নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে রয়েছে দেশপ্রেম।(ভিডিও)

সামস তাব্রীজ: রোহিঙ্গা আদিবাসী জনগোষ্ঠী পশ্চিম মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি উলেখযোগ্য নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। এরা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত। রোহিঙ্গাদের আলাদা ভাষা থাকলেও তা অলিখিত। যারা নিজ দেশেই পরবাসী। যে দেশ তাদের নাগরিক হিসেবেই স্বীকার করে না সরকার। যেখানে ভালভাবে বেঁচে থাকার নেই কোনো নিশ্চয়তা। প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর ভয়। তবুও নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে রয়েছে দেশপ্রেম। ভালোবাসে নিজের মাটিকে। ফিরে যেতে চায় নিজের জন্মভূমিতে।

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা নুরুল আলম (৫০) এর সঙ্গে কথা হলে। তিনি এত নির্যাতনের পরেও সুযোগ থাকলে ফিরে যেতে চান নিজ দেশে। তাকিয়ে আছেন বিশ্ব দরবার দিকে। বিশ্বাস করেন, অন্য দেশগুলোর হস্তক্ষেপে একদিন পরিস্থিতি ঠিক হবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে ছেলের সঙ্গে রয়েছেন নুরুল আলম। তার ছেলে সফি আল (১৮) গুলি ও বোমায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভর্তি হন।
নুরুল আলম বলেন তাদের দুঃখ-কষ্টের কথা, যে দেশ তাদের নাগরিক হিসেবেই স্বীকার করে না সেই দেশ সম্পর্কে তার অনুভূতির কথা।
নুরুল আলমের বাড়ি রাখাইন রাজ্যের মংডুর এতালিয়ার হরিতলা গ্রামে। সেখানে এই রোহিঙ্গা মানুষটির ২০ বিঘা জমি ছিল। গোলাভরা ধান চাল ছিল। কিন্তু মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর দেয়া আগুনে সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কোনো রকম ছেলেকে নিয়ে পালিয়ে এসেছেন বাংলাদেশে।
নুরুল আলম বলেন, ‘আমাদের দেশে এমন জুলুমের মধ্যে আমরা কেমন করে যাবো? শান্তি ফিরে না পেলে আমরা যাবোই বা কেমন করে! আরাকানই আমাদের দেশ, দেশের জন্য আমাদের মায়া লাগে। তোমরা মুসলমান ভাই বলে এখানে এসেছি। মুসলমান জাতি ভাইদের বলছি, তোমরা যদি আমাদের বিচার করে দাও তবে আমরা আবার দেশে ফিরে যেতে চাই।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমার জমি আছে ২০ বিঘা, গরু, ছাগল, সবকিছুতে ভরপুর ছিল। আগুনে গোলার চাউল তিন দিন পুড়েছে, কিছু আনতে পারিনি। যখন ছেলেটা গুলি খেয়েছে, ছেলেটাকে নিয়ে দৌড়ে আরেক পাড়ায় চলে গেছি। ছেলেটাকে পেলে আবার গুলি মারবে বলেছে, একথা শুনে আমরা সরে গেছি। পরে আমাদের ঘর-দুয়ার সব পুড়িয়ে দিয়েছে।’
গেলো ২৫ আগস্ট রাখাইনে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর এখন পর্যন্ত প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। রাখাইনে পুলিশের ৩০টি তল্লাশি চৌকি ও একটি সেনাক্যাম্পে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলায় ১২ পুলিশ নিহত হওয়ার পর ওই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
এর আগে গেলো বছরের ৯ অক্টোবরের পর থেকে মিয়ানমারের আরকান রাজ্যে একইভাবে হামলার ঘটনা ঘটে। এসময় প্রাণ ভয়ে পালিয়ে আসে প্রায় ৭০ হাজার রোহিঙ্গা। এরপর আন্তর্জাতিক মহল নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে মিয়ানমার সরকারের ওপর। কিন্তু এর কোনো তোয়াক্কা না করে আরকানে ফের সেনা মোতায়েন করে নির্যাতন শুরু করে তারা।
এদিকে রাখাইনে রোহিঙ্গা গ্রামগুলো সেনাবাহিনীর দেয়া আগুনে পুড়ছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটি বলছে, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী যে পরিকল্পিতভাবেই রোহিঙ্গা মুসলিমদের গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দিচ্ছে তার অনেক প্রমাণ তাদের কাছে আছে। স্যাটেলাইট থেকে তোলা রাখাইন রাজ্যের অনেক ছবি বিশ্লেষণ করে অ্যামনেস্টি বলছে, সেখানে গত তিন সপ্তাহে আশিটিরও বেশি স্থানে বিশাল এলাকা পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

সূত্র: আরটিভি