কূটনৈতিকভাবেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান সম্ভব: আ ফ ম খালিদ হোসেন

ডক্টর মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসেন। অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ ওমরগণি এম ই এস কলেজ, চট্রগ্রাম। খতিব, ওসমান রা.জামে মসজিদ, হালিশহর এ ব্লক, চট্রগ্রাম। সম্পাদক, মাসিক আত-তাওহিদ।

সম্প্রতি মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গা ইস্যুতে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি ভারত ও চীনের স্বার্থবাদী নীতির সমালোচনা করেন। আর রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান জিহাদ বা বিপ্লবের মাধ্যমে সম্ভব নয়, বরং কূটনৈতিকভাবেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তার সঙ্গে কথা বলেন আমাদের সময় ডট কমের প্রতিবেদক “জাকারিয়া হারুন”।

আমাদের সময় ডট কম : মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলিম গণহত্যার শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। প্রতিবেশি দেশ হিসাবে তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব কতটুকু?

ডক্টর মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসেন : তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আর প্রতিবেশী হিসেবে এ দায়িত্ব আমরা যথাযথভাবে পালন করছি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বিশেষভাবে আলেম সমাজের অবদান প্রশংসনীয়।

আমাদের সময় ডট কম : শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গারা কেমন আছে বলে আপনি মনে করেন?

ডক্টর মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসেন : তারা মানবেতর জীবন-যাপন করছে। কোন রকম জীবন নিয়ে তারা বেঁচে আছে। এটাকে জীবন বলে না। স্থায়ী বসবাসের জায়গা নেই, খাবারের তেমন ব্যবস্থা নেই। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গাদাগাদি করে তারা জীবন অতিবাহিত করছে।

আমাদের সময় ডট কম : রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ সহযোগিতাকে কীভাবে দেখছেন?

ডক্টর মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসেন : রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ সহযোগিতা এখন যেভাবে চলছে তা প্রশংসনীয়। তবে এ সহযোগিতা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তাই সুনির্দিষ্ট প্ল্যান করে রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করতে হবে। যেন তা দীর্ঘ মেয়াদি হয় এবং ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে। এ জন্য মুসলিম বিশ্বের কাছে এ বিষয়ে চুক্তি করা যেতে পারে। যেমন, তুরস্ক, মালায়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ অন্যন্যা দেশের কাছ থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্তান ও চিকিৎসার ব্যাপারে চুক্তি করতে হবে।

আমাদের সময় ডট কম : রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ বিষয়ে আলেম সমাজের ভূমিকাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

ডক্টর মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসেন : রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণে আলেম সমাজের ভূমিকা ঈর্ষণীয়। আলেম সমাজ সর্বাগ্রে রোহিঙ্গাদের সহযোগিতায় ঝাপিয়ে পরে। মানবতার সেবায় আলেম সমাজ সব সময়ই তৎপর। তারা নেপথ্যে থেকে অহর্ণিশ দেশের মানবতার সেবায় কাজ করে যাচ্ছে।

আমাদের সময় ডট কম : অনেকেই বলছেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে আমাদের দেশে বিপর্যয় ঘটতে পারে। এই বিষয়টাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

ডক্টর মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসেন : এ আশঙ্কা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। রোহিঙ্গারা যদি স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে বসবাস শুরু করে। তাহলে তারা অপকর্মে জড়ানোর সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ তারা দেশ ছেড়ে এসেছে। তারা রিক্তহস্ত। যদি ঠিক মতো তাদের মৌলিক চাহিদা না মেটে। তাহলে ধীরে ধীরে তারা অসামাজিক, অন্যায় কাজে জড়িয়ে পরার আশঙ্কা প্রবল।

আমাদের সময় ডট কম : এ সঙ্কট মোকাবেলায় বাংলাদেশ কী ধরণের উদ্যোগ নিতে পারে?

ডক্টর মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসেন : এ সঙ্কট মোকাবেলায় বাংলাদেশের উদ্যোগই হবে মূখ্য। বাংলাদেশের উপরই নির্ভর করছে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ। অবশ্য বাংলাদেশ এ সঙ্কট মোকাবেলায় উদ্যোগ নিয়েছে। বিশ্বের দরবারে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিভৎস নির্যাতনের কথা তুলে ধরতে হবে। মিয়ানমারের উপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

আমাদের সময় ডট কম : যুগ যুগ ধরে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের চলমান সহিংসতার কারণ কী হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

ডক্টর মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসেন : রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের চলমান সহিংসতার কারণ দুটি।

প্রথম. মিয়ানমারের বৌদ্ধরা মনে করে মিয়ানমার শুধুমাত্র বৌদ্ধদের রাষ্ট্র। এ জন্য তারা মনে করছে এক সময় রোহিঙ্গারা যেন রাখাইনে আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে। সে জন্য তাদের শুরু থেকেই নিশ্চহ্ন করে দিতে চাচ্ছে।

দ্বিতীয় . অর্থনৈতিক কারণে তারা রাখাইন রোহিঙ্গা শূণ্য করতে চাচ্ছে। চীন রাখাইন প্রদেশে ইকোনোমিক জোন করতে চাচ্ছে। এ লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের নিধন করছে।

আমাদের সময় ডট কম : ভারত-চীন চির প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে তারা সমস্বর !

ডক্টর মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসেন : রোহিঙ্গাদের বসবাসের জায়গাটি খোলা- মেলা হওয়ায় এবং নাফ নদীর তীরে হওয়ায় ভূরাজনৈতিকভাবে এর কদর অনেক বেশি। আগামীতে চীন হবে বিশ্বের সুপার পাওয়ার। তাই তারা চাচ্ছে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় তাদের আস্থানা গাড়তে। এ লক্ষ্যেই তারা এগিয়ে যাচ্ছে। যদি বঙ্গোপসাগরের মোহনায় তারা আস্তানা গাড়তে পারে তাহলে অত্র অঞ্চলে স্থায়ীভাবে তাদের আধিপত্য গড়ে উঠবে। আর ভারত ভাবছে, যদি মিয়ানমারে একচ্ছত্রভাবে চীনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়, তাহলে মিয়ানমার তাদের হাত ছাড়া হয়ে যাবে। তাই ভারতও মিয়ানমারের সঙ্গে সুর মিলাচ্ছে। ভারতেরও বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে।

আমাদের সময় ডট কম : চীন প্রকাশ্যে মিয়ানমারকে মদদ দেওয়ার কারণ কী?

ডক্টর মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসেন :  চীন প্রকাশ্যে মিয়ানমারকে মদদ দেওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। রাখাইন প্রদেশে চীনের অর্থনৈতিক, ভূরাজনৈতিক এবং মুসলিম বিদ্বেষ এর অন্যতম। কারণ চীনের অভ্যন্তরেও মুসলিমদের কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের উইঘুর মুসলিমদের ইসলামি শরীয়তের বিধান পালনে বাধা দেয়া হচ্ছে রাষ্ট্রীয়ভাবে। পবিত্র রমজানে চীনে উইঘুর মুসলিমদের জোর করে রোজা ভাঙ্গতে বাধ্য করা হয়। ঘরে কুরআন শরিফ রাখায় এবং নারীদের হিজাব পরিধানে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

আমাদের সময় ডট কম : ভারত ও চীন ইন্ধন দিচ্ছে রোহিঙ্গা নিধনে। তাহলে এ পরিস্থিতিতে বিশ্বকে কীভাবে পাশে পাবে বাংলাদেশ?

ডক্টর মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসেন : মিয়ানমার সরকার ভারত, চীন ও রাশিয়াকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছে। আমরা তা পারিনি। এখানে এ তিন দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। আর বিশ্বের পরাশক্তি শুধুমাত্র এ তিন দেশ নয়। বরং জাতিসংঘ ও আই সি, জার্মান, জাপান, ইতালি,যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের সহযোগিতায় মিয়ানমারের উপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে।

আমাদের সময় ডট কম : মুসলিবিশ্ব কী রোহিঙ্গা ইস্যুতে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করছে?

ডক্টর মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসেন : দু:খজনক হলো মুসলিম বিশ্ব রোহিঙ্গা ইস্যুতে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করেনি। যেভাবে ঝাপিয়ে পড়া দরকার ছিল মুসলিম বিশ্ব তা করেনি। এমনকি মুসলিম দেশগুলো তাদের সরকারী প্রতিনিধি পাঠায়নি। বরং সব দেশ নিজের চিন্তায় বিভোর। অবশ্য তুরস্ক,মালয়েশিয়া, ইন্দোনিশিয়া চেষ্টা করেছে।

আমাদের সময় ডট কম : সৌদি আরব,আর পাকিস্তানের মতো মুসলিম দেশ রোহিঙ্গা ইস্যুতে নীরবতা পালন করছে কেন?

ডক্টর মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসেন : সৌদি আরব রোহিঙ্গা ইস্যুতে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করছে না। কারণ তারা ইয়েমেনে হামলা করেছে। আবার কাতারকে বয়কট করে সৌদি আরব কিছুটা অস্বস্তিতে আছে। সব মিলিয়ে তারা রোহিঙ্গা ইস্যুতে তেমন ভূমিকা পালন করছে না।

আর পাকিস্তানে অন্তবর্তী সরকার। তাদের দেশে অভ্যন্তরীণ কোন্দল অনেক বেশি। আর বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন রয়েছে। পাকিস্তানে কিছু জঙ্গী বিমান তৈরী হচ্ছে চীনের সহযোগিতায়। সব মিলিয়ে পাকিস্তানও রোহিঙ্গা ইস্যুতে নীরবতা পালন করছে।

আমাদের সময় ডট কম : মিয়ানমার সরকার বলছে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক নয়। তাদের এ দাবীর বিষয়ে ইতিহাস কী বলে?

ডক্টর মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসেন : রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের স্থায়ী বাসিন্দা। তারা রাখাইনের ভূমিপুত্র। শত শত বছর ধরে রোহিঙ্গারা আছে মিয়ানমারের রাখাইনে। ইতিহাস বলে মিয়ানমার শাসক ইসলামি নামধারণ করতেন এবং মিয়ানমারের মুদ্রার পিঠে কালেমা খচিত ছিল। বার্মার স্বাধীনতা আন্দোলনে মুসলিম নেতা ছিল। তারা বার্মার স্বাধীনতায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেন।

আমাদের সময় ডট কম : রোহিঙ্গা মুসলিমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে না কেন?

ডক্টর মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসেন : রোহিঙ্গা মুসলিমদের পক্ষে মাথা তুলে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। কারণ রোহিঙ্গাদের মাঝে নেতৃত্ব দেয়ার মতো ব্যক্তিত্ব নেই। আর রোহিঙ্গাদের মাঝে শিক্ষিত মানুষ পাওয়া ভার। তাদের লেখা-পড়ায় প্রচুর বিধি নিষেধ। আর শিক্ষিত জনবল ছাড়া বিপ্লব সম্ভব নয়। তাদের মাঝে পারস্পরিক কোন্দল বেশি। আর তারা জিহাদ করেও টিকতে পারবে না। দাড়াঁনোর মতো তাদের পেছনে কেউ নেই। এখন যদি তারা জিহাদ বা বিপ্লবের জন্য দাঁড়ায় তাহলে তা হবে তাদের জন্য মারাত্মক হুমকি।

তবে এ কথাও সত্য, যখন কোন জাতি গোষ্ঠীকে সমূলে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়, তখন তারা প্রতিবাদ মুখর হয়ে ওঠে। যারা মা, বাবা, ভাই-বোন সবই হারিয়েছে উগ্র রাখাইন সেনাবাহিনীর হাতে তারা এক সময় প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠবেই। এটা ধ্রুব সত্য।

আমাদের সময় ডট কম : এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সঙ্কটের শেষ কোথায় বলে আপনি মনে করেন?

ডক্টর মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসেন : আপাতত রোহিঙ্গা সঙ্কটের শেষ কোথায় তা বুঝা যাচ্ছে না। ১৯৭২ সালের পর পৃথিবীতে যতো শরণার্থী যে দেশে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের আর নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ হয় নি। সুতরাং বাংলাদেশের একমাত্র পথ হচ্ছে কূটনৈতিক তৎপরতা। একমাত্র কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমেই রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়া সম্ভব। তাছাড়া বিকল্প কোন পথ দেখছি না।