর্মসূচিগুলো কার্যকর ছিল। আমরা এখন সেই কর্মসূচিগুলো জোরদার করার চেষ্টা করছি। স্থানীয় জনগণের জন্য যেমন, তেমনি শরণার্থীদের জন্যও। শরণার্থী ক্যাম্পগুলোর প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ ছিল পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা। আমরা ইতিমধ্যেই ১১ হাজার টয়লেট স্থাপন করেছি, ১ হাজার ৮০০ টিউবওয়েল বসিয়েছি। শুরুতে কিছু টয়লেট হয়েছিল, যেগুলো মানসম্মত ছিল না, বরং অপরিকল্পিত টয়লেটগুলো পরিবেশদূষণ করেছে। সেই টয়লেটগুলো বন্ধ করে দূষণ রোধ করাও এক বড় চ্যালেঞ্জ। বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করতে সাধারণ টিউবওয়েলের পাশাপাশি ডিপ টিউবওয়েল বসানোর পরিকল্পনাও আমাদের রয়েছে। আর পানি বিশুদ্ধকরণ বড়ি বিতরণ বা কলেরার ভ্যাকসিন দেওয়ার মতো কর্মসূচিও আছে।

প্রশ্ন: শরণার্থীদের মধ্যে অনেক শিশু আছে, যারা তাদের মা–বাবা হারিয়েছে। তা ছাড়া, শিশুরা যে ভয়াবহ পরিস্থিতি ও বর্বরতার মধ্য দিয়ে গেছে, তার মানসিক আঘাতও তো চরম। এই শিশুদের জন্য আপনারা কী করছেন বা কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

মুহাম্মাদ মুসা : আসলে শরণার্থী শিবিরের শিশু ও তরুণদের দিকে বাড়তি মনোযোগ থাকা জরুরি বলে আমি মনে করি। কারণ, তাদের সঠিক পথে পরিচালিত না করতে পারলে বা কর্মক্ষম করে তুলতে না পারলে তারা আমাদের জন্য সামনে বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। আমরা ব্র্যাকের পক্ষ থেকে কিছু ‘শিশুবান্ধব পরিসর’ তৈরি করেছি। সেখানে আমাদের স্বেচ্ছাসেবক রয়েছেন, আমরা রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকেও লোকজন নিয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। এ রকম শিশুবান্ধব পরিসরে এসে শিশুরা সময় কাটাচ্ছে। সেখানে তারা খেলাধুলার সুযোগ ও স্বেচ্ছাসেবকদের আদর-যত্ন পায়। শিশুদের মানসিক চাপ দূর করার ক্ষেত্রে এ ধরনের জোনের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের শিক্ষার অবস্থা খুব ভালো ছিল না। আমরা ২০০ স্কুল খোলার পরিকল্পনা করছি। সেগুলোতে অঙ্ক ও ইংরেজি শিক্ষা দেওয়া হবে। এবং সেখানে মিয়ানমারের কারিকুলাম পড়ানো গেলে খুব ভালো হয়। সেই চেষ্টা আমাদের আছে।

প্রশ্ন: নারী শরণার্থীদেরও তো বাড়তি ঝুঁকি রয়েছে।

মুহাম্মাদ মুসা : নারীদের পাচার হয়ে যাওয়ার একটি বিপদ রয়েছে। সে জন্য আমরা কমিউনিটিভিত্তিক একটি নিরাপত্তা কর্মসূচি নিয়েছি। রোহিঙ্গা নারী ও স্থানীয় লোকজনকে সম্পৃক্ত করে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা নারীদের খোঁজখবর রাখে, তদারক করে। কোনো সমস্যা হলে বা ঘটনা ঘটলে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া বা সালিসের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

প্রশ্ন: বর্ষার সময় শরণার্থী ব্যবস্থাপনার সমস্যা ছিল একরকম। সামনে শীত আসছে, এ ক্ষেত্রে কোন দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি বলে মনে করেন?

মুহাম্মাদ মুসা : শরণার্থীদের তাঁবুগুলো বেশ পাতলা। তা ছাড়া, মেঝেতে যে পলিথিন আছে, তাতে শীত সামাল দেওয়া যাবে না। মোটা কম্বল, শাল, চাদর ও সোয়েটারের মতো পোশাকের প্রয়োজন পড়বে। এই দিকটিতে নজর দিতে হবে। শীতকালীন কিছু রোগ আছে, যেমন চর্মরোগ—এসব বিবেচনায় নিয়ে স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিতে মনোযোগ দিতে হবে। ত্রাণ কার্যক্রমে যুক্ত সংশ্লিষ্ট সবাইকে আসন্ন শীতের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।

প্রশ্ন: শরণার্থীদের কারণে প্রকৃতি ও পরিবেশের বেশ ক্ষতি হয়ে গেছে। আবাসন তৈরি ও জ্বালানির চাহিদা মেটাতে গিয়ে অনেক গাছ কাটা হয়েছে ও হচ্ছে। এটা সামাল দেওয়ার কোনো উদ্যোগ আছে কি? আর এই ক্ষতিই-বা পূরণ হবে কীভাবে?

মুহাম্মাদ মুসা : এটা ঠিক যে শরণার্থীদের কারণে অনেক গাছ কাটা পড়েছে এবং জ্বালানির জন্য গাছ কাটা হচ্ছে। এটা বন্ধ করতে বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করতে হবে। সেই উদ্যোগ চলছে। যেমন ব্র্যাকের উদ্যোগে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তুষের জ্বালানি কেক বানিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে গাছ কাটা কমবে। সামগ্রিকভাবেই এ ধরনের বিকল্প জ্বালানির উদ্যোগ নেওয়া দরকার। একই সঙ্গে বনায়ন কর্মসূচির বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বিরান হওয়া অঞ্চলে আবার গাছ লাগানো এবং রোহিঙ্গাদের মধ্যে এ ব্যাপারে সচেতনতা তৈরির দিকে জোর দিতে হবে।

প্রশ্ন: রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, বেসরকারি সাহায্য সংস্থা, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন ত্রাণ ও সাহায্য সংস্থা কাজ করছে। ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ের জন্য আরও কিছু করণীয় আছে কি?

মুহাম্মাদ মুসা : শরণার্থী সংকটের শুরুতে সরকার ও জনগণ মিলে যেভাবে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে, তা খুবই প্রশংসনীয়। তখন দলে দলে অসহায় মানুষ যেভাবে এসে হাজির হয়েছিল, তাদের জন্য আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থা করা ছিল খুবই কঠিন কাজ। এখন সবকিছু অনেকটাই গুছিয়ে আনা গেছে। আরও ভালো করতে গেলে কার্যকর সমন্বয়ের বিষয়টি খুবই জরুরি। আপনিই বলেছেন অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। ফলে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি যাতে না হয়, সে জন্য যৌথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে ভালো হয়। তা করা গেলে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা বা যথাযথ চাহিদা ও প্রয়োজনগুলো নির্ধারণ করা ও সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কাজটি খুবই সহজ হয়ে যাবে।

প্রশ্ন: রোহিঙ্গা ইস্যুতে জেনেভায় জাতিসংঘের ত্রাণ সহায়তা-সংক্রান্ত বৈঠকে আপনি যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে কী অভিজ্ঞতা হলো?

মুহাম্মাদ মুসা : বৈঠকে জাতিসংঘের সদস্য অধিকাংশ দেশই আলাদাভাবে বক্তব্য দিয়েছে। আন্তর্জাতিক এই প্ল্যাটফর্মে সব দেশই বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের ভূমিকাকে স্বাগত জানিয়েছে, প্রশংসা করেছে। সব দেশের তরফেই এটা বলা হয়েছে যে সমস্যাটি মিয়ানমারের এবং তাদেরই সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হতে হবে। শরণার্থী সমস্যা যে বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে এবং তা যে অন্যায়ভাবে দেশটির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেটাও বলা হয়েছে। এটা একটা বড় স্বীকৃতি। সেখানে শরণার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সাহায্যের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৪৪ কোটি ডলারের যে চাহিদার হিসাব করা হয়েছে, তার বিপরীতে সম্মেলনে প্রায় ৩৩ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সহায়তার প্রতিশ্রুতি মিলেছে।

প্রশ্ন: এরপর কী হবে?

মুহাম্মাদ মুসা : আসলে এরপর কী হবে, তা নিয়ে আমরাও চিন্তিত। বৈঠকে ছয় মাসের একটি হিসাব ধরে তহবিল সংগ্রহ করা হয়েছে। অনেক দেশের প্রতিনিধিরা বলে গেছেন, দেশে গিয়ে তাঁরা এ নিয়ে আরও কথা বলবেন। ভিন্নভাবে সহযোগিতা আসতে পারে। আন্তর্জাতিক তহবিল গঠন, সফট লোন বা অনুদানের কথা শোনা যাচ্ছে। আগামী ফেব্রুয়ারির আগে আবার এ ধরনের বৈঠক হতে পারে পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে।

প্রশ্ন: রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে বলে মনে করেন কি?

মুহাম্মাদ মুসা : আমরা আশা করি, এই সংকটের তাড়াতাড়ি সমাধান হবে। তবে আগামী দু-তিন মাসের মধ্যে যে কিছু হবে না, তা বোঝা যাচ্ছে। সমস্যার উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এই সমস্যার সমাধানও মিয়ানমারকেই করতে হবে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগ কতটুকু ফল দেবে, সেটা এক বড় প্রশ্ন। এ ব্যাপারে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের সক্রিয় উদ্যোগ এবং ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ কার্যকর ভূমিকা পালন না করলে সংকটের সমাধান সহজ হবে বলে মনে হয় না।

প্রশ্ন: আপনাকে ধন্যবাদ।

মুহাম্মাদ মুসা : ধন্যবাদ। প্রথম আলো