‘আমি সম্পূর্ণ সুস্থ, বিচার বিভাগের স্বার্থে আমি সাময়িকভাবে যাচ্ছি’

CJ-airport-Letterউম্মুল ওয়ারা সুইটি ও আরিফুর রহমান তুহিন : প্রধান বিচারপতি বলেছেন, বিচার বিভাগের স্বার্থে, বিচার বিভাগ যাতে কোনভাবে কলুষিত না হয় এই জন্য আমি সাময়িকভাবে যাচ্ছি। আমার কারও প্রতি কোন বিভেদ নেই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস সরকারকে ভুল বোঝানো হয়েছে।’ সাংবাদিকরা প্রধান বিচারপতিকে প্রশ্ন করতে চাইলে তিনি এসময় একটি লিখিত বক্তব্য দিয়ে বলেন, এখানে সব লেখা আছে। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়- আমি সম্পুর্ণ সুস্থ আছি। ইদানিং একটা রায় নিয়ে রাজনৈতিক মহল, আইনজীবি ও বিশেষভাবে সরকারের মাননীয় কয়েকজন মন্ত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে ব্যক্তিগতভাবে যেভাবে সমালোচনা করেছেন, এতে আমি সত্যিই বিব্রত। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সরকারের একটি মহল আমার রায়কে ভুল ব্যাখ্যা প্রদান করে পরিবেশন করায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার প্রতি অভিমান করেছেন। যা অচিরেই দূরীভূত হবে বলে আমি বিশ্বাস। সেই সাথে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আমি একটু শঙ্কিতও বটে। কারণ গতকাল প্রধান বিচারপতির কার্যভার পালনরত প্রবীণতম বিচারপতির উদ্ধৃতি দিয়ে মাননীয় আইনমন্ত্রী প্রকাশ করেছেন যে, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি অচিরেই সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনে পরিবর্তন আনবেন। প্রধান বিচারপতির প্রশাসনে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কিংবা সরকারের হস্তক্ষেপ করার কোনো রেওয়াজ নেই। তিনি শুধুমাত্র রুটিনমাফিক দৈনন্দিন কাজ করবেন। এটিই হয়ে আসছে। প্রধান বিচারপতির প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করলে এটি সহজেই অনুমেয় যে সরকার উচ্চ আদালতে হস্তক্ষেপ করছে এবং এর দ্বারা বিচার বিভাগ ও সরকারের মধ্যে সম্পর্কের আরো অবনতি হবে। এটা রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না।’ এক মাসের ছুটিতে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগে গতকাল রাত ৯টা ৫৬ মিনিটে ঢাকার হেয়ার রোডের বাসা থেকে বেরিয়ে বিমানবন্দরের পথে গাড়িতে ওঠার আগে বাইরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের বিচারপতি সিনহা এসব কথা বলেন। গতকাল রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে তিনি অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে বাসভবন ত্যাগ করেন। সবকিছু ঠিক থাকলে আজ দুপুরের মধ্যেই এসকে সিনহা অস্ট্রেলিয়া পৌঁছবেন।
এদিকে সন্ধ্যা ৭টায় এসকে সিনহাকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিতে প্রটোকলের গাড়ি তার হেয়ার রোডের বাসভবনে প্রবেশ করে। হাইকোর্টের প্রটোকল অফিসার মোহাম্মদ আব্দুল ওয়ারেস জানান, তিনি সন্ধ্যা ৭টায় এসকে সিনহার বাসায় যান। তিনি সিনহার মালামাল নিয়ে বিমানবন্দরে পৌঁছে দেবেন। এর আগে তার প্রধান বিচারপতির প্রটোকলের ও ব্যক্তিগত গাড়ি এবং তার একান্ত সচিব আনিসুর রহমান দুই দফায় প্রধান বিচারপতির বাসায় যান।
সিনহার বিদেশ যাওয়া উপলক্ষে তার বাসভবন থেকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ পর্যন্ত বিশেষ নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা রাশেদা সুলতানা বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, প্রধান বিচারপতির প্রটোকল অফিসারের সঙ্গে কথা বলে তারা নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন।
ঢাকা থেকে রওনা হয়ে ফ্লাইট এসকিউ ৪৪৭ স্থানীয় সময় ভোর ৬টায় সিঙ্গাপুরে পৌঁছবে। সেখানে ৪৫ মিনিট যাত্রাবিরতি করে রওনা হবে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে। সিঙ্গাপুর থেকে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছতে প্রায় ৭ ঘণ্টা লাগে।
এছাড়া গতকাল সকাল থেকেই বিভিন্ন সময়ে হেয়ার রোডে বাসায় এসকে সিনহার সঙ্গে দেখা করতে যান তার স্বজনরা। স্বজনদের মধ্যে রয়েছেন প্রধান বিচারপতির ভাই এন কে সিনহা, ভাতিজি জামাই রাজমন সিনহা, সুজিত সিনহা ও রামকান্ত সিনহা ও শ্যালিকা শিলা সিনহা। এছাড়া ছুটিতে যাওয়ার পর থেকেই প্রায় প্রতিদিনই প্রধান বিচারপতির বাসায় আইনমন্ত্রীসহ উচ্চপর্যায়ের লোকজন ও স্বজনরা তার বাসায় যান। আবার তিনিও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে কয়েকবার বাসা থেকে বের হন। গত সপ্তাহেও তার বেয়াই- বেয়াইন, ভাইসহ স্বজনরা দেখা করতে প্রধান বিচারপতির বাসায় গিয়েছেন।
জানা গেছে, গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় তার বাসায় যান বিচারপতির দফতরের হিসাবরক্ষক। গত দুই সপ্তাহ ধরেই প্রধান বিচারপতির বিদেশে যাওয়া নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছিলো। এই পরিস্থিতিতে গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী প্রধান বিচারপতির ছুটিতে দেশের বাইরে যাওয়ার আবেদনে স্বাক্ষর করেন। গত বৃহস্পতিবার স্বাক্ষর করেন রাষ্ট্রপতি। তারপরই প্রধান বিচারপতির বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় থেকে (সরকারি আদেশ) জিও দেওয়া হয়। আবেদনে সস্ত্রীক বিদেশ যাওয়ার কথা থাকলে শেষ পর্যন্ত একাই গেলেন এসকে সিনহা।
এরমধ্যে গতকাল শুক্রবার ও ১৫ অক্টোবর রোববার দুদিনই সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সে টিকিট কাটা হয়। তবে প্রধান বিচারপতি গতকাল যাওয়ার জন্যই প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। আত্মীয়-স্বজনরাও বিষয়টি জানেন।
২৫ দিনের অবকাশ শেষে ৩ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট খোলার দিনই অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ১ নভেম্বর পর্যন্ত এক মাসের ছুটিতে যান সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। এর মধ্যেই প্রধান বিচারপতি সস্ত্রীক অস্ট্রেলিয়ায় যেতে ৫ বছরের ভিসার জন্য দূতাবাসে আবেদন করেন। সেখানে তাদের বড় মেয়ে সূচনা সিনহা অবস্থান করছেন। তাদের ৩ বছরের ভিসা দেয় অস্ট্রেলিয়া দূতাবাস। এরপর মঙ্গলবার তিনি আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিকে তার বিদেশ ভ্রমণের বিষয়টি চিঠি দিয়ে অবহিত করেন। ওই চিঠিতে আগামী ১৩ অক্টোবর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত প্রধান বিচারপতি অস্ট্রেলিয়ায় থাকতে চান বলে উল্লেখ রয়েছে। সম্পাদনা : গিয়াস উদ্দিন আহমেদ