ইটভাটায় বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ

ফারুক আলম : দেশের বিভিন্ন স্থানে ইটভাটার গড়ে উঠায় পরিবেশের ক্ষতির পাশাপাশি কৃষি জমির উর্বরতা কমে যাচ্ছে। অথচ পরিবেশ আইন অনুসারে, সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন বন, অভয়ারণ্য, বাগান বা জলাভূমি ও কৃষিজমিতে ইটভাটা তৈরি করা যাবে না। কিন্তু এসব নিয়মনীতি না মেনেই প্রায় ৯ হাজার ইটভাটার মধ্যে ৫ হাজার ইটভাটা পরিবেশগত ছাড়পত্র গড়ে উঠেছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, গাইবান্ধা জেলার বোনারপাড়া ইউনিয়নে কৃষি জমি দখল করে তৈরি করা হয়েছে ইটভাটা। এই ইটভাটার কালো ধোঁয়ার সবুজ রং হারিয়ে ইটভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়ার আস্তরণ জমেছে গাছের পাতায়। নষ্ট হচ্ছে আবাদি জমির ফল-ফসল। শুধু এই ইটভাটাই নয়, এ রকম হাজারও ইটভাটা গড়ে উঠেছে কৃষি জমির পাশে।

এক পরিসংখ্যানে, ২০১০ সাল থেকে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৮৮টি, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২৯টি এবং ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১৩৮টি অর্থাৎ মোট ৬৫৫টি ইটভাটাকে জরিমানা করেছে মোবাইল কোট।

এ বিষয়ে পরিবেশবাদীরা বলছেন, প্রায় ১৫শ ইটভাটা ড্রাম চিমনিবিশিষ্ট। সেখানে জ্বালানি হিসেবে কাঠ ও অতিরিক্তি মাত্রার সালফারযুক্ত কয়লা ব্যবহার হচ্ছে। কাঠ ব্যবহারের ফলে গাছের সংখ্যা কমছে। নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। পরিবেশ আইন অমান্য করে অভয়ারণ্য, কৃষি জমি ও আবাসিক এলাকায় রয়েছে ইটভাটা। ফলে পরিবেশগত বিপর্যয়সহ জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। ইটভাটার কালো ধোঁয়ার কারণে ফুসফুসের সমস্যা, শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগ হতে পারে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বয়স্ক ও শিশুরা। ইটভাটার ধোঁয়ায় নষ্ট হয় গাছের ফল ও পাখির আবাস।

এক লাখ ইট পোড়াতে ড্রাম চিমনির ইটভাটায় গড়ে প্রায় দুই হাজার মণ কাঠ লাগে। যদিও চিমনিবিশিষ্ট ভাটা ২০০১ সাল থেকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে সরকার। বেশির ভাগ ড্রাম চিমনিবিশিষ্ট ভাটা রয়েছে নদীর কাছে, উপকূল, পাহাড়ি ও বরেন্দ্র এলাকায়। জমির উপরিভাগের মাটিতে থাকে উর্বরতা শক্তি ও ফসল উৎপাদন ক্ষমতা। ফলে ইট তৈরিতে কৃষি জমির মাটি ব্যবহারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ফসলি জমি।

রাজশাহী পরিবেশ অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, রাজশাহী, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ইটভাটা রয়েছে ৮২৯টি। এর মধ্যে ১৭০টি ১২০ ফুট এবং ২৩৭টি ১৩০ ফুট উচ্চতার স্থায়ী চিমনির ইটভাটা। সর্বশেষ ঘোষণা অনুযায়ী স্থায়ী চিমনি ইটভাটার সবগুলোকেই অবৈধ বলছে পরিবেশ অধিদপ্তর। বাকি ৪১৫টি জিগজ্যাগ এবং সাতটি হফম্যান হাউব্রিড ইটভাটাকে বৈধ বলা হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অধিকাংশ ইটভাটা গড়ে উঠেছে লোকালয়ে। এমনকি একাধিক বিদ্যালয়ের আঙিনায়ও রয়েছে ইটভাটা। ফসলি জমি উজাড় করে নতুন নতুন ইটভাটা গড়ে উঠছে এ অঞ্চলে। ফসলহানির শিকার হচ্ছেন চাষীরা। স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তো রয়েছেই। কিন্তু অবৈধ এসব ইটভাটার বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পরিবেশ অধিদপ্তর।

ইটভাটা প্রসঙ্গে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ আমাদের সময় ডটকমকে বলেন, অনুমোদন, গবেষণা ও পরিবেশের বিধি-বিধান ছাড়া দেশে ৯০ ভাগ ইটভাটা তৈরি করা হয়েছে। এতে আবাদি জমি, পানি, প্রাণ বৈচিত্র্যের সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে।

তিনি বলেন, দেশের কোথায় ইটভাটা তৈরি হচ্ছে এটি মনিটরিং করার জন্য কোন কর্তৃপক্ষ আছে বলে মনে হয় না। বিষয়টি নিয়ে সরকারের কোন মনোযোগ নেই। মালিকরা ইচ্ছামত কৃষিতে ইটভাটা গড়ে তোলেন।

অবৈধ ইটভাটা তৈরিতে মোবাইল কোটের জরিমানার বিষয়ে আনু মোহাম্মদ বলেন, এতে হয়তো ইটভাটা মালিকের কিছু আর্থিক ক্ষতি হবে। এরপরে আবারও সেই ইটভাটা চালবে। ইটভাটার কালো ধোঁয়া থেকে পরিবেশের রক্ষার্থে আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে সরকারকে কিছু পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। এসব পরামর্শ বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ইটভাটা মালিকদের সদিচ্ছার অভাব বলে মনে করেন তিনি।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সাধারণ সম্পাদক আবদুস সোবহান বলেন, এখনও প্রায় ১২শ ইটাভাটায় সরাসরি গাছ পোড়ানো হচ্ছে। ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহারে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ২০০১ সালে ড্রাম চিমনিবিশিষ্ট ইটভাটা নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও কিভাবে তা টিকে আছে, সেই প্রশ্ন আমরাও।