রোহিঙ্গা নির্যাতনকে জাতিসংঘের কর্মকর্তাই ধামাচাপা দিচ্ছেন!

আনোয়ারুল করিম: মিয়ানমারে নিয়োজিত জাতিসংঘের কর্মকর্তারা সেদেশে রোহিঙ্গা নিপীড়নের ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। খোদ জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ সূত্র ও মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংগঠনগুলোর বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সেই অভিযোগ সামনে উঠে এসেছে।

প্রশ্ন উঠেছে- জাতিসংঘের ব্যর্থতার কারণেই কী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষের আজ এই পরিণতি? অবশ্য, জাতিসংঘের মিয়ানমার কার্যালয় বিবিসিতে প্রকাশিত সেই অভিযোগ ‘দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান’ করেছে।

বিবিসির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারের জাতিসংঘ কার্যালয়ের প্রধান রেনেটা লক ডেসালিয়েন চাননি মানবাধিকার সংগঠনগুলো সংকটপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করুক। স্পর্শকাতর রোহিঙ্গা এলাকায় মানবাধিকার কর্মীদের প্রবেশ প্রতিহত করেছেন তিনি।

বিবিসির জোনাহ ফিশারের তৈরি করা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারে সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের ওপর দমন-পীড়নের শুরু থেকেই এর বিরুদ্ধে সরব রয়েছে জাতিসংঘ। রোহিঙ্গাদের জন্য সংস্থাটি সহায়তা পাঠিয়েছে, কঠোরভাবে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের নিন্দা জানিয়েছে। তবে জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ সূত্র এবং মিয়ানমারের ভেতরের ও বাইরের মানবাধিকারকর্মীদের দাবি, বর্তমান সংকট শুরু হওয়ার চার বছর আগে থেকেই কানাডীয় নাগরিক রেনেটা লক ডেসালিয়েন বিভিন্নভাবে রোহিঙ্গা এলাকা পরিদর্শনে বাধা দিয়েছেন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে সোচ্চারমূলক প্রচারণা কাজে বাধা দিয়েছেন। তাছাড়া যেসব কর্মকর্তা সতর্ক করতে চেয়েছেন যে, এভাবে চলতে থাকলে জাতিগত নিধন অনিবার্য, তাদেরকেও তিনি বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন। এ ব্যাপারে ডেসালিয়েনের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি রাজি হননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ক্যারোলিন ভ্যান্ডিনাবিলি নামের এক ত্রাণ কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, মিয়ানমারে ভয়াবহ পরিস্থিতি আসন্ন বলে তিনি আগেই টের পেয়েছিলেন। ১৯৯৩ সালের শেষ থেকে ১৯৯৪ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত তিনি রুয়ান্ডায় থেকেছেন এবং গণহত্যার নজির দেখেছেন। মিয়ানমারে দায়িত্ব পালন করতে আসার পর দুই দেশের পরিস্থিতির মধ্যে মিল খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি।

“কয়েকজন বিদেশি ও বার্মিজ ব্যবসায়ীদের একটি দলের সঙ্গে রাখাইন ও রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে কথা বলছিলাম। তখন এক বার্মিজ ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমাদের উচিত ওদেরকে মেরে ফেলা, কারণ ওরা কুকুরের মতো’।’ মানবতার প্রতি এমন অমানবিকতা দেখে আমার মনে একটি আশঙ্কাই তৈরি হলো যে এ সমাজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একে স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছে।”

বিবিসির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাখাইনে ২০১২ সালের সহিংসতার পর সেখানকার বৌদ্ধরা এতটাই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে যে, কোনও ধরনের ত্রাণ বা মানবিক সহায়তা পৌঁছাতেও বাধা দেয়া হয়। এমনকি ত্রাণবাহী যানবাহনে হামলাও চালানো হয়। আর রোহিঙ্গা ইস্যুতে কথা বললে বৌদ্ধরা ক্ষেপে যাবেন এমন আশঙ্কায় জাতিসংঘের দায়িত্বরত কর্মকর্তারা এ নিয়ে কথা বলতেন না। এমন অবস্থায় জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রাখাইনে দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ করে। তারা মনে করেন, রাখাইনকে যদি সমৃদ্ধি আনা যায় তাহলে সেখানকার রোহিঙ্গা ও বৌদ্ধদের মধ্যে উত্তেজনা কমতে পারে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, জাতিসংঘ এমন অনেক প্রেস রিলিজ দিয়েছে যেখানে রোহিঙ্গাদের মূল সমস্যার কথা উল্লেখই করা হয়নি। আর মিয়ানমার সরকার তো তাদের রোহিঙ্গা কিংবা স্বতন্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকারই করে না। এর পরিবর্তে সরকার তাদের ‘বাঙালি’ বলে চিহ্নিত করে।

বিবিসির প্রতিবেদক জানান, মিয়ানমারে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন, কিন্তু জাতিসংঘের কোনও প্রতিনিধিকে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে মুখ খুলতে দেখেননি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের অনেক সমস্যার কথাই ফাইলবন্দি করে রাখা হতো।

মিয়ানমারে ত্রাণ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত এমন একাধিক সূত্র বিবিসিকে বলেছেন, দেশটিতে জাতিসংঘের শীর্ষ পর্যায়ের যে বৈঠক হতো সেখানে দেশটির কর্তৃপক্ষের কাছে রোহিঙ্গাদের অধিকার দেওয়ার প্রস্তাব উত্থাপনও একপ্রকার অসম্ভব ছিল। এদিকে বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে আসা এইসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের ইয়াঙ্গুন (সাবেক রাজধানী) ভিত্তিক অফিসের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আমরা শক্তভাবে এইসব অভিযোগের বিরোধিতা করছি।’

একটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে বিবিসি জানায়, জাতিসংঘ রোহিঙ্গা ইস্যুতে কী ভূমিকা রেখেছে তা জানার জন্য সংস্থাটি একটি তদন্ত শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের অবসানের পর জাতিসংঘ যে তদন্ত করেছিল এটিও তার চেয়ে বেশি কিছু হবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ওই প্রতিবেদনে সংস্থাটি শ্রীরঙ্কায় নিজেদের ভূমিকাকে ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল।