সৈয়দ আশরাফ সাহেবের স্ত্রীর অবদান রয়েছে লন্ডনের বাঙালি কমিউনিটিতে

 

ডেস্ক রিপোর্ট: ৩/৪ দিন আগে ম্যানচেস্টারে বসবাসরত বন্ধুবর লেখক সাংবাদিক ফারুক যোশী ফোন করে জিজ্ঞাসা করেছিলেন সৈয়দ আশরাফ সাহেবের স্ত্রী নাকি মারা গেছেন? ফারুক ভাইকে বললাম আমি জানি না। তখন ও শীলা ঠাকুর জীবিত। তিনি জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। ফারুক ভাইকে বললাম সাবেক যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ নেতা শাহাব উদ্দিন চঞ্চল ভাইকে জিজ্ঞাসা করুন। তিনি বলতে পারবেন। কারন চঞ্চল ভাইয়ের সাথে আশরাফ ভাইর খাঁতির আছে। শাহাবউদ্দিন ভাই যদিও আওয়ামী লীগ করেন না, কারন তাকে ওপর লেভেল থেকে বলা হয়েছে আওয়ামী লীগ না করতে। সত্য মিথ্যা জানিনা শুনেছি ছোট আপা নাকি চান না তিনি আওয়ামী লীগ করুন। লিখতে বসলে কত কথা চলে আসে, পেটের ভিতরে যা আছে তা ছাড়লে অনেকেরই হার্ট এট্যাক হবে। সেটি অন্য প্রসংঙ্গ। ফারুক ভাই ফোন রেখে দিলেন। বাংলা স্টেটমেন্ট ডট কম।

বাসায় এসে খবর নেয়ার চেষ্টা করলাম শীলা ঠাকুর জীবিত না মৃত। জীবিত হলে একদিন চলে যাব দেখতে। কারন শীলা ঠাকুরকে আমার স্ত্রী চিনে। আমাকে ২/১ দিন বলেছে সে দেখতে যাবে। আমি কিছুই বলিনি। কারন শীলা ঠাকুরকে দেখতে গেলে আওয়ামী লীগের নেতারা হয়তো বলবেন ফয়সল ভাই কোন ধান্ধা নিয়ে এসেছে অথবা বলবে আশরাফ ভাইয়ের সাথে খাতির জমানোর জন্য তার স্ত্রীকে দেখতে এসেছে। কারণ লন্ডনে বা দেশে যারা এখন আওয়ামী লীগ করে তাদের বেশিরভাগ মানুষেরই ধান্ধা থাকে। যে যে রকম দুনিয়া শুদ্ধভাবে সে রকম। একজন চোর সে দুনিয়ার সাবইকে ভাবে তার মত। একজন ফকির মনে করে সবাই ফকির। ধান্ধাবাজরা মনে করে সবাই তার মত ধান্ধাবাজ।

পরেরদিন খবর পেলাম শীলা ঠাকুর আর নেই। তিনি চলে গেছেন সব ধরা ছোঁয়ার বাইরে। একজন মানুষ মরে গেলে তার সব কিছু শেষ হয়ে যায়। আমার চোখের সামনে তখন ভেসে উঠে ২/৩ জন মহিলার মুখ। ৮০ দশকের শেষ দিকের কথা। লন্ডনে তখন বাঙালী মহিলারা মিছিল মিটিংএ কম আসতেন। আজ যেভাবে দেশে লন্ডনে—— মহিলাদের উপদ্রব বেড়েছে তখন সে রকম ছিলনা। হাতে গোনা ৩/৪ জন মহিলা। তাদের একজন হচ্ছেন বাঙালিদের অত্যন্ত পরিচিত হাউস অব লর্ডসের সদস্য ব্যরোনেস পলা মঞ্জিলা উদ্দিন, শীলা ঠাকুর, (আশরাফ সাহেবের স্ত্রী) এবং আরেকজন ছিলেন সাবেক ইষ্ট লন্ডনের লেবার পার্টির নেতা রাজন উদ্দিন জালাল সাহেবের সাবেক স্ত্রী মিতু ঘোষ, এবং বঙ্গবন্ধুর সাবেক ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি মরহুম আমিনুল হক বাদশাহ ভাইয়ের স্ত্রী আলমা হক। এ কজন মহিলার অক্লান্ত পরিশ্রম ছিল বাঙালি মহিলাদের জন্য। পূর্ব লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেলে যে জাগোনারী সেন্টারটি দাঁড়িয়ে আছে সেটির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ছিলেন সৈয়দ আশরাফ সাহেবের স্ত্রী শীলা ঠাকুর। তখন বাঙালি মহিলারা ঘর থেকে বের হতে পারতেন না। স্বামী সংসার, তা ছাড়া পুরুষ শাসিত বাঙালি সমাজ। কোনো মহিলা বের হয়ে আসলে তাকে শুনতে হতো কত কথা। পলা আপার স্বামী কমর উদ্দিন সাহেব তার জলন্ত প্রমান। স্ত্রীকে রাজনীতিতে পাঠিয়ে কত কথা শুনতে হয়েছে কমর ভাইকে। সেদিক থেকে আশরাফ সাহেবের স্ত্রী শীলা ঠাকুরের সে সমস্যা ছিলনা। কারন শিলা ছিলেন ইন্ডিয়ান মহিলা। তবে শীলা স্মার্ট ছিলেন। আশরাফ সাহেবও তখন টগবগে তরুন। গতকাল এ নিয়ে কথা বলছিলাম পলা আপার সাথে। বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছি । পলা আপা বললেন,তখন কাজ করা ছিল খুবই কষ্টের। একে তো সামাজিক বাঁধা, তা ছাড়া লন্ডনে প্রাতিষ্টানিক বর্ণবাদ। এ সব কিছুকে ডিঙিয়ে তাদেরকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। জানতে চেয়েছিলাম তাদের বিয়ে কি লাভ ম্যারেজ না এরেঞ্জ ম্যারেজ ছিল, পলা আপা বললেন আমি এ বিষয়ে জানিনা। বুঝলাম তিনি সবই জানেন কিন্তু বলতে চাননা। আমি আর প্রেশার করিনি। অনেকই প্রেম করেন দোষ শুধু টেলিভিশন মালিকদের। আগে বিদেশী বিয়ে করার একটি টেন্ডেন্সী ছিল বাঙালীদের মধ্যে। অনেক পুরুষ বিয়ে করেছেন আইরীশ স্কটিশ সাদা মহিলা। বাংলাদেশের এক নামকরা আইনবীদ বিয়ে করেছেন এক সাদা পুরুষকে। আমি জিজ্ঞাস করেছিলাম উনি কে তিনি বলেছিলেন উনি আমার স্বামী, বলেছিলাম আমরা কোথায় ছিলাম তিনি বলেছিলেন আপনি ছিলেননা। বিদেশী যারা বিয়ে করেন তাদেরকে দেখলেই আমার মনে পড়ে সিলেটের সাবেক পৌরসভার চেয়ারম্যান বিশিষ্ট রাজনীতিবীদ বাবরুল হোসেন বাবুল সাহেবের কথা। ১৯৮৬ সালের নির্বাচন। সিলেট এক আসন। এমপি প্রার্থী ছিলেন সাবেক স্পীকার মরহুম হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, মরুহুম আব্দুস সামাদ আজাদ, ও বাবরুল হোসেন বাবুল সাহেব। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সাহেবের শশুর বাড়ী নাকি কুমিল্লায়। বাবুল সাহেব বক্তব্য রেখেছিলেন চৌধুরী সাহেবের বিরুদ্ধে। তিনি বলেছিলেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সিলেটে নির্বাচন করতে এসেছেন, কিন্তু বিয়ে করেছেন তিনি কুমিল্লায়, আমাদের মা চাচীরা কি তার যোগ্যতা রাখেননা?

সে যাক ,প্রিয় পাঠক শীলা ঠাকুর, পলা উদ্দিন, মিথু ঘোষ, আলমা হক প্রচন্ড পরিশ্রম করেছেন এ কমিউনিটির জন্য। কিন্তু এ কমিউনিটি শীলাকে মুল্যায়ন করেনি। শীলা ঠাকুরকে কোনো সংগঠন কোনো এওয়ার্ড দেয়নি। অথচ শীলার অবদান রয়েছে এ কমিউনিটিতে। ফেইস বুকে দেখলাম শীলা হিন্দু না মুসলমান, এ নিয়ে চলছে তর্ক বিতর্ক। কিন্তু কেউ বলছেনা শীলা কতটুকু ভালো মানুষ ছিলেন? হিন্দু- মুসলমান থেকে ভালো মানুষ হওয়াটা আসল। শীলার চিকিৎসার জন্য আশরাফ সাহেব তার ঢাকার বনানীর বাড়ী বিক্রি করে দিয়েছেন এ নিয়ে তর্ক বিতর্ক চলছে। শীলা হিন্দু না মুসলমান এ তর্ক না করে শীলার কি অবদান রয়েছে এ কমিউনিটিতে তা দেখা দরকার। আশরাফ সাহেব কম কথা বলেন। তিনি একজন ভালো মনের মানুষ এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আমার দৃষ্টিতে বিএনপি এবং আওয়ামীলীগ উভয় দলই দুজন ভালো মহাসচিব পেয়েছিল একজন আশরাফ সাহেব, অপরজন মির্জা ফখরুল ইসলাম সাহেব। কোনো ফালতু কথা তারা বলেননি। অনেকেই বলছেন বৃটেনের চিকিৎসা ব্যবস্থা ফ্রি। অতএব আশরাফ সাহেব বাড়ী বিক্রি করবেন কেন? যারা এসব ফালতু কথা বলে মাঠ গরম করার চেষ্টা করছেন তাদের উদ্দেশ্যে বলি যদি কেউ কাম কাজ না করে তাহলে সব কিছুই ফ্রি।

শিলা তো কাজ করতেন তার ঔষধ ফ্রি কি-না আমি জানিনা। তবে আশরাফ সাহেবের অন্য যত দোষই থাকনা কেন তিনি যে এখন পর্যন্ত সৎভাবে নিজেকে আগলে রেখেছেন এটা তো তার দুষমনরা বলে থাকে। সাংবাদিকতা করতে যেয়ে কত কিছুরই স্বাক্ষী হয়ে আছি। আল্লাহ মাফ করুক। এখন অনেক কিছুতেই যাইনা। বয়স বাড়ছে, তা ছাড়া পুরুষ বলেন আর মহিলা বলেন যে কোনো কিছুতে গেলেই ফেইসবুকে ছবি। মনে হয় আমরা এখন যাই কিছু করি সবই ফেইসবুকে দেওয়ার জন্য।

সৈয়দ আশারফ সাহেব এখন বড্ড একা হয়ে গেলেন। জীবন সংঙ্গীনিকে হারিয়ে তিনি কেমন আছেন জানিনা। তবে ভালো থাকার কথা নয়। পৃথিবীতে দুটি জায়গায় পার্টনারসীপ হয় এক হচ্ছে লাইফ পার্টনারসীপ অপরটি হচ্ছে বিজনেস পার্টনারসীপ। লাইফ পার্টনার যদি ভালো না হয় তাহলে সময়ের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠা মুশকিল। আমাদের সমাজে কিছু পুরুষ মানুষ আর কিছু মহিলা আছে খাঁই খাঁই ভাব। সারাক্ষন খাঁই খাঁই। আওয়ামীলীগ যখন ৯৬ ইংরেজীতে ক্ষমতায় ছিল তখন এক মন্ত্রীর স্ত্রী ছিলেন মিসেস টেন পার্সেন্ট। শীলার সে রকম কিছু ছিলনা। অথচ শীলা অথবা আশরাফ সাহেব ইচ্ছে করলে অনেক কিছুই করতে পারতেন। লন্ডনে আমি আশরাফ সাহেবকে দেখেছি খুবই সাধারন জীবন যাপন করেছেন। এক সময় একটি চ্যারেটি সংস্থায় তিনি কাজ করেতন। আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক হওয়ার পর দু একবার দেখা হয়েছিল প্রেস কনফারেন্সে। জিজ্ঞাস করেছিলাম তাকে নাকি সন্ধার পর খোজে পাওয়া যায়না? তিনি নাকি হারিয়ে যান। আরেকটি প্রশ্ন করেছিলাম শীলা কি ইন্ডিয়ার “র“ এজেন্ট? আশরাফ সাহেব হেসে বলেছিলেন সব খবর আপনার কাছে। আগে প্রেস কনফারেন্সে গেলেই বিগড়ে দেয়ার কাজটি সহজভাবে করতে পারতাম। উদ্দ্যেশ্য থাকতো যে কোনো নেতা এমপি মন্ত্রী, হোন তিনি বাংলাদেশের অথবা বৃটেনের। চেতিয়ে দিতে পারলেই কাজ হলো। আমিনুল হক বাদশাহ ভাইর কাছ থেকে সেটি আমি কিছুটা শিখেছিলাম। বাদশাহ ভাই একবার ইষ্ট লন্ডনে ইষ্ট এন্ড লাইফ পত্রিকার উপর খুবই ক্ষেপেছিলেন। স্থানীয় সরকারের পত্রিকা ছিল সেটি। ফ্রি বাড়াী বাড়ী ডিষ্টিবিউট করতো। বাজেট ছিল অনেক। এক সময় লন্ডনের বিখ্যাত সাংবাদিক নজরুল ইসলাম বাসন ভাই কাজ করতেন সেটিতে। বাদশাহ ভাই আমাকে জিজ্ঞাস করেছিলেন এ পত্রিকাটিকে কি বলা যায়? কমিউনিটিকে কি সার্ভ করে? বলেছিলাম না। বললেন একটি নাম দাও। বাদশাহ ভাইকে বললাম বলেন এটা কি ইষ্ট এন্ড লাইফ? না ইষ্ট এন্ড লাই? তৎকালীন সময়ে কাউন্সিল লিডার ছিলেন প্রপেসার মাইকেল কীথ, কীথ অনেকটা অসহায়ের মত বাদশাহ ভাইর দিকে থাকিয়েছিলেন। এখন বাদশাহ ভাইও নেই। আমারও আর কাউকে বিগড়ে দিতে ভালো লাগেনা। তা ছাড়া প্রেস কনফারেন্সে এখন জুনিয়র সাংবাদিকরাই যান বেশী।

সে যাক, প্রিয় পাঠক মৃত্যু কাউকে রেহাই দিবেনা। আজ যে মাটি আমাদের পায়ের নীচে পদদলিত হচ্ছে সেই মাটি সময়ের বিবর্তনে যে কোনো সময় উপরে উঠে যেতে পারে। অতএব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আপনি কি করছেন না করছেন হিসেব রাখা দরকার। যতটুকু পারা যায় সমাজের জন্য কমিউনিটির জন্য ভালো কিছু করে যাওয়া দরকার। লাইফ ইজ ভেরী শর্ট। মরে গেলে সব কিছুই শেষ। অতএব যতদিন বেঁচে থাকবেন মুক্ত হয়েই বাঁচুন। মানুষের কল্যানের জন্য বাঁচুন। নিজের দিকে খেয়াল রাখুন। আজ যা করছেন কাল তা কিন্তু ইতিহাস হয়েই রয়ে যাবে। ভালো কিছু করলে মানুষ মনে রাখবে। গতকাল পূর্ব লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল এলাকা দিয়ে যখন যাচ্ছিলাম জাগোনারী সেন্টারটি তখন চোখে পড়ে। আমার মনের পর্দায় ভেসে উঠে শীলা ঠাকুরের মুখখানি। মনের মধ্যে অনেক চিন্তা এসে জমে যায়। মনে মনে প্রশ্ন করি মানুষের জীবন এত শর্ট কেন? একজন মানুষ ৬০/৭০ বছরের বেশী বাঁচেনা। অথচ একমাত্র মানুষ ছাড়া সৃষ্টির অনেক প্রানীই হাঁজার বছর বাঁচে। সৃষ্টির এই লীলা বোঝা বড় মুশকিল।