একান্ত সাক্ষাৎকারে ড. দিলারা চৌধুরী
রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে সাধারণ আচরণে কিছু হবে না, শক্ত অবস্থান নিতে হবে

মোহাম্মদ আবদুল অদুদ: বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সমস্যা সঙ্কটে পরিণত হয়েছে। এখন মিয়ানমার যদি রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন বন্ধ না করে তাহলে সমস্ত রোহিঙ্গা এখানে চলে আসবে। যেটা হবে আমাদের দেশের অস্তিত্বের প্রশ্নে হুমকি এবং তখন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে, শুরু হবে অস্থিতিশীলতা। এটার সর্বপ্রথম ভিক্টিম কিন্তু হবো আমরাই। তাই বাংলাদেশের একটা শক্ত অবস্থান নেওয়া উচিত।

তিনি বলেন, সবসময় নরম হলে চলে না, ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্স এ আমরা যেটাকে বলি রিয়েল পলিটিক্স, যেটা হলো বাস্তবতার পলিটিক্স, বাস্তবতার পলিটিক্স এ কিন্তু আপনি যতই মানবতার কথা বলেন না কেন, একটু গরম না হলে পরে তা গুরুত্ব পায় না। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত বলছে যে, মিয়ানমার নাকি আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে সাধারণ আচরণে কিছু হবে না। কারণ, ওরা তো এখনো জালাও-পোড়াও করছে, এখনো রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিচ্ছে। একটা শক্ত অবস্থান নিতে হবে যে, তোমরা যদি নির্যাতন বন্ধ না করো, তাহলে আমরা যেকোনো কনসিকুয়েন্সির দিকে যেতে পারি। যার কারণ, আমরা তো মরেই যাচ্ছি। এরকম একটা স্ট্যান্ড তো নিতে হবে বাংলাদেশকে।

তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘ এবং বিশ্বসম্প্রদায় আমাদের জন্য বড়জোড় ত্রাণ সহায়তা দিবে এবং তা দিচ্ছে, টাকাপয়সা দিবে, খাওয়ানোর বন্দোবস্ত করবে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনসহ সব সংস্থাগুলো এখানে চলে আসবে। কিন্তু তারা মিয়ানমারকে থামাতে পারবে না। থামাতে পারত চীন আর ভারত, যারা কিছু করছে না। রাশিয়ার কথা আমি বলব না। কারণ, রাশিয়াকে কোনোদিন আমার বাংলাদেশের বন্ধু মনে হয়নি। আর ’৭১ এ যে বন্ধু হয়েছিল সেটাও ভারতের বন্ধু ছিল বলে। আমরা পাকিস্তানের অংশ ছিলাম তো, সেজন্যে আমাদের সাথে সেরকম কোনো সম্পর্ক ছিল না। এখন রাশিয়া আমাদের জন্য কিছু করবে, তা আশা করি না। আশা করেছিলাম, ভারত এবং চীন সহযোগিতা করবে কিন্তু তারা সেটা করছে না। কারণে আমরা এমন একটা দুর্বল অবস্থানে আছি যে, এতে তাদের স্বার্থে কোনো আঘাত লাগবে না। আঘাতটা লাগবে আমাদের স্বার্থে, আমাদের অস্তিত্ব নিয়ে সমস্যা হবে। এটা বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থাকে একেবারে ভীষণ এক সংকটের মুখে ফেলবে। সেজন্য এখন একটা শক্ত অবস্থান দরকার।

শান্তিপ্রিয় বিশ্বসম্প্রদায়কে মিয়ানমারের জালাও-পোড়াও, হত্যা-নির্যাতন বন্ধ থামাতে বলতে হবে। তারা যদি এখনো এভাবে রোহিঙ্গাদের পাঠিয়ে দেয় তাহলে ফেরত নেওয়ার নাটকটা কেন করলেন? এটা মিয়ানমারের একটা চাল, তারা ভীষর্ণ ধূর্ত। সম্পূর্ণভাবে তারা কিন্তু খুব নিষ্ঠুর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কিন্তু জাপানিদের পক্ষ নিয়ে তারা প্রচুর নিষ্ঠুরতা করেছে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আমরা যদি একটা শক্ত অবস্থান না নিই, তাহলে মিয়ানমার ওখান থেকে সবাইকে পাঠিয়ে দিবে। আর কোনোদিন ফেরত নিবে না। নিলেও ১৪ হাজার, ১৫ হাজার বা ২০ হাজার এরকম নেবে। সাংবাদিকদেরও জনমত গঠন করতে সাহায্য করা উচিত, যাতে করে আমাদের জনগণ বুঝতে পারে যে, জনগণেরও একটা স্ট্যান্ড নিতে হবে বা নেওয়া উচিত। তিনি বলেন, প্রথমদিকে কোনো প্রস্তুতি ছিল না বাংলাদেশের। এখন এটা হয়তো পলিটিক্স এর কারণে বলা হচ্ছে। বাংলাদেশের যদি প্রস্তুতি থাকত তাহলে ২০১৫ সালে মিয়ানমারের সাথে চুক্তিতে স্বাক্ষর করত না বাংলাদেশ যে, আমরা তাদের বাঙালিও বলব না, রোহিঙ্গাও বলব না। কেন আমরা রোহিঙ্গা বলব না? তারা তো ওখানে ৩০০ বছর যাবৎ রোহিঙ্গা নামে পরিচিত। সব বিষয় মাথায় রেখে আমাদের সামনের দিকে এগোতে হবে।
সম্পাদনা : আশিক রহমান