শিক্ষামন্ত্রীকে অভিনন্দন জানালো ফ্রান্স আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ

ফারুক নওয়াজ খান সুমন, প্যারিস থেকে: জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো কর্তৃক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাতই মার্চের ভাষনকে ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ হিসেবে স্বীকৃতির জন্য ইতিবাচক ভুমিকা রাখায় শিক্ষামন্ত্র্রী নুরুল ইসলাম নাহিদকে অভিনন্দন জানিয়েছে ফ্রান্স আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ।

বুধবার ইউনেস্কো সদর দপ্তরে শিক্ষামন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান ফ্রান্স আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ কাশেম এবং সাধারন সম্পাদক মো: মুজিবুর রহমান।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক সাতই মার্চের ভাষন বাঙ্গালীর মুক্তি সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করেছিলো। সে ভাষন শুনে সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালী এক পতাকাতলে সমবেত হয়েছিলো। সে ভাষনকে ইউনেস্কো মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ইতিহাসের প্রতি সুবিচার করেছে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি স্মরনীয় ঘটনা। আজ এ স্বীকৃতির পিছনে অক্লান্তভাবে কাজ করার জন্য শিক্ষামন্ত্রী এবং বাংলাদেশ সরকারের অবদান অনেক। শিক্ষামন্ত্রীকে অভিনন্দন জানানোর সময় এসব কথা বলেন ফ্রান্স আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ কাশেম এবং সাধারন সম্পাদক মো: মুজিবুর রহমান।

এ সময় নেতৃবৃন্দ বলেন, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বাঙ্গালী জাতির অবিসংবাদিত নেতা যে ভাষন দিয়ে একটি দেশের স্বাধীনতা লাভের পথ সুগম করেছিলেন সেটা এখন বিশ্বের সবাই জানতে পারলো। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় জাতির আকাশে কলঙ্ক একে দিয়েছিলো স্বাধীনতা বিরোধী একটি চক্র। যে ভাষনের জন্য সমগ্র বাঙ্গালী জাতি এক হয়ে রনাঙ্গনে ঝাপিয়ে পড়ে দীর্ঘ নয় মাসের রক্ষক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করেছিলো বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর সে ভাষন প্রচারের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলো স্বাধীনতা বিরোধী চক্র। আজ ইউনেস্কো মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে প্রমান করলো সত্যকে চেপে রাখা যায় না।

শিক্ষামন্ত্রীকে অভিনন্দন জানানোর সময় উপস্থিত ছিলেন ফ্রান্সে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদুত কাজী ইমতিয়াজ হোসেন। প্রসঙ্গত, ৪৬ বছর আগে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) স্বাধীনতাকামী ৭ কোটি মানুষকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম- এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।তার ওই ভাষণের ১৮ দিন পর পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালি নিধনে নামলে বঙ্গবন্ধুর ডাকে শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। নয় মাসের সেই সশস্ত্র সংগ্রামের পর আসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা সেদিন ছিল মিছিলের শহর। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলে দলে মানুষ পায়ে হেঁটে, বাস-লঞ্চে কিংবা ট্রেনে চেপে রেসকোর্স ময়দানে সমবেত হয়েছিলেন।
ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে লাখ লাখ মানুষে সয়লাব হয়ে গিয়েছিল বিশাল ময়দান। মুহুর্মুহু গর্জনে ফেটে পড়েছিলেন উত্থিত বাঁশের লাঠি হাতে সমবেত লাখ লাখ বিক্ষুব্ধ মানুষ। বাতাসে উড়ছিল বাংলার মানচিত্র আঁকা লাল সূর্যের অসংখ্য পতাকা।

বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি আর হাতাকাটা কালো কোট পরে বাঙালির প্রাণপুরুষ বঙ্গবন্ধু সেদিন দৃপ্তপায়ে উঠে আসেন রেসকোর্সের মঞ্চে। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে আকাশ-কাঁপানো স্লোগান আর মুহুর্মুহু করতালির মধ্যে হাত নেড়ে অভিনন্দন জানান অপেক্ষমান জনসমুদ্রের উদ্দেশে।তারপর শুরু হয় সেই ঐতিহাসিক ভাষণ।তিনি বলে চলেন- . আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু, আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে।বঙ্গবন্ধু বলেন, ..সৈন্যরা, তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার বুকের উপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবাতে পারবে না।

উত্তাল জনসমুদ্র যখন স্বাধীনতার ঘোষণা শুনতে উদগ্রীব, তখন এরপর বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করেন তার চূড়ান্ত আদেশ- তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব- এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম- এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।

মাত্র ১৯ মিনিটের সেই ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে তুলে দেন অবিশ্বাস্য এক উচ্চতায়। এতে সামরিক আইন প্রত্যাহার, সৈন্যবাহিনীর ব্যারাকে প্রত্যাবর্তন, শহীদদের জন্য ক্ষতিপূরণ ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের চার দফা দাবি উত্থাপন করেন তিনি।রেসকোর্স ময়দান থেকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সরাসরি প্রচারের সব আয়োজন ছিল ঢাকা বেতার কর্তৃপক্ষের। প্রচার শুরুও হয়েছিল। কিন্তু সামরিক কর্তৃপক্ষ প্রচার বন্ধ করে দিলে বেতারের সব বাঙালি কর্মচারী বেতার ভবন ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। বন্ধ হয়ে যায় সব ধরনের সম্প্রচার কার্যক্রম।ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে নানা গুজব। গভীর রাতে অবশ্য সামরিক কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুর পূর্ণ ভাষণ সম্প্রচারের অনুমতি দিতে বাধ্য হয়।