সন্তান ভূমিষ্টের পর যা করতে হবে

সাইদুর রহমান : নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর যেই সন্তান লাভ হয় এটা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ এবং দান। এটাকে অবহেলা করা অথবা বোঝা মনে করা চরম ধৃষ্টতা। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন: “তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা তাদেরকে দান করেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছা তাকে করে দেন বন্ধ্যা, তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান। (সূরা শূরা ৪৯-৫০)

সন্তান ছেলে হবে না মেয়ে সেটা একমাত্র আল্লাহর হাতে। এটা কোন মানুষের হাতে বা ইচ্ছায় নেই। আল্লাহই একমাত্র তার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ছেলে মেয়ে দান করেন। তাছাড়া জাহিলী যুগে কন্যা সন্তান জন্ম হওয়াকে খারাপ মনে করা হতো। ইসলাম এসে এসব কুসংস্কার দূর করেছে। কন্যা সন্তানের জন্মে অসন্তুষ্ট না হওয়া। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন: “তাদের কাউকেও যখন কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয় তখন তার মুখম-ল কালো হয়ে যায়।“ [ নাহল/৫৮]

সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পর বাচ্চার কানে আযান দেওয়া। এ বিষয়ে হাদীসে এসেছে, আবু রাফে তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন “আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আলীর পুত্র হাসানের কানে নামাযের আযানের মত আযান দিতে দেখেছি, যখন ফাতেমা (রাযি:) তাকে জন্ম দেয়।” তিরমিযী, অধ্যায়, আযাহী, অনুচ্ছেদ নং ১৫, হাদীস নং ১৫৫৩]

বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই আযান দিতে হবে। যেন তার কানে আল্লাহর মহত্ব বিষয়ক প্রথম আওয়াজ প্রবেশ করে এবং শয়তান দূরে চলে যায় ।

দ্বিতীয় পর্যায়ে ‘তাহনীক’ করা। খেজুর চিবিয়ে পানির মত করে শিশুর মুখে দেয়া যেন এর কিছুটা তার পেটে প্রবেশ করে। এটাকেই তাহনীক বলা হয়। তবে খেজুর না পাওয়া গেলে অন্য যে কোন মিষ্টি দ্রব্য যেমন মধু বা অন্য কিছু দ্বারাও এভাবে তাহনীক করা যায়। তাহনীক সৎ ব্যক্তি কর্তৃক হওয়া উত্তম। (নায়লুল আউতার, ৫-৬/১৭৯, ফাৎহুল বারী, ৯/৭২৮)

তাহনীক করা হলো সুন্নত। এ বিষয়ে হাদীসে এসেছে, আবু মুসা (রাযি:) হতে বর্ণিত তিনি বলেন: ‘‘আমার ছেলে সন্তান হলে আমি তাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট নিয়ে আসি, তিনি তার নাম রাখেন ইব্রাহীম এবং খেজুর দ্বারা তাহনীক করেন এবং তার জন্য বরকতের দুয়া দেন, তার পর বাচ্চাকে আমাকে ফিরিয়ে দেন।“ ([বুখারী, অধ্যায়, আক্বীক্বা, অনুচ্ছেদ নং ১, হাদীস নং৫৪৬৭, মুসলিম নং ২১৪৫)

বাচ্চাকে মাতৃদুগ্ধ পান করানো। মাতৃদুগ্ধ পান করা বাচ্চার অধিকার। তাছাড়া এই দুধ পান করার লাভ এবং এর গুরুত্ব বর্তমান মেডিকেল ও সমাজে দারুণ ভাবে স্বীকৃত। আল্লাহ বলেন: “আর সন্তানবতী নারীরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু’বছর দুধ খাওয়াবে, যদি দুধ খাওয়ানোর পূর্ণ মেয়াদ সমাপ্ত করতে চায়।“ [বাক্বারা/২৩৩]

আরেকটি করণীয় হলো, প্রথম দিনে বাচ্চার নাম নির্দিষ্ট করা। বাচ্চার নাম জন্মের সপ্তম দিন অর্থাৎ আক্বীক্বার দিন নির্ধারণ করা যায় । এ বিষয়ে স্বয়ং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “রাতে আমার পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করে, আমি আমার পিতার নামে তার নাম ইব্রাহীম রেখেছি”। [ বুখারী, অধ্যায় জানাযাহ, হাদীস নং ১৩০৩, মুসলিম, অধ্যায়, ফাযাইল হাদীস নং ২৩১৫]

আরেকটি করণীয় হলো, সপ্তম দিনে আক্বীকা : সেই জন্তুকে আক্বীকা বলা হয়, যা বাচ্চার জন্মে সপ্তম দিনে তার পক্ষ হতে জবাই করা হয়”। ( ফাতহুল বারী,৯/৭২৬)

আক্বীকা করা সুন্নতে । তাই যে ব্যক্তি আক্বীকা করার সামর্থ্য রাখে, সে যেন অবশ্যই আক্বীকা করে। আর যার সামর্থ্য নেই তার উপর আক্বীকা জরুরী নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘‘বাচ্চার আক্বীকা আছে। তাই তোমরা তার পক্ষ হতে কুরবানী করো এবং তার মাথার চুল পরিষ্কার কর। [ বুখারী, আক্বীকা, নং৫৪৭১]

তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বলেন: ‘‘প্রত্যেক বাচ্চা তার আক্বীকার বিনিময়ে বন্ধক থাকে, সপ্তম দিনে তার পক্ষ হতে জবাই করা হবে এবং তার মাথা মু-ন করা হবে এবং নাম রাখা হবে”। [সহীহ ইবনে মাজাহ,অধ্যায়, যাবাইহ, নং৩১৬৫, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ]

কীভাবে আকীকা করতে হবে । এ বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “পুত্র সন্তানের পক্ষ হতে দুটি বরাবর ধরনের ছাগল এবং কন্যা সন্তানের পক্ষ হতে একটি ছাগল আক্বীকা দিতে হবে”। [সহীহ আবু দাউদ, হাদীস নং ২৪৫৮]

আরেকটি করণীয় হলো, বাচ্চার চুল মু-ন এবং চুলের ওজন বরাবর রৌপ্য দান করা: বাচ্চার বয়সের সপ্তম দিনে যেমন আক্বীকা করা সুন্নত, তেমন সেই দিন বাচ্চার মা চুলগুলো মু-ন করা ও চুলের ওজন বরাবর রৌপ্য সদকা করাও সুন্নত। আলী (রায়িঃ) বলেন: “আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসানের পক্ষ হতে ছাগল আক্বীকা করেন এবং ফাতেমা (রাযি:) কে বলেন: তার মাথা মু-ন করে দাও এবং চুলের ওজন বরাবর রৌপ্য সদকা করে দাও”।[ তিরমিযী, অধ্যায়, আযাহী, হাদীস নং ১৫১৯]

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হলো খতনা করা। খতনা করা ইসলামের শে‘আর বা পরিচয় চিহৃ। হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:“পাঁচটি বিষয় স্বভাবগত, খতনা করা, নাভির নিচের চুল পরিষ্কার করা, মোচ কর্তন করা, নখ কর্তন করা এবং বগলের লোম ছিঁড়ে ফেলা”। [ বুখারী, অধ্যায়, লেবাস নং ৫৮৯১, মুসলিম, অধ্যায়, ত্বাহারাহ ]

তাছাড়া নবী ইবরাহীম (আঃ) আশি বছর বয়সে নিজের খতনা করেছিলেন। (বুখারী, মুসলিম)উলামা কেরামের মতে সাবালক হওয়ার পূর্বে তা করা ভাল।