পুরান ঢাকার খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদের রহস্য

ফারুক আলম: ঢাকার ইতিহাস ৪০০ বছরের পুরনো। প্রাচীন এ শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য মসজিদ। তাই ঢাকাকে একসময় বলা হতো মসজিদের শহর। মসজিদ নির্মাণের মাধ্যমেই বিকাশ ঘটে এ শহরের স্থাপত্যশিল্পের। সপ্তদশ শতাব্দীতে ঢাকা ছিল মুঘলদের রাজধানী। সেই সময় এ শহর ‘জাহাঙ্গীরনগর’ নামে পরচিতি ছিল। বর্তমানে সেই ঢাকা দু’ভাগে বিভক্ত একটি পুরোন অন্যটি নতুন। এই পুরোন ঢাকা জুড়েই রয়েছে শত বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য। রয়েছে হাজারও গল্প-কাহিনী। এসব গল্প-কাহিনীর মধ্যে একটি হচ্ছে খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদ। শত বছর ধরে ঐতিহ্যবহন করে আসছে এ মসজিদ। এমনকি মসজিদটি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে রহস্যের বার্তা। রহস্য থেকেই মসজিদে দেড় হাত খোঁড়া হয়েছিল সেখানে ছাঁই মাটি পাওয়া যায়। এরপর আর খোঁড়া হয়নি। মসজিদটি ঘিরে রহস্যের বার্তা আজও উদঘাটন করতে পারেনি এলাকাবাসী।

খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদ দেখতে দোতলা হলেও নিচ তলায় নামাজ পড়ার ব্যবস্থা নেই। নিচ তলাকে কেন্দ্র করেই যত রহস্যের জাল। মসজিদটির পুরো নিচ তলা বাউন্ডরি ঘেরা। নিচ তলায় কী রয়েছে রহস্যটি উদঘাটনের জন্য স্থানীয়রা খোঁড়ার চেষ্টা করেছিল কিন্তু পারেনি। এর মধ্যেই মসজিদটি বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে চলে যায়। মসজিদের চারপাশে রয়েছে ২৭টি ছোট ছোট কক্ষ। ধারণা করা হচ্ছে এসব কক্ষতে মাদ্রাসার ছাত্ররা আবাসিক হিসেবে থাকতেন। এখন কক্ষগুলো ফাঁক পরে আছে। মসজিদের সামনে রয়েছে সবুজ মাঠ আর মাঠের কোণায় রয়েছে কয়েকটি নারকেল গাছ।

লালবাগ কেল্লার আধা কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত এই মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল ১৭০৪-০৫ খ্রিস্টাব্দে। মসজিদে পাওয়া দুটি ফার্সি অনুলিপি অনুযায়ী খান মোহাম্মদ মৃধা নামক জনৈক ব্যক্তি মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। প্রতিদিন ঢাকা ও এর আশপাশ এলাকার শতশত দর্শনার্থী এটির সৌন্দর্য অবলোকন করে মুগ্ধ হন। প্রতি ওয়াক্তেই এখানে প্রায় শতাধিক নামাজি নামাজে অংশগ্রহণ করেন।

পুরান ঢাকার এসব গল্প-কাহিনী, ইতিহাস-ঐতিহ্যবাহী দেখা এবং শোনার আগ্রহ থেকেই সম্প্রতি কয়েক বার পুরোন ঢাকায় আড্ডা দেয়ার সুযোগ হয়েছে। সুযোগ হয়েছে কিছু গল্প-কাহিনী শোনার। কয়েকটি গল্প-কাহিনীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রর্ষণীয় ছিল পুরোন ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মসজিদ। বর্তমানে পুরনো ঢাকায় লালবাগ কেল্লার মতই ইতিহাস ও ঐতিহ্যবহন করে চলছে এখানকার মসজিদগুলো।

খান মৃধা মসজিদ সম্পর্কে গল্প রয়েছে মসজিদের ভেতরে ভাল জিন থাকে। আর মসজিদের বাইরে খারাপ জিন থাকে। ভাল জিন মানুষের মত এ সমজিদের নামাজ পড়ে, ঘোরাঘুরি করে। খারাপ জিন মসজিদের আশেপাশে শেয়াল, কুকুর কিংবা সাপ হয়ে চলাফেরা করে। ভাল জিন স্থানীয়দের ভয় না দেখালেও খারাপ জিন ভয় দেখায়। জিন মানুষকে দেখা মাত্রই চোখের আড়াল হয়ে যায়।

খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদ সম্পর্কে মসজিদটির দায়িত্বে থাকা মোয়াজ্জেম শহিদ বলেন, হক সাহেক (মোয়াজ্জেম) ৩৫ বছর মসজিদের কমিটির দায়িত্বে ছিলেন। তিনি একা একা মসজিদের দক্ষিণপাশে ইতেকাফ-এ বসেছিলেন। সেখান থেকে জিন মসজিদের উত্তর কোণায় নিয়ে এসেছেন তাকে। মসজিদের ভেতরে দক্ষিণ কোণায় একা একা কেউ বসে থাকলে জিন এমন কাজ করে। অর্থাৎ মসজিদের দক্ষিণ কোণায় জিনের আস্তানা। রাতে মসজিদের ভেতরে ফিসফাস আওয়াজ, দরজা খোলার শব্দ এমনকি সাদা-কাপড় পড়ে রুমাল মাথায় দিয়ে নামাজ পড়েন।

খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদে এই প্রতিবেদক

গরমের দিন একজন মুসল্লি দিনের বেলায় নামাজ পড়ে মসজিদের দক্ষিণ দিকে বিশ্রামের জন্য কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল তখন তার বুকের উপর জিন চাপ দিয়েছে। তখনি ঘুম থেকে উঠে দৌঁড় দেন। মোয়াজ্জেম শহিদ কাউকে জিনে আছর করছে তা ছাড়িয়ে দেন। তিনি নিজেও একদিন দিনের বেলায় খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদের ভেতরে ঘুমিয়ে ছিলেন, তখন হঠাৎ জিন এসে গলা টিপে ধরেন।

মোয়াজ্জেম শহিদ গল্পের মাঝেই বলেন আমরা যা বলছি তারা (জিন) সব শুনছে। এমন দেখা গেছে কোরআন শরিফ পড়তে পারে না কিন্তু তাকে জিন আছর করায় দ্রুত কোরআন পড়ছে।

মৃধা মসজিদের অবকাঠামোর কোন পরিবর্তন করা হয়নি। তবে প্রত্যেক বছর মসজিদে রং করা হয়। মসজিদের তিনটি দরজা রয়েছে। তিন দরজার মধ্যে দক্ষিণ দিকে বরাবর।

খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদটি সংরক্ষণের জন্য প্রত্নতত্ব বিভাগের একটি নোটিশ বোর্ড টাঙ্গানো হয়েছে। বোর্ডটিতে লেখা হয়েছে- কোন ব্যক্তি এই পুরাকীর্তির কোন রকম ধ্বংস বা অনিষ্ট সাধন করলে বা এর কোন বিকৃতি বা অঙ্গচ্ছেদ ঘটলে বা এর কোন অংশের উপর কিছু লিখলে বা খোদাই করলে বা কোন চিহ্ন বা দাগ কাটলে, ১৯৬৮ সালের ১৪ নং পুরাকীর্তি আইনের ১৯ ধারা অধীনে তিনি সর্বাধিক এক বৎসর পর্যন্ত জেল বা জরিমানা অথবা উভয় প্রকার দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।