এত দ্বিধা কেন?

আমাদের সময়.কম
প্রকাশের সময় : 12/10/2017 -0:08
আপডেট সময় : 12/10/ 2017-0:08

গোলাম মোর্তোজা : ইতিহাসের দিকে যাবো না। রোহিঙ্গা ইস্যুতে সাম্প্রতিক বাংলাদেশের উদ্যোগ বা কার্যক্রমগুলো বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করবো। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক। মিয়ানমার তাদের বিতাড়িত করে বাংলাদেশে পাঠায় অনেক বছর ধরে। এবার বিতাড়নের সঙ্গে ‘জাতিগত নিধন’ এবং ‘গণহত্যা’ শব্দ দুটি যোগ হয়েছে। প্রায় ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এখন বাংলাদেশে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ যা করছে, তা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পরিপূর্ণ। আরও সরাসরি বললে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের নীতি কী, তা একেবারেই পরিষ্কার নয়। কেন একথা বলছি, বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করি।
১. গত ২ অক্টোবর অং সান সু চি’র দফতরের একজন মন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশে দুই মন্ত্রী পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, পররাষ্ট্র সচিব আলোচনায় বসেছিলেন। মিয়ানমার সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সু চি’র নিজেরই গুরুত্ব খুব কম। সু চি’র দফতরের এই মন্ত্রীর বাহক ছাড়া আর কোনও গুরুত্ব নেই। সেই মন্ত্রীকে বাংলাদেশ কেন এতটা গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করলো, সেটা একটা বড় প্রশ্ন।
সেই আলোচনা থেকে বের হয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে চেয়েছে। বাংলাদেশের গণমাধ্যমে তা ফলাও করে প্রচার হলো।

বাংলাদেশ মিয়ানমারকে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির একটি খসড়া হস্তান্তর করেছে, তাও জানালেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। মিয়ানমারের মন্ত্রী ঢাকায় কোনও কথা বললেন না। ফিরে গেলেন তিনি।

মিয়ানমার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানালো, ঢাকার আলোচনায় মিয়ানমার ১৯৯২ সালের চুক্তির আলোকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে। ‘আরসা’কে মিয়ানমার-বাংলাদেশ উভয়েই ‘কমন শত্রু’ মনে করে।

মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ‘ফেরত নিতে চেয়েছে’ আর ‘১৯৯২ সালের’ চুক্তির আলোকে ফেরত নিতে চেয়েছে- খুব বড় অর্থে ভিন্ন অর্থ বহন করে। ১৯৯২ সালের চুক্তির আলোকে ফেরত নেবে মানে, যাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্বের কাগজপত্র আছে যাচাই করে তাদের ফেরত নেবে, তাও যারা স্বেচ্ছায় যেতে চাইবে।

১৯৮২ সালে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বাতিল করার পর ‘নাগরিকত্বের কার্ড’ দেওয়া শুরু করেছিল মিয়ানমার সরকার। ৫ বা সাড়ে ৫ হাজার রোহিঙ্গাদের ‘নাগরিকত্বের কার্ড’ দেওয়ার পর তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া দশ বারো লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে ‘মিয়ানমারের নাগরিক’ এই প্রমাণ থাকতে পারে সর্বোচ্চ সাড়ে ৫ হাজার রোহিঙ্গার কাছে।

মিয়ানমার সরকার আলোচনায় এই সাড়ে ৫ হাজার রোহিঙ্গা ফেরত নিতে চেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ বলেছে, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে চেয়েছে। অর্থাৎ মিয়ানমার দশ লাখ রোহিঙ্গা সবাইকে ফেরত নেবে। যা মিয়ানমার বলেনি।

২. ১০ অক্টোবর ঢাকায় একটি সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমার কৌশলের আশ্রয় নিতে পারে।’

মিয়ানমার যে ‘কৌশলের আশ্রয়’ নিতে পারে, এটা বুঝতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ৮ দিন লেগে গেলো! ‘মিয়ানামর রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে’- আলোচনার পর একথা বললেন কেন? মিয়ানমার তো সম্মত হয়নি। বাংলাদেশের মানুষকে, সারা পৃথিবীর মানুষকে, যা আলোচনা হয়নি তা জানালেন কেন? ‘আরসা’কে কমন শত্রু মনে করছে বাংলাদেশ, সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য চেপে গেলেন কেন?

৩. মিয়ানমারকে একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির খসড়া দিয়েছেন, আজকে পর্যন্ত সে বিষয়ে একটি কথাও বলেনি। এখন বলছেন, এটা দ্বিপাক্ষিক নয়, আঞ্চলিক সমস্যা। আসলে রোহিঙ্গা সংকট দ্বিপাক্ষিক তো নয়ই, আঞ্চলিকও নয়- এখন এটা আন্তর্জাতিক সমস্যা। একথা বলতে দ্বিধা কেন? ‘মিয়ানমার কৌশলের আশ্রয় নিতে পারে’ অনেক দেরিতে তা বোঝার পরও, দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় আপনাদের এত আগ্রহ কেন? খসড়া চুক্তির বিষয়ে কোনও কিছু বলল না, তো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়ানমার যাবেন কেন? পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আপনি মিয়ানমার যাবেন কেন?

৪. চীনের অবস্থান মিয়ানমারের পক্ষে, তা খুবই পরিষ্কার। কিছু ত্রাণ দেখিয়ে কেন বাংলাদেশের মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে, চীন পাশে আছে? ভারত রোহিঙ্গা ইস্যুতে কতটা কী করবে, তা খুব পরিষ্কার করে বলেছে। বর্তমান ও সাবেক ভারতীয় কূটনীতিকরা পরিষ্কার করে বলেছেন, ভারত এর চেয়ে বেশি কিছু করবে না। দিল্লিতে ভারত-ইইউ সামিট থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার জন্যে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। চীনও বাংলাদেশকে বলেছে, মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করতে। রাশিয়া তো এটাকে বড় সংকট মনেই করে না। এসবের কোনও কিছুই গোপন নয়। তারপরও আপনারা প্রতিদিন কেন বলেন যে, রাশিয়া-চীন-ভারত আমাদের পাশে আছে?

৫. সত্যিকার অর্থে রোহিঙ্গা ইস্যুতে অত্যন্ত শক্ত অবস্থান নিয়েছে আমেরিকা, ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। আমেরিকা মিয়ানমারের জেনারেলদের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিচারের মুখোমুখি করার কথা বলেছে। ব্রিটেন সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়টি স্থগিত করেছে। আমেরিকা, ইইউ অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধের কথা ভাবছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ কী করছে? ‘আমেরিকার সহায়তা প্রত্যাশা করি না’- এই অবস্থান বা বক্তব্য বিষয়ে বাংলাদেশের এখনকার অবস্থান বা বক্তব্য কী, তা পরিষ্কার করা হচ্ছে না কেন?

বাংলাদেশ রাশিয়া-চীন-ভারতের চাপ, বুদ্ধি বা পরামর্শে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় উদগ্রীব হয়ে উঠেছে। আমেরিকা, ইউরোপ, ব্রিটেনের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ তৈরিতে বাংলাদেশের কোনও উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। কেন?

যেখানে যা কিছু ঘটছে, কৃতিত্ব নিতে চাইছেন ‘আমরাই করেছি’ বলে। আমেরিকা, ব্রিটেন বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে জোরালো আলোচনার উদ্যোগ নিয়ে, তাদের চাপ কাজে লাগিয়ে মিয়ানমারকে কোণঠাসা করার কোনও উদ্যোগ আপনাদের নিতে দেখা যাচ্ছে না।

৬. চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’র অংশ ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিসিআইএম)’। বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর। চীনের ২২ বিলিয়ন ডলারের ২ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই কর্মযজ্ঞের সঙ্গে ভারত থাকবে না। ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ অর্থনৈতিক করিডোর পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে থাকা কাশ্মিরের ওপর দিয়ে যাবে। এই অভিযোগে ভারত বিসিআইএম’র সঙ্গে থাকবে না। ভারত চায় বাংলাদেশও না থাকুক। সম্প্রতি দিল্লিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশ বিসিআইএম’র সঙ্গে থাকবে। ভারত এতে খুশি না।

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কেন ভারতের সঙ্গে এমন মতবিরোধে গেলো? এর সঙ্গে কি রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের যে অবস্থান তা যেহেতু বাংলাদেশের পক্ষে নয়, তার কারণেই এমন অবস্থান?

সম্ভবত এর চেয়েও বড় কারণ বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভারতের যে অবস্থান ছিল, আগামী নির্বাচনেও ভারতের তেমন অবস্থান প্রত্যাশা করে বাংলাদেশ। মূলত দর কষাকষিটা সে কারণেই।

৭. বাংলাদেশ যেদিন ঢাকায় মিয়ানমারের সু চি’র দফতরের মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছে, সেদিনও রোহিঙ্গা গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেদিনও ৪০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে। ঢাকায় যখন আলোচনা চলছিল, মিয়ানমার সেনাবাহিনী ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে সীমান্তে উস্কানি দেওয়া অব্যাহত রেখেছিল। আকাশ সীমা লঙ্ঘনসহ এসব বিষয় মৃদুভাবে বাংলাদেশ আলোচনায় এনেছিল। মিয়ানমারের মন্ত্রী জবাব না দিয়ে চুপ থেকেছেন। বাংলাদেশ জোরালোভাবে আলোচনা করতে পারেনি। কেন পারেনি? প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশের কর্তারা বলেন, আপনারা কি যুদ্ধ করতে বলেন?

মাননীয়গণ বিষয়টি যুদ্ধ করার নয়। দক্ষতা এবং সক্ষমতার সঙ্গে আলোচনা করতে পারার যোগ্যতার কথা বলছি। যা আপনারা করতে পারছেন না। দ্বিধা-দ্বন্দ্বের নীতি নিয়ে তা করা যায় না।

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক। বাংলাট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ নিউজ

২০ মাসেও প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন মেলেনি, ২০ হাজার কর্মচারীর পেনশন স্থগিত

হুমায়ুন কবির খোকন : অর্থবিভাগ হতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো প্রস্তাব... বিস্তারিত

বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন দেশীয় উদ্যোক্তারা

হাসান আরিফ: বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক মানে পৌঁছে... বিস্তারিত

আয়ারল্যান্ডে হারিকেন ঝড় অফেলিয়ায় নিহত ৩

আহমেদ সুমন : ব্রিটিশ দীপপুঞ্জে আঘাত হেনেছে হারিকেন অফেলিয়া। এতে... বিস্তারিত

ভারতীয়দের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য চলে যাচ্ছে পাকিস্তানে!

আশিস গুপ্ত, নয়াদিল্লি : সরকার যতই বলুক না কেন, নাগরিকদের... বিস্তারিত

বেশি দিন নাই, ভারতের নামই বদলে দেবে বিজেপি : মমতা

পরাগ মাঝি : ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতা সঙ্গীত সোম তাজমহলকে... বিস্তারিত

উত্তরায় ২৫০ অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ

নুরুল আমিন হাসান: রাজধানীর উত্তরার হাউজ বিল্ডিং থেকে সোনারগাঁও জনপদ রোডের ১২৭ নং... বিস্তারিত





আজকের আরো সর্বশেষ সংবাদ

Privacy Policy

credit amadershomoy
Chief Editor : Nayeemul Islam Khan, Editor : Nasima Khan Monty
Executive Editor : Rashid Riaz,
Office : 19/3 Bir Uttam Kazi Nuruzzaman Road.
West Panthapath (East side of Square Hospital), Dhaka-1205, Bangladesh.
Phone : 09617175101,9128391 (Advertisement ):01713067929,01712158807
Email : [email protected], [email protected]
Send any Assignment at this address : [email protected]