কোন মুখে জাতিসংঘের অধিবেশনে যাবেন সু চি!

রাশিদ রিয়াজ : মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সাং সুচি’র চারপাশে এখন সারাবিশ্বের অগণিত সমালোচক। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধদের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের গণহত্যা, নির্বিচারে গণধর্ষণ ও তাদের বাড়ি ঘর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার মত ঘটনায় অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন সুচি। তার সমালোচকদের মধ্যে যেমন রয়েছেন বিশ্বনেতা, নোবেল লরিয়েট, জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো তেমন রয়েছে বিশ্বের কয়েক’শ কোটি সাধারণ মানুষ। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিক্ষোভ হচ্ছে সারাবিশ্বে এমনকি ইসরায়েলের রাজধানী তেলআবিবেও। তীব্র ধিক্কার, ঘৃণা জানিয়ে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভে সুচির নোবেল পুরস্কার পর্যন্ত কেড়ে নিতে লাখ লাখ মানুষ নোবেল কমিটির কাছে স্বাক্ষরযুক্ত পিটিশন দিয়েছে। বিশ্বে এধরনের ঘটনা বিরল। অথচ রোহিঙ্গা গণহত্যা আড়াল করে সুচি অবস্থান নিয়েছেন হত্যাকারীদের কাতারে। মাত্র ৩ সপ্তাহে প্রায় পৌণে চার লাখ রোহিঙ্গা শিশু, নারী, পুরুষ এমনকি বৃদ্ধরা পর্যন্ত প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। কোনো যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া এত কমসময়ে এধরনের বিপুল মানুষ প্রাণ বাঁচাতে অন্যকোনো দেশে আশ্রয় নিয়েছে কি না তাও অনুসন্ধানের বিষয়।

শত শত বছর ধরে রোহিঙ্গা মুসলমানরা মিয়ানমারে বাস করে আসার পর সুপরিকল্পিতভাবে তাদের মৌলিক অধিকার ছাড়াও ভোটাধিকার ও নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্রবিহীন জাতিতে পরিণত করা হয়েছে। অং সাং সুচি গণতন্ত্রের অবিসাংবাদিত নেত্রী হয়ে তাতে সায় দিয়েছেন, সমর্থন করে যাচ্ছেন, আর নিশ্চুপ হয়ে চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারতের মত বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর সহায়তাও পাচ্ছেন। সুতরাং জাতিসংঘের অধিবেশনে সুচি যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করছেন না।

মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইউ কিউ জেইয়া বলেছেন, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মনোযোগ দিতে সু চি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ৫০’এর দশক থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্যাতন করে আসছে দেশটির সামরিক জান্তা ও পরবর্তীতে সুচি সরকার। তিনি এতদিন কি করেছেন?

ইউ কিউ জেইয়া আরো বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। লোকজন আতঙ্কের মধ্যে আছেন। এ সময়ে তার দেশে থাকা উচিত। সামগ্রিক বিষয়ে আরও মনোযোগ দিতে তিনি দেশেই থাকছেন।

কিন্তু মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতন ও লাখ লাখ শরণার্থীর বাংলাদেশ ছাড়াও বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে যে সংকট সৃষ্টি করেছে তা শুধু দেশটি নয়, অন্যান্য দেশেও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির হুমকি দিচ্ছে। সন্ত্রাস দমনে আন্তর্জাতিক বিশ্ব যখন একাট্টা হয়ে লড়ছে তখন মিয়ানমার সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চাপিয়ে দিয়েছে। ইতিমধ্যে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতা দালাই লামা চিঠি দিয়ে এ সংকট নিরসনে সুচির প্রতি আহবান জানিয়েছেন। কিন্তু তাতে কোনো সাড়া দেননি সুচি। তার দেশে প্রায় ১’শ জাতিগোষ্ঠীর বাস। শান, কাচিন, কারেং সহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে মিয়ানমারের শাসকদের সহিংসতা চলছে। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর নির্বাচনে ভূমিধস জয়ের পর গণতন্ত্রের পথে মিয়ানমারকে এক বিন্দু নিতে পারলে সংখ্যালঘুরা তার দেশে সহিংসতার কবলে পড়ত না। গণতান্ত্রিকভাবে রক্ষা করার কোনো ব্যবস্থাই নিতে পারছেন না সুচি।

মিয়ানমারের নাফ সহ বিভিন্ন নদীতে রোহিঙ্গাদের লাশ ভাসছে। এসব ছবি ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বমিডিয়ায়। ছি ছি করছে বিশ্বসম্প্রদায়। পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে নিরীহ রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চাপিয়ে দিতে সুচি বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেননি। মিয়ানমারের নৈতিকতার এই আইকন সুচি এখন কার্যত রোহিঙ্গাদের রক্তপিপাসু এক স্বৈরাচার নেত্রীতে পরিণত হয়েছেন মাত্র।