মেহমানদারি ভালোবাসার বর্হিপ্রকাশ

জাকারিয়া হারুন : মেহমানদারি সম্পর্ক দৃঢ় করে। পরস্পরের মধ্যে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি মজবুত করে। মেহমানদারি সামাজিক সম্পর্ক রক্ষার অন্যতম মাধ্যম। মেহমানদারিতে আছে আনন্দ ও পুণ্য। এটি কল্যাণ ও মহত্ত্বের পরিচায়ক। হজরত ইবরাহিম (আ.) সর্বপ্রথম পৃথিবীতে মেহমানদারির প্রথা চালু করেছেন। ইসলামে অতিথিসেবার প্রতি সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। মেহমানদারির সঙ্গে ইমানদারির বিশেষ সম্পর্ক আছে। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০১৮; মুসলিম, হাদিস : ৪৮)

মেহমানদারি নবীদের আদর্শ। হজরত ইবরাহিম (আ.) সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘আমার ফেরেশতারা (পুত্রসন্তানের) সুসংবাদ নিয়ে ইবরাহিমের কাছে এলো। তারা বলল, ‘সালাম।’ সেও বলল, ‘সালাম।’ সে অবিলম্বে কাবাবকৃত গোবৎস (ভুনা গরুর গোশত) নিয়ে এলো।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৬৯)

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ইবরাহিম (আ.)-এর কাছে প্রেরিত ফেরেশতাদের দলে হজরত জিব্রাইল, মিকাইল ও ই¯্রাফিল (আ.) ছিলেন। তাঁরা মানুষের আকৃতি ধারণ করে ইবরাহিম (আ.)-এর কাছে আগমন করেন। তিনি তাঁদের মানুষ মনে করে তাঁদের জন্য আতিথেয়তার আয়োজন করেন। ইবরাহিম (আ.)-ই পৃথিবীতে সর্বপ্রথম মেহমানদারির প্রথা প্রচলন করেন। (তাফসিরে কুরতুবি)

কথিত আছে, হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর কাছে প্রতি রাতে তিন থেকে ১০ আবার কখনো ১০০ জন পর্যন্ত মেহমানের সমাগম ঘটত। হজরত আতিয়্যা আওফি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম (আ.)-কে এ কারণে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন যে তিনি মানুষকে খানা খাওয়াতেন, বেশি বেশি সালাম দিতেন আর মানুষ রাতে ঘুমিয়ে পড়লে তিনি নামাজ আদায় করতেন। (তাম্বিহুল গাফিলিন)

আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাধিক দানশীল। আর রমজান মাসে তিনি সবচেয়ে বেশি দান করতেন। যখন জিব্রাইল (আ.) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন, তখন তিনি প্রবল বাতাসের চেয়েও বেশি দানশীল হতেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৬; মুসলিম, হাদিস : ২৩০৮)

বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন মেহমানদারির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অনেক সময় অতিথি আপ্যায়ন করতে গিয়ে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে অনাহারে থাকতে হয়েছে। নিজ ঘরে মেহমানদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে না পারলে তিনি মেহমানদের কোনো ধনী সাহাবির বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন। নবী হওয়ার আগে থেকেই তিনি অতিথিসেবায় সচেষ্ট ছিলেন। সর্বপ্রথম ওহিপ্রাপ্ত হয়ে অনেকটা বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন মহানবী (সা.)। হজরত খাদিজা (রা.) তখন তাঁকে সান্ত¡না দিয়েছিলেন এভাবেÑ‘আল্লাহর কসম, আল্লাহ আপনাকে কখনো লাঞ্ছিত করবেন না। আপনি তো রক্ষা করেন আত্মীয়তার বন্ধন, বহন করেন অন্যের বোঝা, উপার্জনক্ষম করেন নিঃস্বকে, আহার দেন অতিথিকে, সাহায্য করেন দুর্যোগ-দুর্বিপাকে।’ (বুখারি, হাদিস : ৩)

আতিথেয়তা নৈতিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিতে মহৎ কাজ। অতিথিসেবা নবীদের সুন্নাত। কোনো কোনো আলেমের মতে, বহিরাগত মেহমানের মেহমানদারি করা গ্রামবাসীর জন্য ওয়াজিব বা অত্যাবশ্যকীয়। কেননা গ্রামে সাধারণত হোটেলের ব্যবস্থা নেই। তবে শহরে যেহেতু হোটেল-রেস্টুরেন্ট আছে, তাই সে ক্ষেত্রে মেহমানদারি সুন্নাত। (তাফসিরে কুরতুবি)