রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দেখে বিদেশীরা স্তম্ভিত, মর্মাহত

তারেক : মিয়ানমার বাহিনীর বর্বরতায় বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি বুধবার সরেজমিনে দেখতে এসে বিশ্বের ৪৭ দেশ ও বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা হতভম্ভ হয়ে গেছেন। অসহায় রোহিঙ্গা নরনারী ও শিশুদের সঙ্গে তারা কথা বলেছেন। অনেকে তাদের প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেছেন। এককথায় এসব বিদেশী দূতাবাস প্রতিনিধি ও সাহায্য সংস্থার সদস্যদের মাঝে মিয়ানমার সরকারের অমানবিক আচরণে দুর্দশাগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের নিয়ে তাদের ক্ষোভ ও বেদনার অন্ত ছিল না। তারা রীতিমতো মর্মাহত হয়েছেন। রোহিঙ্গাদের নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তারা নিজ নিজ দেশ ও সংস্থার সর্বোচ্চ পর্যায়ে এ অমানবিক পরিস্থিতি নিয়ে দ্রুত করণীয় নিয়ে সুপারিশ করবেন বলে জানিয়েছেন অনেকে। যেসব দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা বুধবার রোহিঙ্গা পরিস্থিতি পরিদর্শন করেছেন সে সব দেশ ও সংস্থার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, ইতালি, নরওয়ে, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, সুইডেন, ইরাক, কাতার, ওমান, আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, ফিলিপিন্স, নেপাল, ভুটান, ব্রুনাই, আফগানিস্তান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও ফিলিস্তিন এবং জাতিসংঘ, আইওএম, ইউএনএইচসিআর, বিশ্ব খাদ্য সংস্থা, আইআরসি।

অপরদিকে, ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। রাখাইনে সামরিক জান্তার গণহত্যার প্রতিবাদে সরব হয়েছে উন্নত বিশ্বের বহু দেশ। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেছে পরাশক্তি ফ্রান্স। রোহিঙ্গা ইস্যুতে সুইডেনকে নিয়ে জাতিসংঘে রুদ্ধদ্বার বৈঠকের প্রস্তাব করেছে যুক্তরাজ্য। মিয়ানমারে সব ধরনের সাহায্য প্রকল্পের কর্মকা- স্থগিত করেছে জার্মানি। কানাডা সরকারের পক্ষেও মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। তবে পররাষ্ট্র দফতর মিয়ানমার সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। রাশিয়া এখনও পর্যন্ত সরকারীভাবে কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেনি। যুক্তরাষ্ট্র রাখাইন রাজ্যের ঘটনায় উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছে। সঙ্কট উত্তরণে আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের তাগিদ দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ মিয়ানমার সরকারের পক্ষে আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নে নতুন একটি কমিটি গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ডেনমার্ক সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ হিসাবে ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচীর (ডব্লিউএফপি) মাধ্যমে এ অর্থ সহায়তা দেয়া হবে। ইরান সরকার বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জন্য ৯৫ টন ত্রাণ সামগ্রী প্রেরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে ৭০ কূটনীতিক

মিয়ানমার সরকারী বাহিনীর হাতে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের দেখতে বাংলাদেশে নিযুক্ত ৪৭টি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার দূতাবাস কর্মী ও প্রতিনিধিরা বুধবার উখিয়ার বালুখালি ও নাইক্ষ্যংছড়ির তমব্রু এলাকা পরিদর্শন করেছেন। সকালে ঢাকা থেকে বিমানযোগে কক্সবাজার এসে সড়কপথে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় নেয়া স্থানসমূহ পরিদর্শন করেন এর পাশাপাশি ইতোপূর্বে স্থাপিত দুটি ক্যাম্পেও যান। রাষ্ট্রদূত, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত, হাই কমিশনার, কূটনৈতিক ও বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক ও বিআইআইএসএস চেয়ারম্যান মুন্সী ফয়েজ আহমেদ, কক্সবাজার-৩ আসনের এমপি সাইমুম সরোয়ার কমল, জেলা প্রশাসক মোঃ আলী হোসেন ও পুলিশ সুপার ড. একেএম ইকবাল হোসেনসহ প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তারা। তারা শরণার্থী ক্যাম্প ঘুরে দেখার পাশাপাশি আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেন। এসব বিদেশী রাষ্ট্র ও সংস্থার প্রতিনিধিরা গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গেও কথা বলেন। তাদের পক্ষে বলা হয়, মিয়ানমার থেকে শরণার্থী প্রবেশ রোধ ও নির্যাতন বন্ধে করণীয় নিয়ে নিজ নিজ দেশ ও সংস্থার কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সুপারিশ পেশ করা হবে।

অনুপ্রবেশ পরিস্থিতি

টেকনাফ ও উখিয়ার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বুধবারও অব্যাহত ছিল। ছোট ছোট নৌকায় করে সীমান্ত অনুপ্রবেশকালে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইয়ের কারণে আরও দুটি নৌকা নাফ নদীতে ডুবেছে। এতে ৪ শিশুসহ ১১ রোহিঙ্গার লাশ টেকনাফ উপকূলে ভেসে এসেছে। নাইক্ষ্যংছড়ি, উখিয়া এবং টেকনাফ উপজেলার অন্তত ২০টিরও বেশি সীমান্ত পয়েন্ট হয়ে মঙ্গলবার রাত ও বুধবার বিকেল পর্যন্ত অনুপ্রবেশ করেছে ৩০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানানো হয়েছে, বর্তমানে রোহিঙ্গাদের জন্য এদেশে প্রবেশে কোন বাধা নেই দেখে দলে দলে রোহিঙ্গা নরনারী-শিশু ধেয়ে আসছে মিয়ানমার থেকে। এ পর্যন্ত পালিয়ে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা চার লক্ষাধিক হবে বলে বেসরকারী পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে। যদিও জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বুধবার পর্যন্ত এ সংখ্যা ৩ লাখ ৭০ হাজার বলে জানানো হয়েছে।

বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের পর পরিচয়পত্র

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন শেষে পরিচয়পত্র দেয়া হচ্ছে তাদের। নিবন্ধন প্রকল্পের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইদুর রহমান জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহসহ তিন ধরনের প্রক্রিয়া চলছে রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধনের কার্যক্রমে।

রোহিঙ্গা শিশুদের হাম ও পোলিও টিকা

মিয়ানমার সেনাবিহানীর নির্যাতনে পালিয়ে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শিশুদের হাম ও পোলিও টিকা দেয়া শুরু হচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে টিকাদান কর্মসূচী শুরু হবে বলে জানা গেছে। এ লক্ষ্যে চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় টিকা সরবরাহের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে দাবি জানানো হয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে।

চমেকে গুলিবিদ্ধ আরও

২ রোহিঙ্গা

বুধবার চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মিয়ানমারে গুলিবিদ্ধ হয়ে পালিয়ে আসা আরও দুই রোহিঙ্গা ভর্তি হয়েছে। এরা হচ্ছে মংডুর মোঃ জাহাঙ্গীর আলম (১৮) ও মোঃ ইদ্রিস (২৮)। এ নিয়ে চমেক হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে।

ইইউর আরও ৩০ লাখ ইউরো বরাদ্দ

বাংলাদেশে আশ্রিত অসহায় রোহিঙ্গাদের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে আরও ৩০ লাখ ইউরো বরাদ্দের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এর আগে গত মে মাসে ইইউ প্রতিনিধিদের রাখাইন প্রদেশ পরিদর্শন শেষে রোহিঙ্গাদের জন্য ১ কোটি ২০ লাখ ইউরো মানবিক সহায়তা হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবিক সহায়তা সঙ্কট ব্যবস্থাপনা বিষয়ক কমিশনারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি সঙ্কটাপন্ন হওয়ায় রোহিঙ্গাদের জন্য এ মানবিক সহায়তার অর্থ প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আশ্রয়, পানি, খাদ্য ও স্বাস্থ্য সেবা খাতে এ অর্থ ব্যয় করা হবে। কমিশনার স্তিলিয়ালিদেস জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে মানবিক পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার রূপ নেয়ায় সঙ্কট যেন আর বাড়তে না পারে সে লক্ষ্য নিয়ে তারা এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের পক্ষে ইইউর সমর্থন অব্যাহত থাকবে।

মহাসড়কে চেকপোস্ট

মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গারা যাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যেতে না পারে সেজন্য চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়িসহ বিভিন্ন রুটেও অনুরূপ চেকপোস্ট স্থাপন ও তল্লাশি অভিযান শুরু হয়েছে।

কক্সবাজারে জনজীবনে নাভিশ্বাস

মিয়ানমারে রাষ্ট্রীয় সহিংসতায় সে দেশ থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কক্সবাজার অঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণ করায় সেখানকার জনজীবনে নানামুখী সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বেড়ে গেছে। এছাড়াও চাহিদার সঙ্গে ভোগ্যপণ্যের সঙ্গতি নেই। স্থানীয় বাজারগুলোতে চাল, ডাল, তেল, মাছ ও শাক-সবজির মূল্য কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। এতে সাধারণ খেটে খাওয়া গরিব মানুষের জীবনযাত্রা অস্থির হয়ে উঠেছে। জনকণ্ঠ